গল্প

  • অমুক ক্লাব

    ভদ্রলোক বললেন তিনি বাংলা লিখতে পারেন না। আমেরিকাতে পিএইচডি করেছেন। একটা প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ভিসি। ইউরোপ-আমেরিকা-অস্ট্রেলিয়া তার প্রায়ই যাতায়াত।
    রাজশাহীর লোক। উচ্চারণে আঞ্চলিকতা পুরো মাত্রায়। কানে বাজে যখন ইংরেজি শব্দও তার এই রাজশাহীয় টানে বের হচ্ছিল। কথার এক ফাকে জানালেন ম্যানেজম্যান্টের একটা বই লিখছেন। আমার কেমন একটু বোধ হল। জিজ্ঞেস করলাম, ‘বাংলায়?’ তখনি তার সেই জবাব, ‘আরে না না, বাংলা আমি লিখতে পারি না।’ বলে ঠোঁটের কোণে খানিক হাসির মত করলেন। যার অর্থ হতে পারে ওনার ক্যালিবার সম্পর্কে আমার আসলে কোন ধারনাই নাই।
    একটু বাদে ওনার স্টাডি রুমে নিয়ে গেলেন। রায়মা, যার সাথে এখানে আসা, দেয়ালের দিকে তাকিয়ে গদ্গদ হয়ে বলে উঠল, ‘স্যারের দেখি বইয়ের ভাল কালেকশন।’ ঘরের একপাশে দেয়ালের পুরোটাই উপর থেকে নিচ অব্দি শেলফ করেছেন। বইয়ের কালেকশনে চোখ ঘুরিয়ে ঠোঁটের কোণে সেই হাসিটাই আনি যেটা ভদ্রলোক একটু আগে আমার প্রশ্ন শুনে দিয়েছিলেন। কোন স্থানে গিয়ে সেখানকার মানুষের পাঠক-রুচি ও বিদ্যার দৌড় নাকি বোঝা যায় বইয়ের দোকানগুলোতে ঢুঁ মারলে। ভদ্রলোকের কালেশনের একশভাগের পচানব্বইভাগই ইসলামী বইপত্র এবং তা অধিকাংশই বাংলায়। কেবল নিচে শেলফের এক কোণায় বেমানানভাবে পড়ে আছে ম্যানেজম্যান্টের কিছু ইংরেজি বই। বোঝা যাচ্ছে ভদ্রলোক বাংলা লিখতে না পারলেও বাংলায় পড়তে বেশ স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করেন।
    ধাক্কাটা খেলাম পরদিন। আমার বন্ধু ও সহকর্মী রায়মার ফোন, ‘আচ্ছা, মোড়ক উন্মোচনের ইংরেজি কি?’ ‘বুক লঞ্চিং,’ বললাম। সেই ভদ্রলোক, মানে প্রফেসর ডক্টর মোঃ মন্তাজ উদ্দিন রায়মাকে এইমাত্রই ফোন করে নাকি ইংরেজিটা জানতে চেয়েছেন। বই লেখার বাংলাটা না হয় ভুলে গেছেন তিনি, তাই বলে ইংরেজিও!
    মন্তাজ সাহেব একটা আন্তর্জাতিক সেবা প্রদানকারী ক্লাবের সদস্য। বিশ্বের দুইশটির বেশি দেশে যার শাখা রয়েছে। সেই ক্লাবের হয়ে একটি ফোরাম গঠন করেছেন নিজে। অতএব প্রেসিডেন্টও তিনি। ব্যাপারটা কোন সোশ্যাল সাইটের মত, নিজে রেজিস্টার্ড হয়ে অন্যদের ঢুকতে আমন্ত্রন জানানো। মন্তাজ সাহেবের অনুরোধে রায়মা সেখানে সদস্য হয়েছে; আমাকেও পিড়াপীড়ি করছে। এখানে ঢুকে লাভ কি? উত্তরে রায়মা জানায়, এই মাঝে মাঝে অনুষ্ঠান হয়, বিদেশে কনফারেন্সে যায়। আমার এক প্রতিবেশিও এই ক্লাব করে। সে বলল, আসলে মূল লাভ নেটওয়ার্ক তৈরি হয়, সেবাটেবা নাম মাত্র। আমিও সেবার মহান ব্রত বাদ দিয়ে কিছু উদ্দেশ্য হাসিলের জন্যই ঢুকতে রাজি হলাম। রায়মা বলল, সামনেই দক্ষিণ এশিয়াতে, তারপর ইউরোপে কনফারেন্স আছে। চাইলে মন্তাজ সাহেব নিয়ে যাবেন, কেবল যাওয়া-আসার ভাড়া লাগবে। তাছাড়া, এখন উনি যে নতুন প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়টিতে আছেন, যেটি আমার বাসার কাছাকাছি, চাইলে সেখানে একটা ব্যবস্থা করা যাবে। রায়মার নেটওয়ার্কিং দক্ষতা দেখে আমি মুগ্ধ। দেশটাই চলছে মামা-চাচার জোরে! অতঃপর দুজনে একদিন ভদ্রলোকের বাসায় গেলাম সদস্য হওয়ার মানসে।
