BLOG
Write on Monday, 29 April 2013 Published in Rahad Abir

Rahad Abir breezes through street fighter poetry

Ever heard of a mobile poetry emporium? Or, composing a poem in every ten minutes on the titles picked from social sites? I bet you haven’t. You might be aware of Ross, a character found in Shakespeare’s Macbeth. Well, here we’re going to talk about a writer/performer, Ross Sutherland, of our time. Once upon a day, at 17, he got an opportunity to perform poetry alongside his hero, the punk-poet John Cooper Clarke. That’s the beginning of his writing career. Born in Edinburgh in 1979, Ross has already had four poetry collections and was included in The Times’ list of Top Ten Literary Stars of 2008. He was on a visit to Bangladesh from the British Council in September last year. Subsequently, he attended an interactive session at the Daily Star Centre, where I had the privilege to meet him. Apart from being a poet, he works as a freelance journalist, teacher and filmmaker. Lately, he has hosted and created a show called Comedian Dies In The Middle Of A Joke. Seemingly, Ross is an all-round writer, resides in Cambridge, even though his chief activities are based in East London.


As I’ve seen Ross, I found him quite intriguing, off the wall, and obviously pioneering. Why not? Imagine a bunch of poets wandering around East London with a ‘poetry takeaway van’; anyone can get to the van and order a poem for some quid, to be written instantly. Another day the writers sit before their laptops, and people from different parts of the world send theme titles through the social network in order to have a poem composed on them, where the maximum time is ten minutes.
On top of that, Ross appears to me as a visual poet/performer. He makes multimedia visuals based on his poems, and performs poetry as well. Poetry, to him, is a real art; an art that should be read, thought and written. A former lecturer in electronic literature at Liverpool John Moore’s University, Ross wonders if computers will ever be able to write poetry. And he ended up making a documentary on his presumption.
The reason for this write-up was, basically, to bring up Ross’ latest collection, e-book, Street Fighter 2. ”Street Fighter II,” Wikipedia says, ”is regarded as one of the most influential video games of all time, and the most important fighting game in particular. The release of Street Fighter II in 1991 is often considered a revolutionary moment in the fighting game genre.” After all, this e-published book of 12 sonnets is inspired by Street Fighter 2.
There are a lot of things to write poetry about. Why on earth video games? A self-explanation comes in the preface from video game geek Ross: ”I’ve never been any good at referencing Greek mythology. ..the Classics are too big. ..Luckily, new mythologies are being created every day, not least in the world of video games. ..Just like the Classics, the fighters here are predominantly allegorical. ..I urge other writers to dip into this mythology for themselves, particularly if they have an interest in the Classics. Street Fighter 2 spans several continents, containing not only echoes of Greek and Roman mythology, but encompassing Eastern histories as well.”
Apparently, Ross’ collection Hyakuretsu Kyaku consists of a series of twelve sonnets based on the twelve great playable characters, from Ryu to M Bison, of Capcom classic Street Fighter 2.
This poet has always taken poetry like a game, like solving a puzzle— the harder the levels the greater the pleasure. It was his grandmother, he said, who brought him into this amazing world of verse. He used to write her letters—full of poems—which was fun.
My close friend, in my school, was a video game addict. He spent most of his school meal money on that (including extra bucks stolen from his dad’s wallet). I know pretty well how it feels like being a video game geek. I can feel Ross’ heart when he boldly declares in an interview, ”The Street Fighter poems are some of the most serious things I’ve ever written.” He utterly loved the idea of elevating Street Fighter to the level of Greek mythology.
As a character, Ross is tremendously wicked and funny, too. From beginning to end, in this collection, he amuses the readers thoroughly. Some examples:
”All characters used without permission but with great respect. Please don’t sue me, it’s probably not worth it.”
”M Bison: You have made me a very happy man.
Guile: And next, I’ll make you a dead one.” (Street Fighter, the movie, 1994)
It is conceivable that you may sense these sonnets are bound for youngsters. The truth is adults can get much pleasure out of it. I personally liked and enjoyed reading the e-book. One hopes Ross Sutherland will keep up the good work. Last but not least, poetry lovers can easily download this e-book from this link (completely free):
http://www.pennedinthemargins.co.uk/index.php/2011/10/hyakuretsu-kyaku/

Published in the Daily Star on 27 April 2013

Write on Wednesday, 17 April 2013 Published in Rahad Abir

একটি টেলিফোন কল। নাইরোবি থেকে। বেরির তখন সকালের নাস্তা আধাআধি হয়েছে। রুমমেটের ডাকে উঠে গিয়ে ফোনটা ধরল। ওপাশ থেকে তখন গড়গড় করে দ্রুত আওড়ে যাচ্ছে, হ্যাল বেরি বলছ? আমি তোমার আন্টি জেন। হ্যাল, শুনতে পাচ্ছ? শোন, তোমার বাবা গাড়ি অ্যাকসিডেন্টে মারা গেছেন। বেরি...

