কেন লিখি

প্রথম গল্প লেখার স্মৃতি দিয়েই শুরু করি। ইন্টারমিডিয়েটর পর। ঠিক করলাম গল্প লিখব। কিন্তু কী গল্প? কী নিয়ে হবে সেটা? প্লট কী? আকাশ-পাতাল ভাবতে লাগলাম। তবু প্লট খুঁজে পাই না। ঘটনা তো কতই চারপাশে ঘটে, কিন্তু তার মধ্যে লেখার মতো একটু আলাদা রকমের ঘটনা তো চাই। নাহ, আমার বোধ হয় দেখার চোখই নাই। শরৎবাবু কত কী নিয়ে লিখেছেন, কত বৈচিত্র তার লেখায় (সে সময় খুব শরৎ পড়তাম)! আর সেসব তো এম্নি এম্নি হয়নি, উনি কত ঘুরেছেন বেড়িয়েছেন, বোহেমিয়ান জীবনযাপন করেছেন, সন্নাসী হয়েছেন। তার মানে গল্প লিখতে হলে আমাকেও ঘুরতে হবে, বেশি বেশি মানুষের সাথে মিশতে হবে, জীবনকে বুঝতে হবে। এসব ভাবতে ভাবতে এর মধ্যে একদিন মায়ের মুখে শুনলাম আমার ফুফুর পরিচিত কোন এক মহিলা নাকি আত্মহত্যা করেছে। পারিবারিক কোন্দলের জের ধরে। ব্যাপারটা খুব লেখার মতো একটা ঘটনা মনে হল। ফুফুর বাড়ি একই এলাকায় ছিল। দেরি করলাম না, সেদিনই ফুফুর বাড়িতে যাই। কিছুক্ষণ কথাটথা বলার পরেই সে প্রসঙ্গ। আমি খুটিয়ে খুটিয়ে জিজ্ঞেস করতে লাগলাম। ফুফু এক-দুই প্রশ্নের উত্তর দেয়ার পরেই চোখ কুঁচকে আমাকে জিজ্ঞেস করেন, হঠাৎ এগুলা জিগাইতাছছ ক্যান? এইসব জাইনা তুই কী করবি? আমি আমতা আমতা করি, নাহ, এম্নেই। এর দুদিন পরে সন্ধ্যায় মা আমার কাছে জানতে চান, কী প্রয়োজনে সেই আত্মহত্যা-করা মহিলার কথা জানতে আমি ফুফুর বাসায় গিয়েছিলাম? কী মুশকিল রে বাবা! গল্পের প্লট খোঁজা তো কম হ্যাপা না। ভেবে দেখলাম মা-ফুফুর এরকম আচরণই স্বাভাবিক। যে আমি সাধারণত ফুফুর বাড়ি যাই না, সেই আমি সেদিন অনেকক্ষণ থেকে ওই ঘটনা জানতে চেয়েছি। এতে মা-ফুফুর আমার প্রতি অন্যরকম সন্দেহ হওয়াই তো স্বাভাবিক। অতএব, বুঝে নিলাম, এইভাবে ঘি উঠবে না। গল্প লিখতে হলে চারপাশে যেসব ঘটনা ঘটে ওসব নিয়েই নিজের কল্পনার ভেতর ভাঙচুর করে তবে বানাতে হবে। অবশেষে একটি পারিবারিক নির্যাতনের কাহিনী নিয়ে লিখে ফেললাম এক গল্প। এই হল আমার গল্প লেখার শুরু। এখন বুঝি গল্প লিখতে কাহিনী কোনো ঘটনা না, লিখতে জানলে সবকিছু নিয়েই লেখা যায়। কত হাজার হাজার ঘটনা, প্লট এখন মাথার ভিতর ঘুরপাক খায় অথচ লেখার সময় হয় না।