    পথে যেতে যেতে ভদ্রলোক সম্পর্কে অনেক কথা বলে রায়মা। তরুণ সংসর্গ পছন্দ করেন। তিনি যখন আমাদের বর্তমান বিশ্ববিদ্যালয়টির ভিসি ছিলেন তখন তার বাসায় মাঝে মাঝে দাওয়াত দিয়ে খাওয়াতেন। সরকারের একটি মন্ত্রনালয়ে চাকরি করতেন; রিটায়ার করেছেন। টাকাপয়সা ভালই কামিয়েছেন। ধানমণ্ডিতে তিনতলা বাড়ি। ভাড়া দেন না, নিজেরাই থাকেন।
    কিন্তু ভদ্রলোককে দেখে ও কথা বলে বুঝলাম আমার উদ্দেশ্য হাসিল হওয়ার সম্ভবনা একেবারেই ক্ষীণ। মন্তাজ সাহেব নতুন বিশ্ববিদ্যালয়টির পার্টটাইম শিক্ষক মাত্র। এবং আদতে আগের বিশ্ববিদ্যালয়ে তিনি ছিলেন প্রো-ভিসি। রায়মার কথার ফাকটাও বোঝা গেল। সে বলেছিল, ‘তুমি আসার আগে আমাদের এখানে যিনি ভিসি ছিলেন তিনি এখন অমুক নতুন বিশ্ববিদ্যালয়ে গেছেন।’ এ থেকে আদৌ কি বোঝার উপায় আছে নতুন বিশ্ববিদ্যালয়ে উনি ভিসি হিসেবে নাই? ওনার ডিমোশন হয়েছে?
    নেহায়েৎ অশোভন দেখায়, তাই সদস্য হওয়ার টাকাটা দিলাম। আমি ও আমার স্ত্রীর—দুজনের। বউকে ফেলে একা ঘুরতে বিদেশ যাব, এ কেমন কথা? পরদিনই মন্তাজ সাহেবের ভুলে ভরা ইংরেজি টেক্সট আসে মোবাইলে। ক্লাবের নতুন সদস্যদের নিয়ে আসছে শুক্রবার গুলশানের একটি ক্লাবে সন্ধ্যায় অনুষ্ঠান। ছেলেদের সবাইকে স্যুট-টাই পরে যেতে বলা হয়েছে। টেক্সটের শেষে ভুল বানানে উল্লেখ করা, ‘Delitious dinar will be served.’’
    অনুষ্ঠান শুরু হল দেড়ঘণ্টা দেরিতে। আমাদের টেবিলের সুদর্শন একজন ঘোষকের দায়িত্ব পালন করার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। হাতে তার মন্তাজ সাহেবের লেখা ঘোষণাপত্র—ইংরেজিতে। শুরুতে ওয়েলকাম বানানটাই ভুল। আরও চোখ বুলিয়ে দেখলাম, কেবল যে বানান ভুল তাই নয়, ব্যাকরণগত ভুলও কম নয়। মাথার ভেতরে মন্তাজ সাহেবের সেই কথাটা তখন বেজে উঠল, ‘আমি বাংলা লিখতে পারি না।’
    ঘোষণা কানে আসতেই বজ্রপাতের মত চমকে উঠলাম। কখনো বাংলা, কখনো ইংরেজিতে বলছে। ইংরেজি বাদই দিলাম, বাংলাও শুদ্ধ উচ্চারণ করতে পারছে না। প্রোগ্রাম হয়ে যাচ্ছে ‘ফ্রোগ্রাম’, চিফ ‘ছিফ’, চার্টার ‘ছার্টার’ ইত্যাদি ইত্যাদি। কানে অসহ্য যন্ত্রণা হতে লাগল। শুনেছি এই ক্লাব করে সব ধনী ব্যক্তিরা। সদস্যপদ রাখার জন্য বছরে কমপক্ষে পাচহাজার করে চাঁদা দিতে হবে। এই তার নমুনা! রাত দশটারও বেশি সময় ধরে ক্লাবের প্রেসিডেন্ট, সেক্রেটারি, অমুক অ্যাডভাইজর, তমুক ট্রেজারারসহ জন পনের বক্তব্য রাখলেন। আশ্চর্যজনকভাবে একজনও পাওয়া গেল না যিনি শুদ্ধ বাংলা বলতে পারেন। উচ্চারণে ভয়াবহ সমস্যা। অথচ তারা সবাই বড় বড় পদে কর্মরত।
    এর মাঝে আমাদের নতুন সদস্যদের ক্রেস্ট, ব্রশার, ফুলের তোরা ইত্যাদি দেয়া হল। রায়মার কাজ থাকায় আগেই বের হয়ে গেছে। আমার স্ত্রী বলল, ‘আমি জানতাম এখানে কি হয়। তোমাকে আগেই বলেছিলাম।’ ‘তাহলে,’ আমি জিজ্ঞেস করি, ‘এরা এখানে আসে কেন?’
