মাই আর্কিটেক্ট

পেনসিলভানিয়া রেলস্টেশন। মার্চ ১৭, ১৯৭৪। পুরুষদের  অপেক্ষমাণ কক্ষে একটি মৃতদেহ পাওয়া গেল। কে না কে মরে গেছে। কে আর এত গা করে। মৃতদেহ হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হলো। তিনদিন পর্যন্ত সেই মৃতদেহ কেউ শনাক্ত করতে এলনা।শনাক্ত করার উপায়ও ছিলনা। লোকটি তার পাসপোর্টের ঠিকানা এমনভাবে কেটে দিয়েছিল সেখান থেকে বাড়ির ঠিকানা বের করা সম্ভব ছিল না। ভেতরে কী কষ্ট ছিল লোকটির কে জানে। অবশ্য তিনদিন পর লোকটির পরিচয় যখন উদ্ধার হল এবং পত্রিকায় মৃত্যু সংবাদ বেরুল সারা আমেরিকায় তো বটেই, পুরো বিশ্বেই হইচই পড়ে গেল। কারণ লোকটি আর কেউ নয়, খ্যাতনামা স্থপতি লুই আই কান।

এভাবেই শুরু হয়েছে মাই আর্কিটেক্ট তথ্যচিত্রটি। রেলস্টেশনের যে জায়গাতে লুই কানের মৃতদেহ পাওয়া গিয়েছিল সেই জায়গা এবং পত্রপত্রিকার কাটিং দেখিয়ে তার মৃত্যুর ঘটনা এভাবে তথ্যচিত্রটিতে তুলে ধরা হয়েছে। লুই কানের মৃত্যুর ৩০ বছর পর তার জীবনীভিত্তিক এই তথ্যচিত্রটি নির্মাণ করেছেন ন্যাথানিয়েল কান। কে এই ন্যাথানিয়েল কান? নাম শুনেই বলে দেয়া যায় তিনি নিশ্চয়ই লুই কানের পুত্র হবেন। ব্যাপারটা আবার এত সহজও নয়। সবাই জানত তার কোনো ছেলে নেই। একটিই মাত্র স্ত্রী। কিন্তু লুই কানের মৃত্যুর পরে জানা গেল কাগজে-কলমের বাইরে তার আরও দুই নারীর সঙ্গে সম্পর্ক ছিল। একজন অ্যান টিং, অন্যজন হ্যারিয়েট প্যাটিসন। এই হ্যারিয়েট প্যাটিসনের গর্ভে জন্ম নেয় ন্যাথানিয়েল কান। লুই কান যখন মারা যান ন্যাথানিয়েলের বয়স তখন মাত্র ১১।

মাই আর্কিটেক্ট তথ্যচিত্রটি ন্যাথানিয়েল কানের জবানে বর্ণিত। এখানে তিনি আমেরকিা ও আমেরিকার বাইরে লুই কানের করা বিখ্যাত বিল্ডিংগুলো তুলে ধরেছেন এবং লুই কানকে যারা চিনতেন তাদের সঙ্গে কথা বলেছেন। এ নিয়েই মাই আর্কিটেক্ট।

লুই কানের প্রথম গুরুত্বপূর্ণ কাজ হচ্ছে ইয়েল ইউনিভার্সিটি আর্ট গ্যালারি। এটা তার নিরীক্ষাধর্মী স্ট্রাকচারাল কাজ বলে বিবেচিত। এর পরের দুটি কাজেও তিনি মেধার স্বাক্ষর রাখেন। সে দুটো হচ্ছে ইউনিভার্সিটি অব পেনসিলভানিয়ার রিচার্ডস মেডিকেল রিচার্স বিল্ডিং এবং ক্যালিফোর্নিয়ার সল্ক ইনস্টিটিউট। লুই কানের অন্য বিখ্যাত কাজগুলো হলো নিউ জার্সির জুইশ কমিউনিটি সেন্টার বাথ হাউস, নিউইয়র্কের ফার্স্ট ইউনিটেরিয়ান চার্চ, পেনসিলভানিয়ার এর্ডম্যান হল, নিউ হ্যাম্পশায়ারের ফিলিপস এক্সেটার একাডেমি লাইব্রেরি এবং আমেরিকার বাইরে যে কাজটি লুই কানকে অধিক পরিচিত করেছে সেটি বাংলাদেশের জাতীয় সংসদ ভবন।