এইবার আসা যাক, আমি গল্প কেন লিখি? জগতে এত এত কাজ থাকতে এই সাহিত্য কেন? প্রথম উত্তর, মানুষ মাত্রই নিজেকে প্রকাশ করতে চায়। নিজের শ্রেষ্ঠত্ব, দক্ষতা অন্যের কাছে জাহির করতে চায়। সেই প্রাচীন কালের কথাই ধরা যাক, মানুষ তখন গুহার দেয়ালে ছবি আঁকত। নিজের ভালো লাগাকে এঁকে সবার মাঝে ছড়িয়ে দিত। অন্যেরা নিশ্চয়ই তখন সেই শিল্পীকে বাহবা দিত। সেসব শিল্পীর জীবনকাল কয় বছরই বা ছিল? কিন্তু তাদের কাজ? হাজার হাজার বছর ধরে বেঁচেছে। তার মানে সৃজনশীলতা মানুষকে অমরত্ব দান করে। মানুষ অমর হতে চায়, সেটাই স্বাভাবিক। যতই সৃষ্টিকর্তার কথা বলা হোক, পরকালের লোভ দেখানো হোক, পৃথিবীর মায়া কি কেউ কাটাতে পারে? মানুষ মাত্রই চায় তার মৃত্যুর পর সবাই তাকে মনে রাখুক। শরৎবাবুর দেবদাসের শেষকথার মতো বলতে হয়, একজন মানুষ মারা গেল অথচ তার জন্য কেউ চোখের জল ফেলল না, এমন হতভাগা আর কে আছে? মানুষ পৃথিবীতে তাদের সন্তান-সন্ততি রেখে যায়। ভাবে, তাদের মাধ্যমে নিশ্চয়ই তারা বেঁচে থাকবে। এই বেঁচে থাকাটাই হল আসল কথা। কেউ বেঁচে থাকে সৃজনশীল কাজের মাধ্যমে, কেউ তার মানবীয় গুণাবলীর কারণে, কেউ নিজেকে বিলিয়ে দিয়ে, কেউবা পৃথিবীর ঘৃণার পাত্র হয়ে অথবা কাউকে সবাই হয়ত একদম ভুলে গেল, সেও তো এক রকমের বেঁচে থাকা। তবে তার মানে এ নয় যে মানুষের সৃজনশীল কাজ বা বড় কোনো কাজের উদ্দেশ্য অমরত্ব পাওয়া। নিজের ভাল লাগাকে মানুষ অন্যের সঙ্গে ভাগাভাগি করে এই যা। পরবর্তী সময়ে তার একার ভাল লাগা হয়ত সকলের ভাল লাগা হয়ে ওঠে। এভাবেই তো একজন সম্মানীয় হয়ে ওঠেন।
এইবার আসি কী লিখব, কেন লিখব নিয়ে। নিয়তের মধ্যেই সমস্ত বরকত বলে ইসলামে একটা কথা আছে না? কথাটা পুরোপুরি সত্য। উদ্দেশ্যের ওপরই নির্ভর করে প্রাপ্তি। মানুষ চাইলে পারে না এমন কিছু নাই, যদি সেটা চাওয়ার মতো চাওয়া হয় এবং সেই অনুযায়ী কাজ করা হয়। কেউ যদি লেখালেখি শুরু করে এই ভেবে যে লেখালেখি করে ব্যাপক জনপ্রিয় হবে, টাকা কামাবে; তবে সে সেই রকমই সফল হবে। আবার দেখা গেল কোনো লেখকের উদ্দেশ্য একজন বড় মাপের লেখক হবে, তথাকথিত জনপ্রিয়তার সে ধার ধারে না। তবে সে সেরকমই পাবে। আবার পৃথিবীতে যেহেতু কোনো কিছুই ধ্র“ব না, মানুষের উপলব্ধি, চাওয়া-পাওয়া পরিবর্তন হতেই পারে। মিশেল ফুঁকো যেমন বলেছেন, আজ তিনি যে মতাদর্শে বিশ্বাস করেন কাল সেটাকে তিনি ভুলও বলতে পারেন। কারণ গতকাল পর্যন্ত জ্ঞানের রাজ্যে তার যতটুকু দৌড় ছিল তাতে মনে হয়েছে সেটা সত্যি, কিন্তু আজকে তার উপলব্ধির জগৎ যখন আরো প্রসারিত তখন মনে হচ্ছে সেটা ভুল। লেখকের ক্ষেত্রেও এমন হতেই পারে। একজন প্রতিষ্ঠিত লেখক, যার বেশ জনপ্রিয়তা আছে, ডাকনাম আছে। প্রকাশকরা তার বইয়ের জন্য লাইন দেন। দুহাতে লেখক টাকা কামাচ্ছেন। হঠাৎ হয়ত