    আমার স্ত্রী ব্রশারটা খুলে বিভিন্ন সদস্যদের পেশা দেখিয়ে বলে, ‘ধান্ধা। দেখ, এই যে উপস্থাপনা করছে লোকটা, সে একটা ইন্সিউরেন্স কম্পানিতে চাকরি করে। এই যে তিনজন ডেভেলপার কম্পানির চাকুরে। সরকারি চাকুরে যারা আছেন, সবারি বড় বড় পদ।’
    ‘মানে নেটওয়ার্ক বাড়িয়ে প্রফেশনাল লাইফকে এগিয়ে নেয়া—অর্থনৈতিকভাবে লাভবান হওয়া?’
    ‘ঠিক তাই।’
    ‘কিন্তু অনেক মহিলাও তো আছে—’
    ‘ও আল্লা, শোননি? মহিলাগুলো শাড়ি-গয়না নিয়ে আলাপ করছে? কেউ কেউ আছে সিঙ্গেল। ওরা আসে সঙ্গি খুঁজতে।’
    আমি হতাশ হই, ‘তাহলে, এই চ্যারিটি আর মানবসেবা!’
    ‘সবাইকে এক পাল্লায় মাপা ঠিক হবে না। অনেক বয়স্ক লোক আসেন কিছু একটা নিয়ে ব্যস্ত থাকার জন্য। কিছু নিঃসঙ্গ মানুষ আসেন বন্ধু বাড়াতে।’
    ঘড়ির কাটা দশটা ছুঁতেই স্ত্রী বলে, ‘চল উঠি, একঘেয়ে, বিরক্তিকর বাজে উচ্চারনের ভাষণ শেষ হবে না। মন্তাজ সাহেবের ডেল্লিশাস ডিনার শুরু হতে বহু দেরি।’
    বীতশ্রদ্ধভাবে উঠে আমরা হাঁটা দিলাম। লিফটের কাছে পৌঁছতে ভেতর থেকে এক ভদ্রলোক ছুটে এলেন। জানালাম, রাত হয়ে যাচ্ছে, কাল জামাতের হরতাল। আমাদের গাড়ি নেই। ডিনার শুরু হতেও বেশ দেরি। ‘আরে না না,’ তিনি অমায়িকভাবে বললেন, ‘এই শেষ বক্তা, এখনি ডিনার শুরু হবে। আমার গাড়ি আপনাদের পৌঁছে দেবে—ও নিয়ে ভাববেন না।’ তিনি আমাদের একটা টেবিলে এনে বসালেন। টুকটাক কথাবার্তা বললেন, ভিজিটিং কার্ড দিলেন। ইঞ্জিনিয়ার, সিটি কর্পোরেশনে চাকরি করেন। বুফে ডিনার কিছুক্ষণ বাদে সত্যিই শুরু হল।
    দ্রুত খাওয়া শেষ করে আমরা মন্তাজ সাহেবের কাছ থেকে বিদায় নেই। সিটি কর্পোরেশনের লোকটিকে কোথাও দেখলাম না। কিন্তু রাস্তায় নামতেই তাকে পাওয়া গেল। ভদ্রলোকের নিজের গাড়ি, ড্রাইভারকে বললেন, ‘তুমি ওনাদের নামিয়ে দিয়ে বাসায় চলে যেও।’ উষ্ণ ধন্যবাদ জানিয়ে গাড়িতে উঠলাম।
    ফাকা রাস্তায় গাড়ি সাই সাই চলে। স্ত্রী ক্রেস্ট খুলে দেখছে। আমাদের দুজনকে একটি ক্রেস্ট দিয়েছে বলে এম্নিতেই আমার মেজাজ খারাপ। আমার নাম লিখে নিচে ‘অ্যান্ড স্পাউস’ দিয়ে লিখেছে স্ত্রীর নাম। অথচ দুজনই সমান টাকা দিয়েছি। আলাদা ক্রেস্ট কেন দেবে না? মিছিমিছি কেন আরেকজনকে হেয় করা? ‘অ্যান্ড স্পাউস’ দিয়ে আমার নাম নিচে লিখলে কি আমি মেনে নিতাম? এখানে মূল কাজটাই বলতে গেলে ব্রশার ও ক্রেস্ট তৈরি, এবং একটু পরিকল্পনা—এতেই মন্তাজ সাহেব লেজে গোবরে এক করে ফেলেছেন।
    ‘এই দেখেছ,’ স্ত্রী বলে, ‘তোমার আমেরিকার পিএইচডি করা মন্তাজ সাহেবের কাণ্ড?’
    ‘কি?’