নভেম্বরের এক শীতের সকালে আচমকা এই ফোন পেলেন আজকের মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা। যার পুরো নাম বারাক হুসেন ওবামা। সংক্ষেপে যাকে অনেকে বেরি ডাকত। যদিও বারাক তা পছন্দ করতেন না। শুধরে দিয়ে অনেককেই বলতেন, প্লিজ, কল মি বারাক।

ড্রিমস ফরম মাই ফাদার। বারাক ওবামার ৪৪২ পৃষ্ঠার বইটির শুরুর অধ্যায়েই এই ফোন কলের কথা। এর পরপরই লেখক আমাদের নিয়ে যাচ্ছেন তার বাবার গল্পে। অবশ্য তার কাছে বাবা মানে ধোয়াশা একটা ব্যাপার। তার যখন মাত্র দুই বছর বয়স, সেই ১৯৬৩ সালে, বাবা তাদের হাওয়াইতে রেখে হারভার্ডে ডক্টরেট করতে চলে যান। এরপর বাবার মাথে ফের এবং শেষবার দেখা তখন বারাক দশবছরের বালক। মাত্র দুবারের দেখায় একটা মানুষের মনের মধ্যে বাবার চরিত্রটা কী রকম দাঁড়াতে পারে? মিথের কাল্পনিক চরিত্রের চেয়ে বেশি কিছু? বারাকও তার বাবাকে, যার নামও ছিল বারাক হুসেন ওবামা, এইভাবেই কল্পনা করেছেন।

বইটি পড়তে শুরু করলে ভোরের আকাশের ধীরে ফর্সা হওয়ার মতো একটি জিনিস পরিষ্কার হয়ে উঠবে: এটি একটি শেকড় সন্ধানী লেখা। বারাক ওবামা কাল মানুষ। তার বাবা এসেছিলেন আফ্রিকার দেশ কেনিয়া থেকে স্কলারশিপ নিয়ে আমেরিকার হাওয়াই বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশুনা করতে। ওই বিশ্ববিদ্যালয়ে তিনিই ছিলেন প্রথম কোন আফ্রিকান। আর মা অ্যান ডানহ্যাম, সাদা আমেরকিান, ক্যানসাসের বাসিন্দা। ল্যাঙ্গুয়েজ ক্লাসে দুজনের প্রেম, পরিচয়। অতঃপর বিয়ে। সেটা ১৯৬০ সাল। যদিও বর্ণবিবাহ ছিল তখন অবৈধ। পরের বছরই, মাত্র সতের বছরে অ্যান মা হলেন। আর বারাক হুসেন ওবামার পুত্র বারাক কালই হল।

কালদের ওপর নিপীড়ণ, বঞ্চনার শেষ নেই। এ নিয়ে আছে দীর্ঘ ইতিহাস। বারাক ছোট্ট বয়সেই বুঝে গেলেন কাল সাদার বিভাজন। এবং সাদারা কালদের দেখতে পারে না, নিকৃষ্ট মনে করে। অথচ তার স্নেহময়ী মা সাদা। তবে সে এমন কাল কেন? তার বাবা কাল বলে?

যতই বয়স বাড়ে আমেরিকা নামক বিশাল দেশটিতে বারাক নিজের অস্তিত্ব নিয়ে সংকটে ভোগে। সাদাদের মাঝখানে তার মতো কালকে বড় বেমানান লাগে। নিঃসঙ্গতায় ভোগে সে। এছাড়া চলতে-ফিরতে, সবখানে কালদের প্রতি তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য তো আছেই। অথচ এই দেশ তার, এইখানে তার জন্ম।

বইয়ের শুরুতে, সেই টেলিফোনের পর বারাক তার মা, নানা, নানীর মুখে শোনা বাবার গল্প তুলে ধরে। আসলে বাবা সর্ম্পকে তার যতটুকু জানা তা এই গল্প শুনে শুনেই। দু দুবার বারাক কেনিয়া যান। এবং সে দুবার হচ্ছে তার জীবনের শ্রেষ্ঠ সময়। কেন গেলেন তিনি কেনিয়া? এমন না যে বাবা ও বাবার পরিবারের সঙ্গে জোড়াতালি মারা কোনরকম যোগাযোগ টিকে ছিল। বরং উল্টোটা। তার বাবা পাঁচ-পাঁচটি বিয়ে করেছিলেন। তার মধ্য দুজন সাদা আমেরিকান। অবশ্য কেনিয়ার সমাজ-ব্যবস্থায় এরকম পাঁচ-ছয়টি বিয়ে এবং গণ্ডায় গণ্ডায় ছেলেমেয়ে হওয়াও স্বাভাবিক। তবে? ওই যে বললাম শেকড়, মূল যে তার সেই কেনিয়ায় বাধা!

প্রথমবার কেনিয়ার মাটিতে নেমে তিনি যেন পৃথবীর সবচেয়ে সুখী মানুষে পরিণত হন। অনুভব করেন, এই তো তার আসল গোড়া। এইখানের মানুষগুলো সব তার মতো দেখতে। যেদিকে তাকাও কেবল কাল মানুষ। আমেরিকায় জন্ম হলেও এই প্রথম বারাক বিদেশের মাটিতে, তার পূর্ব পুরুষের দেশকে অন্তর দিয়ে ‘নিজের’ বলে বোধ করেন।

এই যে ‘নিজের বোধ’, আইডেনটিটি ক্রাইসিস বা আত্মপরিচয় সংকট, বর্তমান পৃথিবীতে এ সমস্যা কেবল একা বারাক ওবামার না। কাল, সাদা, বাদামি সব আদমিদেরই এই আত্মপরিচয়ের সংকট আছে। একটু ভাল খাওয়া, ভাল পরা, উন্নত জীবনের আশায় মানুষ ছুটছে দেশ থেকে দেশান্তরে। এ নতুন নয়। ইতিহাসের শুরু থেকেই এ দেশান্তর চলছে এবং চলবে।