একদিন একটি ঘটনা তার ভেতরে এমন নাড়া দিল যে তার ভেতরটা চুড়মার হয়ে গেল। তিনি উপলব্ধি করলেন, এসব কী পাঠক-ঠকানো ছাইপাশ লিখছেন। এমন কোনো মহৎ সাহিত্য তো রচনা করেননি যে মৃত্যুর পর মানুষ তাকে মনে রাখবে। তিনি মরলে তো এসব লেখা সবাই ডাস্টবিনে ছুড়ে ফেলবে। এই ভাবনার পর লেখক কেমন কুকঁড়ে গেলেন। আগের মতো ফি বছর দুই-তিনটা বই লেখেন না। যাও একটা লেখেন তা পাঠক-প্রিয়তা পায় না। লেখক কিন্তু তাতে বিন্দুমাত্র দুঃখিত নন। তিনি জানেন যে বইটা তিনি এত সময় দিয়ে লিখলেন সেটা একটা মাস্টারপিস হয়েছে। এখন পাঠক তার মূল্য না বুঝলেও ভবিষ্যতে ঠিকই বুঝবে। তো যা বলতে চাচ্ছিলাম, নিয়তের ওপরে যেমন বরকত নির্ভর করে তেমনি লেখক কোন মাপের লেখক হতে চান সেটাও তার চাওয়ার ওপর নির্ভর করে। আমরা জানি লেখক অনেক টাইপের হতে পারেÑবড় লেখক, মাঝারি লেখক, ছোট লেখক, জনপ্রিয় ধারার লেখক, পরিচিতি পাওয়ার জন্য লেখক, এমন আরো কত কী। এই তো সেদিন শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায় বাংলাদেশে এসে বললেন, দুনিয়ার সমস্ত লেখাই লেখা হয়ে গেছে, কিছুই বাকি নেই। এখন আমরা যেটা করি নতুন মাত্রায়, নতুন শব্দে, নতুন চিন্তায় ভিন্নভাবে উপস্থাপন। লেখালেখি করতে আসলে দুনিয়ার তাবৎ লেখককে প্রতিদ্বন্দ্বী ভাবতে হবে। আর নয়ত নতুন কিছু করা সম্ভব হবে না। প্রকৃত লেখক হতে চাইলে সেটাই সত্যি। একটা সময় আমি এসব নিয়ে ভাবতাম না। কিন্তু এখন ভাবি। কেবল কি লেখক হওয়ার জন্যই লেখা? ভাবি আমি একটা গল্প লিখব, সেটা কেন লিখব? মানবসমাজের সেটা পড়ে কী লাভ হবে? বস্তাপচা জিনিস লিখে তাদের সময় নষ্ট করার অধিকার তো আমার নাই। সেদিন এক লেখকের সঙ্গে হাঁটতে গিয়ে তিনি একটা কথা বললেন। বললেন, প্রকৃত লেখক হতে গেলে আগে প্রকৃত মানুষ হতে হবে। শুনে আমার ভেতরে একটা ভূমিকম্প হয়ে গেল। আমি মানুষ হিসেবে কতটা বড় হতে পেরেছি যে বড় লেখক হওয়ার স্বপ্ন দেখব? একটা গল্প ফেঁদে কিছু পৃষ্ঠা ভরলেই কি লেখক হওয়া যায়? এসব ভাবতে গিয়ে লেখালেখি বন্ধ হওয়ার যোগাড়! কিন্তু নিয়মিত না লিখলে হবে কেমন করে? লেখালেখি তো বড় রকমের অনুশীলন। কেউ তো একদিনে আর লেখক হয় না, একটু একটু করে সারাজীবন ধরে লেখক হয়। আমার ছোট্ট মাথায় যেটা মনে হয়, তা হল প্রতিটি লেখকেরই তার লেখা নিয়ে ভাবা উচিত। কী লিখব, কেন লিখব, কাদের জন্য লিখব, কতটুকু লিখব। এবং আরো বড় ব্যাপার হচ্ছে সবসময় নিজের ভেতর প্রকৃত মানুষ হওয়ার তাগিদ থাকতে হবে।

৯ বৈশাখ ১৪১৫