    ‘ক্রেস্টে যে দুই-চারটা শব্দ আছে, ওতেও বানান ভুল। সেলিব্রেশন লিখেছে ‘Celebaration’, ফার্স্ট লিখেছে ‘Frist’।’
    ‘অ্যাঁ !’ আমার আক্কেল গুড়ুম অবস্থা।
    ‘আরও আছে। ক্লাবের যে লোগোটা বানিয়েছে ওর বাংলা স্লোগানটা দেখ।’ দেখলাম ওতে লেখা ‘‘মৌলিক গুণাবলীর লালন করুন’’।’
    আমার হাসি আসে না। বরং বুকের ভেতর কষ্ট অনুভব হয়। একটা লোক যে ইঞ্জিনিয়ার, এমবিএ করা, তারপর আমেরিকা থেকে ডক্টরেট করেছেন বলে দাবি করেন—এই তার জ্ঞান! যে ব্রশার আমাদের দেয়া হয়েছে সেটা খুললেই প্রথম পাতায় অর্ধেকের বেশি তার বড় একটা ছবি, নিচে ইংরেজিতে (ভুল তো আছেই) সারা জীবনের বৃত্তান্ত। ‘প্রফেসর ডক্টর মোঃ মন্তাজ উদ্দিন, অমুক মন্ত্রণালয়ে ডায়রেক্টর জেনারেল হিসেবে কাজ করেছেন, বর্তমানে দুইটি বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যাজাঙ্কট প্রফেসর, সাবেক প্রো-ভিসি, সাবেক ট্রেজারার, সাবেক ডিন, সাবেক চেয়ারম্যান ও ডিপার্টমেন্ট হেড অফ অমুক অমুক বিশ্ববিদ্যালয়...। তিনি ভ্রমণ করেছেন (২০টি দেশের লিস্ট)।...’
    আমার কানের ভিতর কেবলি বাজতে থাকে তার সেই স্বীকারোক্তি, ‘আমি বাংলা লিখতে পারি না।’
    ফাল্গুন ১৪১৯

  • তাহার কথা

    ‘ব্যাপারটা কি?’ ডাক্তার জিজ্ঞেস করেন।
    ‘মানে...’ মেয়েটি ঘাড় গুঁজে এক নখ দিয়ে আরেক নখ খোঁচায়, ‘হাজব্যান্ডের সাথে আমার কখনো ওইসব হয়নি।’
    ডাক্তার স্থির চোখে মেয়েটির দিকে তাকান, কিছু পড়ার চেষ্টা করেন, ‘তোমরা কি একসাথে ঘুমাতে?’
    ‘হুম’। মেয়েটি হ্যাঁ বোধক মাথা নাড়ে।
    ‘সে কি সমকামী?’
    ‘আমি জানি না।’
    মেয়েটি আবার নখ খোঁচায়। বেশ মলিন মুখখানি। বয়স উনিশ-বিশ। বেঁটেখাটো। ঘাড় নেই বললেই চলে। পরনে জিন্স আর কামিজ। নাম কুসুম। গত আট-নয় মাস ধরে সে মানসিকভাবে স্বাভাবিক নেই। জামাই সিলেটী-বাংলাদেশী। পারিবারিকভাবে দেশ থেকে বিয়ে করে এনেছিল। চলে যাচ্ছিল একরকম। ঝামেলার শুরু বিয়ের মাস ছয়েক পর; কুসুম যখন স্বামীর কাছে প্রতিনিয়তই ব্যাপারটা নিয়ে কথা উঠায়। একদিন এ নিয়ে বাকবিতণ্ডা হলে শ্বশুর-শাশুড়ি শুনে ফেলে। তারা মেয়ের বাপ-মা’কে ফোন দেয়—এ মেয়ে ভাল না, তারা রাখবে না। লন্ডনে মেয়ের যে দূর সম্পর্কের চাচা আছে সে যাতে এসে মেয়েকে নিয়ে যায়।
    কুসুমকে তাই করতে হয়। চাচার বাসায় আপাতত ওঠে বটে। কিন্তু লন্ডনে কেইবা বসিয়ে বসিয়ে খাওয়াবে? দেশে ফিরে যাওয়াও চরম লজ্জার, অপমানের। মানসিকভাবে ভয়ানক ভেঙ্গে পড়ে কুসুম। আত্মহত্যার চেষ্টা চালায়। পরবর্তীতে তার স্থান হয় মুসলিম এইড সেন্টারের কেয়ারে।
    লি ইউনিটের একটি রুমে তিনজন বসে আছি। ডাক্তার কুসুমকে প্রশ্ন করেন। বাংলায় তা কুসুমকে বুঝিয়ে বলি। কুসুম উত্তর দেয়। সেটি আবার ইংরেজিতে ডাক্তারকে জানাই। এই আমার কাজ—ইন্টারপ্রেটিং। মাঝে মাঝেই সেন্ট অ্যান হসপিটালে অ্যাসাইনমেন্ট পড়ে। এই হসপিটালে লন্ডনের মেন্টাল হেলথ কেয়ারের বড় বিভাগ রয়েছে।
    কথার ফাকে ফাকে ডাক্তার কাগজে নোট নেন। কুসুমের হাজব্যান্ডের বিষয়ে ডাক্তার কি বুঝলেন কে জানে। ওই প্রসঙ্গের পর জিজ্ঞেস করেন, ‘কুসুম, আমি জেনেছি মুসলিম এইড সেন্টার ছেড়ে আসার পর তোমার মন আরও খারাপ।’
    ‘হ্যাঁ।’ কুসুম চোখ তোলে, ‘ওখানে আরও বাঙালি মেয়ে ছিল, কথা বলতে পারতাম। এখন যে হোস্টেলে থাকি এখানে বাঙালি কেউ নাই। খুব একলা লাগে।’
    মোটামুটি সুস্থ হওয়ার পর মুসলিম এইড সেন্টার থেকে সরকারিভাবে কুসুমকে হোস্টেলে থাকার ব্যবস্থা করা হয়। ভিসার কিছু জটিলতা ছিল, সেসবও মুসলিম এইড সেন্টার আইনজীবী দিয়ে সমাধান করে দেয়।
    ‘এক্ষেত্রে কি করা যায়?’ ডাক্তার বলেন, ‘মুসলিম এইড সেন্টার তো স্থায়ী কোন ব্যবস্থা না, ইমারজেন্সি অবস্থায় তোমাকে সেখানে রাখা হয়েছিল। তুমি কি দেশ থেকে ঘুরে আসতে চাও?’