আত্মপরিচয় সংকটে ভুগছে এমনই এক বৃটিশ ডাক্তারের সঙ্গে বারাকের পরিচয় হয় কেনিয়ায়। ডাক্তার বলেন, আমার ছেলেবেলা কেটেছে কেনিয়ায়। বাবার এখানে চা বাগান ছিল। কেনিয়া স্বাধীন হলে এখানকার জমিজিরাত বিক্রি করে আমরা সপরিবারে ইংল্যান্ডে চলে যাই। আমি ডাক্তারি পড়ি। পাশ করি। বিয়ে করি এক সাইক্রিয়াটিস্টকে। একসময় বউকে অনেক বুঝিয়েসুঝিয়ে চলে আসি আবার আফ্রিকায়। মালাউই-তে (আফ্রিকার আরেক দেশ) সরকারি বিভাগে পাঁচবছর ধরে ডাক্তারি করছি। বারাক তাকে জিজ্ঞেস করেন, আচ্ছা, আপনি আফ্রিকায় ফিরে আসলেন কেন? রুমালে চশমার গ্লাস মুছতে মুছতে ভদ্রলোক উত্তর দিয়েছিলেন, আসলে ইংল্যান্ডে আমার নিজেকে বিদেশি লাগে। বরং এই আফ্রিকাকেই আমার নিজের দেশ মনে হয়, এখানকার লোকজন, প্রকৃতি যেন আমার নিজের। ইংল্যান্ডের লাইফ ভাল লাগে না।

এখন তো মিক্সড কালচার কথাটার খুব চল। আমাদের দেশের এই প্রজন্মের ছেলেমেয়েদের একটা বড় অংশই এই আবর্তে আটকে পড়া। এখানেও আছে আত্মপরিচয় সংকট। পাগলের মতো মানুষ অভিবাসী হচ্ছে। তাছাড়া ধনিক শ্রেণীরা তো ডাল-ভাতের মতোই ইউরোপ আমেরিকা যাওয়া আসা করেন। তাদের ছেলেমেয়েরা না পারছে বাংলা সংস্কৃতি গ্রহণ করতে, না পুরোপুরি ইংরেজি। এদের ভেতর একসময় ‘নিজের’ বোধটা যখন জাগ্রত হবে, তখন এরাও সেই আত্মপরিচয় সংকটে পড়বে। বারাক ওবামা ভাল মতই এ বিষয়টা তার বইয়ে তুলে ধরেছেন। তাছাড়া আমেরিকা দেশটাই তো অভিবাসীর দেশ। আত্মপরিচয়ের সংকট সেখানে একটি কমন সমস্যা। কেনিয়া গিয়ে বারাক তার বাবার এক বান্ধবী নাইরোবি বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসের অধ্যাপিকার সঙ্গে পরিচিত হন। অধ্যাপিকা তার ছোট মেয়েটির কথা বলেন, যে সোয়াহিলি (কেনিয়ার একটি বৃহৎ জনগোষ্ঠীর ভাষা) ও ইংরেজি মিশানো ছাড়া কথা বলতে পারে না। আমাদের এখানে যেমন বাংলিশ। অধ্যাপিকার মেয়ের ক্ষেত্রে সেটা হওয়া স্বাভাবিক। কারণ তিনি ঘন ঘন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে যাওয়া আসা করেন।

ড্রিমস ফরম মাই ফাদার বইটির তিনটি পার্ট বা অংশঃ অরিজিন, শিকাগো ও কেনিয়া। অরিজিন মানে উৎস, আর বারাকের উৎসটা কোথায়? সেই কেনিয়া। প্রথম ও শেষ দুটি অংশেই লেখক সেই উৎস বা আত্মপরিচয়ের সন্ধান করেছেন। মাঝের অংশ শিকাগো, যেই শহরে তার বেড়ে ওঠা, জীবন-জীবিকা ও সংগ্রামী যৌবন। অরিজিন অংশের অনেকটা জুড়েই তার বছর পাঁচেক জাকার্তায় কাটানো সময়ের কথা আছে। তার মায়ের দ্বিতীয় স্বামী ছিলেন ইন্দোনেশিয়ান। তৃতীয় বিশ্বের নিদারুণ দারিদ্রের রূপটিও তিনি দেখেছেন সেখানে।

তিনটি অংশের মধ্যে কেনয়িার অংশটিই বেশি আকর্ষণীয়। লেখকের যেমন সেটা ভাল লাগার জায়গা, পাঠক হিসেবে আমরাও তার সেই আনন্দ-উচ্ছ্বাস অনুভব করি। দু দুবার কেনিয়া গিয়ে বারাক তার পিতৃপুরুষের কাছের-দূরের প্রায় সমস্ত আত্বীয়-স্বজনের সাথে দেখা করেন। এমনকি পরের বার যখন যান সাথে নিয়ে যান তার বাগদত্তা বধূ মিশেলকে এবং বিয়েটাও সারেন সেখানে।

১৯৬৩ সালে বৃটিশদের হাত থেকে স্বাধীনতা পাওয়া কেনিয়ার সামাজিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক অবস্থার পুরো একটি চিত্র পাওয়া যাবে এই বইটিতে। এসব যে বারাক জোর করে তার লেখায় ঢুকিয়ে দিয়েছেন তা কিন্তু নয়, সবই এসেছে তার পূর্বপুরুষের মূলত তার পিতার জীবনকথা বয়ান করতে গিয়ে। আমাদের মতই একটি দরিদ্র দেশ কেনিয়া, দুর্নীতি যার রন্ধ্রে রন্ধ্রে, তার উপর রয়েছে ছোট বড় ৪০টি ভিন্ন জনগোষ্ঠী এবং তাদের মধ্যে বিবাধ। কেনিয়ার ব্যবসা-বাণিজ্যের বড় অংশটাই বিদেশীদের হাতে। সেই বৃটিশ ডাক্তারটির মুখ থেকে শোনা কেনিয়ার স্বাস্থ্যসেবার চিত্রটিও বারাক আমাদের জানিয়ে দেন। লোকজন প্রতিরোধযোগ্য রোগে ভুগে মারা যাচ্ছে, যেমন আমাশয়, চিকেন পক্স। আর সম্প্রতি বছরগুলোতে ভয়াবহ হয়ে দেখা দিয়েছে এইডস অবস্থাটা এমনই মহামারী আকার ধারণ করেছে যে কোন কোন গ্রামে এ হার পৌঁছেছে শতকরা পঞ্চাশ ভাগে। আর হ্যা, সেখানকার মানুষের খাবারদাবারও এই ভারতবর্ষের মতো, মসলা প্রধান।