এবার লুই কানের জন্মবৃত্তান্ত একটু জানা যাক। তার জন্ম তখনকার রাশিয়ার অধিভুক্ত এস্তনিয়া দ্বীপের কুরেসারেতে ১৯০১ সালের ২০ ফেব্রুয়ারি। তার পরিবার ইহুদি। ১৯০৬ সালে তার পরিবার আমেরিকায় অভিবাসী হয়। সেখানে গিয়ে তারা আর্থিক দুরবস্থার শিকার হন। অবস্থা এমন দাঁড়ায় যে, লুইয়ের লেখার পেন্সিলও তার বাবা কিনে দিতে পারেননি। ১৯১৫ সালে তার পরিবার তাদের সবার নাম পাল্টে ফেলে। লুই কানের আগের নাম ছিল ইটজে লেইব সকমুলিওয়াস্কি।

তথ্যচিত্রটিতে লুই কান সম্পর্কে একটি বিষয় একেবারেই পরিষ্কার এবং এখানে যেসব ব্যক্তির সাক্ষাৎকার নেয়া হয়েছে তারা সবাই একবাক্যে বলেছেন, লুই কান ছিলেন কাজপাগল মানুষ। তার সফলতার পেছনের কারণও একটিই। কাজ ছাড়া তিনি কিছু বুঝতেন না। কাজের কাছে দুনিয়ার অন্য সবকিছুই তার কাছে গৌণ বলে বিবেচিত। তা সে হোক না বউ-ছেলেমেয়ে। হুটহাট কয়েকদিন লুই কানের কোনো পাত্তাই পাওয়া যেত না, কেউ কোনো খোঁজ পেত না। এমনই ছিলেন ব্যক্তি লুই কান। কয়েকদিন পর তিনি যখন বাসায় আসতেন, জিজ্ঞেস করলে বলতেন কাজে ব্যস্ত ছিলেন। এমনকি ভালো কাজ পেলে তিনি টাকার কথাটাও চিন্তা করতেন না। টাকা কম দেবে না বেশি দেবে, সেসব নিয়ে মোটেই মাথা ঘামাতেন না। মাথা ঘামাতেন কী করে একটি সুন্দর স্থাপত্য নির্মাণ করতে পারবেন।

পুরো তথ্যচিত্রটি দেখে খুবই জীবন্ত মনে হবে এ কারণে যে, ন্যাথানিয়েল কান ক্যামেরা নিয়ে এমন কিছু মানুষের কাছে গেছেন যাদের সঙ্গে সত্যিকার অর্থেই তার প্রথমবার সাক্ষাৎ। যেমন এক ইহুদি ধর্মীয় নেতার কাছে তিনি গেলে তাকে মুখের ওপর জিজ্ঞেস করা হলো লুই কানের তো কোনো ছেলে ছিল না। সে এল কোত্থেকে। নাথানিয়েল তখন তার হাসপাতালের জন্ম সনদ তাকে দেখালেন। তারপর লোকটি কথা বলতে রাজি হলো।

লেখাটা শেষ করি লুই কানের মৃত্যুর ট্রাজেডি দিয়েই। লুই কান ভারত থেকে মাত্র আমেরিকায় ফিরেছেলেন। পেনসিলভানিয়ায় রেলস্টেশনে গিয়েছিলেন বাড়ির ট্রেন ধরার জন্য। কিন্তু বাড়ি আর তার যাওয়া হলো না। ডাক্তাররা বলেছিলেন, হার্ট অ্যাটাকে তার মৃত্যু হয়। কিন্তু পাসপোর্টে নিজের ঠিকানা তিনি কেটে দিয়েছিলেন কেন? জানা গেল, ধার-দেনায় জর্জরিত হয়ে দিশেহারা ছিলেন এই বিশ্বখ্যাত স্থপতি।