    ‘না’ কুসুমের দ্রুত জবাব। ‘দেশে গেলে আমি মুখ দেখাব কিভাবে; আমার পরিবারও সবার কাছে ছোট হয়ে যাবে। আমার ছোটবোনের বিয়ে হবে না। দেশে আমি যেতে চাইনা।’
    ‘সেক্ষেত্রে, বাঙালি নারীদের জন্য কিছু রিক্রিয়েশন সেন্টার আছে, যেখানে মাঝে মাঝে গেলে অনেকের সাথে পরিচয় হবে, কথা হবে। যাবে এমন এক জায়গায়?’
    ‘জানি না। ইচ্ছা করে না।’
    ডাক্তার ছোট্ট করে শ্বাস ফেলেন, ‘আচ্ছা, তোমার এখন কি কি সমস্যা হয় বলতো।’
    ‘কোন কিছুই ভাল লাগে না’, কুসুম থেমে থেমে বলে, ‘মনে জোর পাই না, সবকিছু ভুলে যাই। রাস্তায় হাঁটার সময় হঠাৎ হঠাৎ মাঝখানে চলে যাই; টের পাই না। রাতে ঘুম হয় না।’
    এই হোস্টেলে ওঠার পর কুসুম হাত কেটে আরেকবার আত্মহত্যার প্রচেষ্টা চালায়। ডাক্তার কুসুমকে তাই একটা ইমারজেন্সি নাম্বার দেন, যেটা ২৪ ঘণ্টা খোলা। যখনি খুব খারাপ লাগবে সেখানে ফোন দিতে পারবে। সপ্তাহের প্রতি সোমবার এখানে এসে ডাক্তার দেখানো আর আগের দেয়া ওষুধগুলো চালিয়ে যেতে বলে আজকের সেশন শেষ হয়। হসপিটাল থেকে রাস্তা চিনে হোস্টেলে যেতে পারবে না বলে ডাক্তার কুসুমকে একটি ট্যাক্সিরও ব্যবস্থা করে দেন।
    আমি বাড়ির পথ ধরি। সেন্ট অ্যান হসপিটালটা এমন এক জায়গায় যেখানে হাঁটা ছাড়া উপায় নাই। ইলশেগুঁড়ি বৃষ্টি হচ্ছে। হাতে ছাতা আছে, কিন্তু খুলতে ইচ্ছা করছে না। চিন্তায় প্রচ্ছন্নভাবে এখনো কুসুমের বিষণ্ণ মুখ। মেয়েটা! না আছে কোন বন্ধুবান্ধব, কথা বলার মানুষ, না পারে ইংরেজি। এসময় একটা সঙ্গি খুব দরকার। এক্কেবারে একা একটা মানুষ বাঁচে কিভাবে? দেশ থেকে কুসুমের মতো স্বল্পশিক্ষিত মেয়েকে ছেলেবউ করে লন্ডনে আনার কারণটা সহজেই বোধগম্য। এরা সাত চড়ে রা করবে না, যা বলা হবে তাই করবে, নিজের অধিকার বিষয়ে কোন ধারণা নাই, ইংরেজি না জানায় ঘরের চার দেয়ালেই সে বন্দী, এবং আরও সুবিধা বেকার দেখিয়ে তার নামে সরকারি বেনেফিট তোলা যাবে।
    অদ্ভুত বিষয় হল, এই পর্যন্ত যত মানসিক রোগীর ইন্টারপ্রেটিঙে গেছি, একজন ছাড়া বাকি সবাই নারী। এবং সবার সমস্যার ধরনও প্রায় একরকম। স্বামীর সংসারে শারীরিক ও মানসিকভাবে নির্যাতিত; দেশ থেকে আসা এবং নিঃসঙ্গ। ডাক্তার তাদের যেসব প্রশ্ন করেন সেসবও আমার প্রায় জানা— আপনি কি (অলৌকিক) কোন শব্দ বা কথাবার্তা শোনেন? আপনার কি মনে হয় অন্যরা আপনার ক্ষতি করার চেষ্টা করছে? আপনার মরে যেতে ইচ্ছা হয়? রাতে ঘুম হয়? ইত্যাদি ইত্যাদি।