বারাক ওবামার বইটি লেখার পেছনের বিষয়ে দু-চার কথা বলে শেষ করি। বারাক হারভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে আইন পড়াকালীন ‘হারভার্ড ল রিভিউ’-র প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন। এটি খুবই সম্মানজনক পদ। এটিই ছিল কোন কাল আমেরিকানের প্রথম ‘হারভার্ড ল রিভিউ’-র প্রেসিডেন্ট হওয়া। এক প্রকাশক বিষয়টাকে কাজে লাগাতে চাইলেন। তিনি বারাককে একটি আত্মজীবনী লেখার অনুরোধ করেন। এজন্য বিরাট অংকের আগাম টাকাও দেন। ১৯৯৫-তে ড্রিমস ফরম মাই ফাদার প্রকাশিত হয়। ২০০৪-এ বইটি পরিণত হয় বেস্ট সেলারে। আর ১৯৯৬ সালে আফ্রিকান-আমেরিকান বারাক ওবামা ইলিনস রাজ্যের সেনেটর নির্বাচিত হন। তারপর বাকিটা আজ ইতিহাস।

Write on Wednesday, 17 April 2013 Published in Rahad Abir

প্রথম গল্প লেখার স্মৃতি দিয়েই শুরু করি। ইন্টারমিডিয়েটর পর। ঠিক করলাম গল্প লিখব। কিন্তু কী গল্প? কী নিয়ে হবে সেটা? প্লট কী? আকাশ-পাতাল ভাবতে লাগলাম। তবু প্লট খুঁজে পাই না। ঘটনা তো কতই চারপাশে ঘটে, কিন্তু তার মধ্যে লেখার মতো একটু আলাদা রকমের ঘটনা তো চাই। নাহ, আমার বোধ হয় দেখার চোখই নাই। শরৎবাবু কত কী নিয়ে লিখেছেন, কত বৈচিত্র তার লেখায় (সে সময় খুব শরৎ পড়তাম)! আর সেসব তো এম্নি এম্নি হয়নি, উনি কত ঘুরেছেন বেড়িয়েছেন, বোহেমিয়ান জীবনযাপন করেছেন, সন্নাসী হয়েছেন। তার মানে গল্প লিখতে হলে আমাকেও ঘুরতে হবে, বেশি বেশি মানুষের সাথে মিশতে হবে, জীবনকে বুঝতে হবে। এসব ভাবতে ভাবতে এর মধ্যে একদিন মায়ের মুখে শুনলাম আমার ফুফুর পরিচিত কোন এক মহিলা নাকি আত্মহত্যা করেছে। পারিবারিক কোন্দলের জের ধরে। ব্যাপারটা খুব লেখার মতো একটা ঘটনা মনে হল। ফুফুর বাড়ি একই এলাকায় ছিল। দেরি করলাম না, সেদিনই ফুফুর বাড়িতে যাই। কিছুক্ষণ কথাটথা বলার পরেই সে প্রসঙ্গ। আমি খুটিয়ে খুটিয়ে জিজ্ঞেস করতে লাগলাম। ফুফু এক-দুই প্রশ্নের উত্তর দেয়ার পরেই চোখ কুঁচকে আমাকে জিজ্ঞেস করেন, হঠাৎ এগুলা জিগাইতাছছ ক্যান? এইসব জাইনা তুই কী করবি? আমি আমতা আমতা করি, নাহ, এম্নেই। এর দুদিন পরে সন্ধ্যায় মা আমার কাছে জানতে চান, কী প্রয়োজনে সেই আত্মহত্যা-করা মহিলার কথা জানতে আমি ফুফুর বাসায় গিয়েছিলাম? কী মুশকিল রে বাবা! গল্পের প্লট খোঁজা তো কম হ্যাপা না। ভেবে দেখলাম মা-ফুফুর এরকম আচরণই স্বাভাবিক। যে আমি সাধারণত ফুফুর বাড়ি যাই না, সেই আমি সেদিন অনেকক্ষণ থেকে ওই ঘটনা জানতে চেয়েছি। এতে মা-ফুফুর আমার প্রতি অন্যরকম সন্দেহ হওয়াই তো স্বাভাবিক। অতএব, বুঝে নিলাম, এইভাবে ঘি উঠবে না। গল্প লিখতে হলে চারপাশে যেসব ঘটনা ঘটে ওসব নিয়েই নিজের কল্পনার ভেতর ভাঙচুর করে তবে বানাতে হবে। অবশেষে একটি পারিবারিক নির্যাতনের কাহিনী নিয়ে লিখে ফেললাম এক গল্প। এই হল আমার গল্প লেখার শুরু। এখন বুঝি গল্প লিখতে কাহিনী কোনো ঘটনা না, লিখতে জানলে সবকিছু নিয়েই লেখা যায়। কত হাজার হাজার ঘটনা, প্লট এখন মাথার ভিতর ঘুরপাক খায় অথচ লেখার সময় হয় না।
এইবার আসা যাক, আমি গল্প কেন লিখি? জগতে এত এত কাজ থাকতে এই সাহিত্য কেন? প্রথম উত্তর, মানুষ মাত্রই নিজেকে প্রকাশ করতে চায়। নিজের শ্রেষ্ঠত্ব, দক্ষতা অন্যের কাছে জাহির করতে চায়। সেই প্রাচীন কালের কথাই ধরা যাক, মানুষ তখন গুহার দেয়ালে ছবি আঁকত। নিজের ভালো লাগাকে এঁকে সবার মাঝে ছড়িয়ে দিত। অন্যেরা নিশ্চয়ই তখন সেই শিল্পীকে বাহবা দিত। সেসব শিল্পীর জীবনকাল কয় বছরই বা ছিল? কিন্তু তাদের কাজ? হাজার হাজার বছর ধরে বেঁচেছে। তার মানে সৃজনশীলতা মানুষকে অমরত্ব দান করে। মানুষ অমর হতে চায়, সেটাই স্বাভাবিক। যতই সৃষ্টিকর্তার কথা বলা হোক, পরকালের লোভ দেখানো হোক, পৃথিবীর মায়া কি কেউ কাটাতে পারে? মানুষ মাত্রই চায় তার মৃত্যুর পর সবাই তাকে মনে রাখুক। শরৎবাবুর দেবদাসের শেষকথার মতো বলতে হয়, একজন মানুষ মারা গেল অথচ তার জন্য কেউ চোখের জল ফেলল না, এমন হতভাগা আর কে আছে? মানুষ পৃথিবীতে তাদের সন্তান-সন্ততি রেখে যায়। ভাবে, তাদের মাধ্যমে নিশ্চয়ই তারা বেঁচে থাকবে। এই বেঁচে থাকাটাই হল আসল কথা। কেউ বেঁচে থাকে সৃজনশীল কাজের মাধ্যমে, কেউ তার মানবীয় গুণাবলীর কারণে, কেউ নিজেকে বিলিয়ে দিয়ে, কেউবা পৃথিবীর ঘৃণার পাত্র হয়ে অথবা কাউকে সবাই হয়ত একদম ভুলে গেল, সেও তো এক রকমের বেঁচে থাকা। তবে তার মানে এ নয় যে মানুষের সৃজনশীল কাজ বা বড় কোনো কাজের উদ্দেশ্য অমরত্ব পাওয়া। নিজের ভাল লাগাকে মানুষ অন্যের সঙ্গে ভাগাভাগি করে এই যা। পরবর্তী সময়ে তার একার ভাল লাগা হয়ত সকলের ভাল লাগা হয়ে ওঠে। এভাবেই তো একজন সম্মানীয় হয়ে ওঠেন।