    বাসায় এসে দেখলাম মইনভাই তখনো বের হয়নি। সে কয়েকমাস হল স্টুডেন্ট ভিসায় ইংল্যান্ডে এসেছে। পার্মানেন্ট কোন কাজ এখনো জোটাতে পারেনি। বিষণ্ণতায় ভোগে। মজা করে বললাম, ‘মইনভাই, একটি মেয়ের খোঁজ পেয়েছি। ভিসা স্ট্যাটাস ‘ইন্ডেফিনেট লিভ’।বিয়ে করবেন নাকি? তাহলে আপনারও সমস্যা আসান, মেয়েটিও বেঁচে যায়। ভেবে দেখেন, বিয়ে করলে ব্রিটিশ পাসপোর্ট। রাতদিন কাজ করবেন, খালি টাকা আর টাকা।’
    আমি খুলে বলি। মইনভাই বলে, ‘মেয়ের নাম্বার দেন।’
    ‘নাম্বার তো জানি না। নরদাম্বারল্যান্ডের কাউন্সিল হোস্টেলে থাকে। ওখানে গিয়ে দাঁড়িয়ে থাকবেন, মেয়ে বের হলে কথা বলবেন। তারপর প্রেম শুরু।’
    ‘ধুর মিয়া’। মইনভাই বেরিয়ে যায়।
    এরপর মাস দুই পেরিয়ে গেছে। ভিক্টোরিয়াতে ‘ব্লু ক্রস’ এনিম্যাল হসপিটালে নাইট কিউরেটরের কাজ করি কখনো কখনো। রাত ৮টা টু সকাল ৮টা। কাজ শেষে বের হয়ে সকালের ঠাণ্ডা বাতাসটা চমৎকার লাগে। সারারাত নির্ঘুম কাটানোর পর এ বাতাস যেন সমস্ত ক্লান্তি ঝেড়ে ফেলে। টিউবে উঠে গা এলিয়ে দিয়ে পাশে পড়ে থাকা ফ্রি ‘মেট্রো’ পত্রিকাটা তুলে নেই। খবরের বড় অভাব এদেশে। প্রথম পাতার হেডলাইন করেছে এক সেলিব্রেটির বয়ফ্রেন্ড নিয়ে। অলসভাবে পাতা উল্টে যাচ্ছি। একটা ছোট্ট খবরে চোখ আটকে যায়—‘ভ্যান কিলস ইন্ডিয়ান গার্ল’। খবরটায় লিখেছে, গতকাল সন্ধ্যায় আঠার-উনিশ বছরের একটি ইন্ডিয়ান মেয়ে রাস্তা পার হতে গিয়ে নরদাম্বারল্যান্ড অ্যাভেন্যুতে ভ্যানের ধাক্কায় মারা গেছে। ভ্যান চালক জানিয়েছে, মেয়েটি হুট করে তার গাড়ির সামনে এসে পড়ে, তার কোন দোষ ছিল না। পুলিস মেয়েটির সাথে কোন পরিচয়পত্র খুঁজে পায়নি। তবে দুর্ঘটনাস্থলের সামনের এক চিকেন-চিপসের দোকানি বলেছে, মেয়েটিকে সে আগে দেখেছে, তবে কোথায় থাকে জানে না। তার ধারণা মেয়েটি ইন্ডিয়ান বা বাংলাদেশী হবে।
    আমি স্তম্ভিত হয়ে বসে থাকি। চোখের সামনে একটি ছোট্ট বিষণ্ণ মুখ দুলতে থাকে। আমি জোর দিয়ে বলি, ‘এ নিশ্চয়ই সে নয়!’