এইবার আসি কী লিখব, কেন লিখব নিয়ে। নিয়তের মধ্যেই সমস্ত বরকত বলে ইসলামে একটা কথা আছে না? কথাটা পুরোপুরি সত্য। উদ্দেশ্যের ওপরই নির্ভর করে প্রাপ্তি। মানুষ চাইলে পারে না এমন কিছু নাই, যদি সেটা চাওয়ার মতো চাওয়া হয় এবং সেই অনুযায়ী কাজ করা হয়। কেউ যদি লেখালেখি শুরু করে এই ভেবে যে লেখালেখি করে ব্যাপক জনপ্রিয় হবে, টাকা কামাবে; তবে সে সেই রকমই সফল হবে। আবার দেখা গেল কোনো লেখকের উদ্দেশ্য একজন বড় মাপের লেখক হবে, তথাকথিত জনপ্রিয়তার সে ধার ধারে না। তবে সে সেরকমই পাবে। আবার পৃথিবীতে যেহেতু কোনো কিছুই ধ্র“ব না, মানুষের উপলব্ধি, চাওয়া-পাওয়া পরিবর্তন হতেই পারে। মিশেল ফুঁকো যেমন বলেছেন, আজ তিনি যে মতাদর্শে বিশ্বাস করেন কাল সেটাকে তিনি ভুলও বলতে পারেন। কারণ গতকাল পর্যন্ত জ্ঞানের রাজ্যে তার যতটুকু দৌড় ছিল তাতে মনে হয়েছে সেটা সত্যি, কিন্তু আজকে তার উপলব্ধির জগৎ যখন আরো প্রসারিত তখন মনে হচ্ছে সেটা ভুল। লেখকের ক্ষেত্রেও এমন হতেই পারে। একজন প্রতিষ্ঠিত লেখক, যার বেশ জনপ্রিয়তা আছে, ডাকনাম আছে। প্রকাশকরা তার বইয়ের জন্য লাইন দেন। দুহাতে লেখক টাকা কামাচ্ছেন। হঠাৎ হয়ত একদিন একটি ঘটনা তার ভেতরে এমন নাড়া দিল যে তার ভেতরটা চুড়মার হয়ে গেল। তিনি উপলব্ধি করলেন, এসব কী পাঠক-ঠকানো ছাইপাশ লিখছেন। এমন কোনো মহৎ সাহিত্য তো রচনা করেননি যে মৃত্যুর পর মানুষ তাকে মনে রাখবে। তিনি মরলে তো এসব লেখা সবাই ডাস্টবিনে ছুড়ে ফেলবে। এই ভাবনার পর লেখক কেমন কুকঁড়ে গেলেন। আগের মতো ফি বছর দুই-তিনটা বই লেখেন না। যাও একটা লেখেন তা পাঠক-প্রিয়তা পায় না। লেখক কিন্তু তাতে বিন্দুমাত্র দুঃখিত নন। তিনি জানেন যে বইটা তিনি এত সময় দিয়ে লিখলেন সেটা একটা মাস্টারপিস হয়েছে। এখন পাঠক তার মূল্য না বুঝলেও ভবিষ্যতে ঠিকই বুঝবে। তো যা বলতে চাচ্ছিলাম, নিয়তের ওপরে যেমন বরকত নির্ভর করে তেমনি লেখক কোন মাপের লেখক হতে চান সেটাও তার চাওয়ার ওপর নির্ভর করে। আমরা জানি লেখক অনেক টাইপের হতে পারেÑবড় লেখক, মাঝারি লেখক, ছোট লেখক, জনপ্রিয় ধারার লেখক, পরিচিতি পাওয়ার জন্য লেখক, এমন আরো কত কী। এই তো সেদিন শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায় বাংলাদেশে এসে বললেন, দুনিয়ার সমস্ত লেখাই লেখা হয়ে গেছে, কিছুই বাকি নেই। এখন আমরা যেটা করি নতুন মাত্রায়, নতুন শব্দে, নতুন চিন্তায় ভিন্নভাবে উপস্থাপন। লেখালেখি করতে আসলে দুনিয়ার তাবৎ লেখককে প্রতিদ্বন্দ্বী ভাবতে হবে। আর নয়ত নতুন কিছু করা সম্ভব হবে না। প্রকৃত লেখক হতে চাইলে সেটাই সত্যি। একটা সময় আমি এসব নিয়ে ভাবতাম না। কিন্তু এখন ভাবি। কেবল কি লেখক হওয়ার জন্যই লেখা? ভাবি আমি একটা গল্প লিখব, সেটা কেন লিখব? মানবসমাজের সেটা পড়ে কী লাভ হবে? বস্তাপচা জিনিস লিখে তাদের সময় নষ্ট করার অধিকার তো আমার নাই। সেদিন এক লেখকের সঙ্গে হাঁটতে গিয়ে তিনি একটা কথা বললেন। বললেন, প্রকৃত লেখক হতে গেলে আগে প্রকৃত মানুষ হতে হবে। শুনে আমার ভেতরে একটা ভূমিকম্প হয়ে গেল। আমি মানুষ হিসেবে কতটা বড় হতে পেরেছি যে বড় লেখক হওয়ার স্বপ্ন দেখব? একটা গল্প ফেঁদে কিছু পৃষ্ঠা ভরলেই কি লেখক হওয়া যায়? এসব ভাবতে গিয়ে লেখালেখি বন্ধ হওয়ার যোগাড়! কিন্তু নিয়মিত না লিখলে হবে কেমন করে? লেখালেখি তো বড় রকমের অনুশীলন। কেউ তো একদিনে আর লেখক হয় না, একটু একটু করে সারাজীবন ধরে লেখক হয়। আমার ছোট্ট মাথায় যেটা মনে হয়, তা হল প্রতিটি লেখকেরই তার লেখা নিয়ে ভাবা উচিত। কী লিখব, কেন লিখব, কাদের জন্য লিখব, কতটুকু লিখব। এবং আরো বড় ব্যাপার হচ্ছে সবসময় নিজের ভেতর প্রকৃত মানুষ হওয়ার তাগিদ থাকতে হবে।

৯ বৈশাখ ১৪১৫

Write on Thursday, 04 April 2013 Published in Rahad Abir

এম জে আকবর
তর্জমা : রাহাদ আবির
বিশ্বে মুসলমানদের পরিণাম নিয়ে আল্লাহ উদ্বিগ্ন হলে মুসলিম দেশগুলোর নেতাদের নিয়ে একটি কনফারেন্স ডাকলেন। সেখানে ইরাকের প্রেসিডেন্ট আল্লাহর কাছে একটাই প্রশ্ন রাখলেন, হে মহামহিম, কবে আমি আমার দেশে শান্তি ও সৌভাগ্যের দেখা পাব? আল্লাহ করুণাপূর্ণ দৃষ্টিতে তার দিকে চাইলেন এবং উত্তর দিলেন, তোমার সেই শান্তি ও সৌভাগ্য আসতে প্রায় একশ বছর লাগবে। ইরাকি প্রেসিডেন্ট হাউমাউ করে কাঁদতে শুরু করলেন, হায় হায়, আমি বেঁচে থাকতে তা দেখে যেতে পারব না! পাকিস্তানের প্রেসিডেন্টও তার দেশ নিয়ে একই প্রশ্ন রাখলেন। আল্লাহ বললেন, পাকিস্তানে শান্তি ও সৌভাগ্য আসতে প্রায় দেড়শ বছর লাগবে। একথা শুনে পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট তো কপাল চাপড়ে কাঁদতে লাগলেন, সে উন্নতি দেখতে আমি তো ততদিন বেঁচে থাকব না। এরপর ছিল বাংলাদেশের প্রেসিডেন্টের পালা। হরতাল, অস্থিরতা, অচলাবস্থা এবং দুঃখ-দুর্দশা ও নিরাশার জলে দেশটি আকণ্ঠ নিমজ্জমান, এর থেকে বের হওয়ার কেউ আর কোনো পথ খুঁজে পাচ্ছে না। তিনি তাই জানতে চাইলেন, বাংলাদেশ কখন এর প্রতিষ্ঠাতা পুরুষদের স্বপ্নভূমিতে পরিণত হবে? এবার আল্লাহ নিজেই কাঁদতে শুরু করলেন।
আবেগি ঢাকাবাসীদের একটি প্রিয় স্বভাব হচ্ছে নিজেকেই নিজে উপহাস করা। যেমন বাংলাদেশের প্রধান দুই নেত্রী শেখ হাসিনা ও বেগম খালেদা জিয়া পরস্পরের বিরোধিতার দরুন দেশে যে রাজনৈতিক সংকট তৈরি করেছেন তা বলে শেষ করা যাবে না। তারা একে অন্যকে এতটাই ঘৃণা করেন যে সেটা অনেকটা হত্যার নামান্তর। তবে বিষয়টা তাদের ব্যক্তিগত পর্যায়ের হলে তাতে কারো কোনো ক্ষতি ছিল না। কিন্তু সেটা রাজনীতির ভিতর ঢুকে পড়ায় পুরো দেশটিই অচল অবস্থায় পরিণত হয়েছে এবং তার ফলে প্রায় সেনাবাহিনীর শাসন কায়েম করতে হয়েছে। কিন্তু শহুরে বাঙালির তেজোদীপ্ততাকে রুখবে সাধ্য কার? ঢাকা শুধু একটি সম্ভবনাময় দেশের রাজধানীই নয়, একটি মননশীল সমাজেরও রাজধানী। ঢাকায় এখন একটি আলোচনার বিষয় হলো শহরে কি স্কার্ফ বা বোরকা পড়া মেয়ের সংখ্যা বেড়ে যাচ্ছে? অবশ্য এসবের ব্যবহার আগে থেকে থাকলেও বাংলাদেশী নারীরা সাধারণত বোরকাকে অবহেলা করেই এসেছে। তরুণী মেয়েরা বেশ ফ্যাশনেবল পোশাক পরে যতটা তাদের পারিপার্শ্বিক অবস্থা মেনে নেয়। আর বিজ্ঞাপনের হোর্ডিংগুলোতে তো যৌনাবেদময়ী মেয়েদের সরব উপস্থিতি। তারপরও বোরকার ব্যবহার নাকি বেড়ে চলেছে, হয়তো গুলশানের উচ্চবিত্ত পরিবারগুলোতে নয়, শহরের অন্যান্য অংশে। আমার এক চিন্তাশীল বন্ধু এর অন্যরকম এক ব্যাখ্যা দাঁড় করাল। একেবারেই রক্ষণশীল কিছু মহিলারা যারা আগে বাইরে বের হতো না, তারা হয়তো এখন বোরকা পরে বেরুচ্ছে। তার মানে এ ক্ষেত্রে অগ্রসরতা বেড়েছে