    আশ্বিন ১৪১৯

  • বিড়ালনামা

    এক সকালে নাস্তার টেবিলে অবন্তি শুভকে জানায় সে একটা বিড়াল পালবে। কথাটা শুনে আমের জেলি মিশিয়ে পাউরুটি খেতে-থাকা শুভর মুখ হঠাৎ থেমে যায় এবং একই সাথে চোখ ছোট করে তাকায়। অবন্তি তখন তার হঠাৎ-জাগা এমন খেয়ালের কারণটা লাজুক হেসে শুভর কাছে খোলাসা করে। গতরাতে ঘুমের মধ্যে নাকি তার অনেক খাটাখাটনি গেছে। স্বপ্নে একটি বিশাল ধেড়ে ইঁদুরের দাবড়ানি খেয়ে সে যে কত শত মাইল দৌড়িয়েছে তা একমাত্র আল্লাই জানেন। বাস্তবে এমন দৌড় দিতে পারলে অনায়াসে তার নাম গিনেস বুক অব ওয়ার্ল্ডে চলে যেত। দৌড়াতে দৌড়াতে যখন তার একেবারে জান যায় যায় অবস্থা, আর কিছুক্ষণ বাদেই সে মুখ থুবড়ে পড়বে এবং ইঁদুরটাও তার ওপর হামলে পড়বে প্রায়, ঠিক এমন সময় কোত্থেকে একটি বিড়াল আচমকা এসে ইঁদুরটাকে ধরে ফেলে তাকে বাঁচাল।
    স্বপ্নের গল্পটা শুনে শুভ ঘর ফাটিয়ে হাসতে লাগল, তাহলে তুমি স্বপ্নে বাণী পেয়েছ যে বিড়াল মানুষের বিপদে উদ্ধারকারী?
    শুভর হাসির বাহার দেখে অবন্তির গা জ্বলে যায়, দ্যাখো, আমার স্বপ্নের ঘটনা অনেক সময় সত্যি হয়। ঘুমের থেকে ওঠার পরই আমার শরীর-হাত-পায় প্রচণ্ড ব্যথা। আবার ডান পায়ের একটা আঙুলে ফোস্কাও পড়ে গেছে। এত না দৌড়ালে কি এসব হত?

    কাঁটাবনে শুভর এক বন্ধুর পেট এ্যানিমেলের দোকান আছে। সপ্তাহ খানিকের মধ্যে সেখানে একটি মাঝারি সাইজের বিড়াল পাওয়া গেল। কাশফুলের মতো সাদা বিড়াল। বাড়িতে আনার পর অবন্তির খুশি আর দেখে কে? কাজের লোকদের ওপর তখনই মুহুর্মুহ হুকুমজারি হতে লাগল এই তাড়াতাড়ি দুধ নিয়ে আসো, কাচা দুধ না, হালকা গরম করে এনো, নাইলে যদি আবার ডায়রিয়া হয়ে যায়! আর জমিলা, তুমি তাড়াতাড়ি মাছ ভাজো, ইলিশ মাছ ডিপ থেকে নামাও।
    সব মিলিয়ে একটা হুলস্থূল ব্যাপার। বিড়ালটি খাওয়ার ফাঁকে ফাঁকে ভীত-সতর্কভাবে আড়চোখে চারপাশ তাকাচ্ছিল। অবন্তি খুশিতে চেচিয়ে ওঠে, কী সুন্দর করে খাচ্ছে, দ্যাখো! কেমন একটা বাঘ-বাঘ ভঙ্গি না?
    শুভ হেসে বলে, বাঘ-বাঘ তো লাগবেই, বিড়াল বাঘের খালা না?
    বিড়ালটার একটা নাম রাখা হল। অনেক খোঁজাখুঁজি করে, নামাভিধান ঘেঁটে-ঘুঁটে। লিও। শুভ আপত্তি জানাল, আরে মেয়ে বিড়ালের জন্য এটা তো পুরুষালী নাম হয়ে গেল। অবন্তি বলল, ধুর, নামের ক্ষেত্রে এখন আবার ছেলেমেয়ে কি?
    কদিন লিওকে নিয়ে চলল ঘরে জম্পেশ আড্ডা-আলোচনা। কাজের মহিলা দুইজনার মুখেও লিওর কথা:
    বুঝছছ জমিলা, বড়লোকের কাম দেখলে হাস আহে। এই বিলাইটার দাম বলে পাঁচশো টাকা। আরে রাস্তায়-ডাস্টবিনে কত বিলাই, আমারে বিশ টাকা দিলেই তো আমি একটা ধইরা আইনা দিতাম।
    জমিলা বলে, বড়লোকে তো টাকা ফালানের জায়গা পায় না, বোঝ না? নাইলে বিলাইও বলে মাইনষে টাকা দিয়া কিন্না আনে! ছিঃ!
    সারাক্ষণ আদরে আদরে থেকে দুদিনেই লিও অবন্তির খুব ন্যাওটা হয়ে গেল। একেবারে পায়ে পায়ে ঘোরে। মাঝে মাঝে হাঁটার সময় অবন্তির দু পায়ের ফাঁকে ঢুকে গেলে তখন অবশ্য হাঁটতে অসুবিধা হয়, তবুও ভাল লাগে অবন্তির। সব সময় পেয়াদার মতো সাথে সাথে একজন থাকা। আর অবন্তিও লিওকে ফেলে এক দণ্ড থাকে না, কোন কিছু খায় না। ভালো খাবারদাবার অতিরিক্ত খেয়ে কয়েকদিনেই লিও বেসম্ভব মুটিয়ে গেল। বড়লোকের বাড়ির বিড়াল বলে সহজে চেনা যায়।
    লিও-অবন্তির এমন গলায় গলায় পিরিত দেখে শুভ বলে, এখন তো তোমার লিওকে আমার হিংসা হচ্ছে। ও যতক্ষণ তোমার সংস্পর্শ পায় আমি তো তার একশ ভাগের এক ভাগও পাই না।
    কী যে তুমি বল না, লিওর সাথে তোমার তুলনা?