এবং তার ফলে দেখা যাবে এসব মহিলাদের মেয়েরা একসময় বোরকা পরা ছেড়ে দিচ্ছে। গ্রামের চিত্রের দিকে তাকালে ব্যাপারটা বোঝা সহজ হবে। গ্রামে বোরকা পরা পারিবারিক স্বচ্ছলতার চিহ্ন। গ্রামের দরিদ্র মহিলাদের কাজ করে খেতে হয়, তাই তাদের পক্ষে পর্দা নেয়ার বিলাসিতা করা সম্ভব না। তবে যখন তাদের আর্থিক অবস্থার উন্নতি ঘটে তখন তারা সামাজিক পদমর্যাদার জন্য বোরকা পরা শুরু করে। তবে এ ক্ষেত্রে সৌদি আরবের যে ব্যাপক ভূমিকা রয়েছে সেটি অস্বীকার করার জো নেই। সৌদি আরবে লক্ষ লক্ষ বাংলাদেশি কাজ করে। এসব শ্রমিকরা তাদের মা-বোন-বউদের জন্য দেশে যেসব উপহার পাঠায় সেই তালিকার প্রথমেই থাকে বোরকা।
বদরুদ্দীন উমর বাংলাদেশের একজন প্রথিতযশা শিক্ষাবিদ, রাজনৈতিক কর্মী; কমিউনিজমের ওপর তিনি অনেক বইপত্র লিখেছেন। তার বাবা ছিলেন হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর সহকর্মী, যিনি মুসলিম লিগের একজন নামকরা নেতা ছিলেন এবং পরবর্তীতে আওয়ামী লীগেরও নেতা হন। বদরুদ্দীন ভাষা আন্দোলনের ওপর কয়েকটি ভাল বই লিখেছেন যেগুলো অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটি প্রেস থেকে বের হয়েছে। ঠিক এই কারণেই আমি বাংলাদেশে গিয়েছিলাম এবং তার সাথে আমার কথাবার্তার মূল বিষয়ও ছিল এটি। তার ড্রইংরুমে স্ট্যালিনের একটি পোট্রেট আঁকা, সেই সারিতে তার বাবারও একটি পোট্রেট রাখা। আমি বলে ফেললাম, এই সময়ে বসে স্ট্যালিনের রাজনৈতিক মতাদর্শ মেনে নেয়া যায় না। তিনি নির্দ্বিধায় বললেন, আমি স্ট্যালিনকে শ্রদ্ধা করি। মানুষ বলে সে কয়েক লক্ষ লোককে হত্যা করেছে। তার জায়গায় আমি হলে হয়তো সে সংখ্যাটা আরেকটু বাড়ত। শেষ বাক্যটি বলতে গিয়ে তিনি টুক করে হেসে দিলেন। তার মানে এ হত্যার সাথে স্ট্যালিনের ব্যক্তিগত ব্যাপার ছিল না, সেটা ঘটেছিল সময়ের প্রয়োজনে।
গ্রামীণ ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক নোবেল বিজয়ী ড. মোহাম্মদ ইউনুস তার ক্ষুদ্র-ঋণ প্রণালীর মাধ্যমে বাংলাদেশে দৃশ্যত এক ধরণের বিপ্লব করে ফেলেছেন যেটি তাকে সারা বিশ্বে সুনাম এনে দিয়েছে। তবে বদরুদ্দীন উমর সেটাকে সুনাম না বলে দুর্নাম বলতেই স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করেন। তার মতে ক্ষুদ্র-ঋণ ব্যবস্থা আগেকার মহাজনি ব্যবসার চেয়েও খারাপ। এটা হচ্ছে পুঁজিপতিদের গরীবদের ওপর প্রতারণার নতুন খোলস। তিনি মোহাম্মদ ইউনুসের শতকরা ২০ ভাগ সুদ নেওয়ার বিষয়টি উল্লেখ করলেন। ১৯৯১-এর সেপ্টেম্বরে মোহাম্মদ ইউনুস বলেছিলেন, হ্যাঁ, আমরা শতকরা ২০ ভাগ সুদ নেই, কেউ যদি মনে করে সুদের হার অনেক বেশি, তাহলে বেশি। এতে আমি মোটেও লজ্জিত নই। সবচে বড় কথা, আমরা তো টাকা নেয়ার জন্য কাউকে জোর করি না। বদরুদ্দীন উমর মজা করে বললেন, আগেকার মহাজনেরাও তাদের কাছ থেকে ঋণ নেয়ার জন্য কাউকে জোর করতেন না। গ্রামীণ ব্যাংক কেবল ঋণের ফি হিসেবেই ৮ কোটিরও বেশি টাকা এর সদস্যদের কাছ থেকে সংগ্রহ করেছে। এই টাকা এবং সুদের টাকা শেষমেষ এগুলো যায় কোথায়? ভাল প্রশ্নই করেছেন বদরুদ্দীন উমর। বদরুদ্দীন উমর সব বিষয়েই প্রবন্ধ লিখেছেন মার্কসীয় অভিধানে যেসব বিষয় মানব শোষণের হাতিয়ার বলে পরিচিত সাম্রাজ্যবাদ, প্রতিক্রিয়াশীলতা, বুর্জোয়াতন্ত্র প্রভৃতি।
ঢাকার রাস্তার লম্বা ট্রাফিক জ্যাম দেখে কি বোঝা যায়? সেটা কি বাংলাদেশের উন্নয়নের নিদর্শন নাকি হতাশ হওয়ার? আমি মনে করি দুটোই নব্য ধনিক শ্রেণীরা গাড়ি কিনছে কিন্তু সেই সাথে পাল্লা দিয়ে সরকার নতুন অবকাঠামো গড়ে তুলতে পারছে না। আসলে ট্রাফিক বিশৃঙ্খলা কখন তৈরি হয়? ট্রাফিক বিশৃঙ্খলা দেখা যাওয়া মানে বুঝতে হবে শহরের মধ্যবিত্ত শ্রেণীর গাড়ি কেনার সামর্থ্য আছে। তবে ট্রাফিক বিশৃঙ্খলার জন্য যে নগরীর রিকশার বড় ভূমিকা রয়েছে তা ভুললে চলবে না। তারা একটা কাজ খুব ভালোমতো পারে একটু সুযোগ দিলেই বাবলার আঠার মতো রাস্তায় জ্যাম বাঁধিয়ে দেবে। ট্রাফিক জ্যামের জন্য দেরি হওয়াকে এখন আর কেউ অজুহাত বলে মানতেই চায় না। ফলে যাদের দেরি হয় তাদেরকে চেষ্টা করতে হয় তাড়াতাড়ি ঘুম থেকে ওঠার। নগরীর স্বাভাবিক রূপটির দেখা মেলে একমাত্র সাপ্তাহিক ছুটির দিনগুলোতে। এই সমস্যার কেবল একটিই সমাধান রয়েছে, তা হলো সাপ্তাহিক ছুটি তিনদিনে বৃদ্ধি করা এবং সেটা পর্যায়ক্রমে ভাগে ভাগে দেয়া। শহরের এক অংশে একদিন ছুটি থাকবে, অন্য অংশে আরেক দিন। কাজের দিনগুলোতে শুধু অর্ধেক জনগোষ্ঠী কাজ করবে। এতে উৎপাদন বেড়ে যাবে প্রায় দ্বিগুণ।
এবার একটি গোপন ঘটনার কথা বলা যাক। বাংলাদেশে নিযুক্ত ব্রিটিশ হাই কমিশনার কিছু উচ্চ পর্যায়ের নির্বাচিত অতিথিকে ডিনারের আমন্ত্রণ জানালেন। এটার মধ্যে অস্বাভাবিকতার কিছু নেই। হাই কমিশনাররা তাদের দেশের কর্মকাণ্ডের অংশ হিসেবে মাঝেসাঝেই এরকম ভোজের আয়োজন করে থাকে। মজার ব্যাপার হলো ভোজ অনুষ্ঠানটা অসম্পূর্ণ রয়ে গেল। কারণ যার সম্মানে এ আয়োজন তিনিই এলেন না। কারণ কী? নিরাপত্তার কারণে তিনি নাকি আসলেন না। আর সেই সম্মানিত অতিথি হলেন ব্রিটিশ পররাষ্ট্র সচিব ডেভিড মিলিবেন্ড। সাবাই নাম জানলাম কীভাবে? কারণ সব পত্রিকাতেই সকালে পররাষ্ট্র সচিবের ছবি দেখা গেছে। বর্তমানে নিরাপত্তার বিষয়টি একটি হাস্যকর অবস্থায় এসে দাঁড়িয়েছে। ব্রিটিশ হাই কমিশনের নিরাপত্তাওয়ালাদের কি ধারণা ছিল আমন্ত্রিত অতিথিদের মধ্যে কেউ একজন ভেতরে ভেতরে সন্ত্রাসী? যে কিনা সম্ভাব্য সুস্বাদু খাবারের কথা মুখ-ঢাকা কোনো বেনামী সন্ত্রাসীর কাছে ফাঁস করবে? আমি জানি না এই আমন্ত্রণ পেয়ে কারও মধ্যে ভয় কাজ করেছিল কিনা। তবে এটা জানি অনেকের এ ঘটনা শুনে হাসতে হাসতে পেট ফাটার যোগাড় হবে।
এম জে আকবর ভারতীয় কলামিস্ট, দ্য এশিয়ান এইজ’র সম্পাদক।