    কেন করব না? ও ব্যাটা সারাক্ষণই তোমার সুন্দর হাতের আদর পায়, আর আমার চুলে কতদিন যে তুমি হাত বুলিয়ে দাও না সে খবর আছে?
    অবন্তি হেসে ফেলে, লিওকে জিজ্ঞেস করে, কিরে তুই বলে আমার জামাইর প্রতিদ্বন্দ্বী?
    লিও ক্ষীণস্বরে অবন্তির চোখের দিকে তাকিয়ে জানায়, মি-উ।
    অবন্তিু খুশিতে চেচিয়ে ওঠে, জানো ও কি বলল? বলল, তোমার জামাই আমার সতীন।
    শুভ ভ্রু কুঁচকায়, কী? এতো বড় কথা। খাল কেটে বাড়িতে আমি কুমির আনলাম? এখন আমাকেই তাড়াতে চায়, না? দাঁড়াও, লাঠি কোথায়, লাঠি দাও একটা।
    এই এই, আমার লিওকে ভয় দেখাবে না। কোলে তুলে লিওকে দুহাতে আড়াল করে অবন্তি, আমার লিও সোনা খুব ভালো।
    বিড়ালের প্রতি অবন্তির কখনোই তেমন দুর্বলতা বা ভাল লাগা ছিল না, সেদিক থেকে বরং কুকুরের প্রতি খানিকটা ছিল এবং ‘হলে ভাল না হলেও ক্ষতি নাই’ ধরনের একটা ইচ্ছা ভিতরে ছিল একসময় কুকুর পালবে। আর ঘটনা কিনা ঘটল উল্টাটা? লিওর পিঠে হাত বুলাতে বুলাতে অবন্তি ভাবে, বিড়াল কী সুন্দর একটা প্রাণী, সে আসলে আগে বিড়ালকে ভালমতো লক্ষই করেনি, আর মানুষও আছে, বেহুদা বিড়ালের বদনাম করে! তার লিও দেখতে কী কিউট! নরম শরীরে মসৃণ মিহি সাদা চকচকে লোম, কেমন রাজকীয় ভঙ্গিতে নিঃশব্দে হাঁটে, লেজটা কী সুন্দর করে নাড়ায়, আদর দিলে মায়া-মায়া কণ্ঠে মিয়াও মিয়াও করে!
    লিওর এমন জামাই-আদর দেখে কাজের লোকদের চোখ টাটাতে লাগল। একদিন লিওকে একা পেয়ে জমিলা একটা কষে লাথি মারে। মনে মনে গজরায়, শওতান বিলাই, আমার তিন বছরের পোলাডায় এট্টু দুধ পায়না খাইতে আর তুই ডেলি এক কেজি কইরা দুধ গিলছ। ভাগ শয়তান।
    অবন্তিদের এপার্টমেন্টের ফ্ল্যাটগুলোতে লিওর খবর পৌঁছতে দেরী হয়নি। তারা আড়ালে-আবডালে অবন্তির একটা নামও দিয়ে দিল বিলাইআলি।

    দেড় মাস পরের কথা।
    আশ্চর্য হলেও সত্য অবন্তির লিওপ্রীতির চিত্র এখন পুরো বিপরীত। লিওর প্রতি তার মহাউৎসাহ একটু একটু করে কমতে কমতে এখন তলানিতে এসে ঠেকেছে। কিন্তু লিও তা মানবে কেন? সে বেচারি আগের মতোই অবন্তির পিছে ঘুরঘুর করে, সুযোগ পেলে কোলে উঠে বসতে চায়, এককেজি দুধ কেন একপোয়াতে এসে ঠেকল মিউ মিউ করে তার কৈফিয়ত চায়, আগের মতো অবন্তির কম্বলের তলায় ওম চায় ইত্যাদি ইত্যাদি। আর অবন্তি? লিওর মিউ শুনলেই এখন তার কপালে বিরক্তির ভাজ পড়ে। যা, সর সর, সারাক্ষণ বেহায়ার মতো পিছে ঘুরঘুর করে, কোথাও বসে একটু শান্তি নাই, যা বেরো ঘর থেকে। বলে লিওকে বহু কষ্টে রুম থেকে তাড়িয়ে অবন্তি দরজা লাগিয়ে দেয়। লিও বেচারি মন বেজার করে একা একা এঘর-ওঘর করে। কাজের মাতারি দুটার সামনে সে ভুল করেও পড়তে চায় না, খুব সাবধানে থাকতে হয়, আর পড়ে গেলেই লাত্থি-উষ্টা থেকে তার রেহাই নাই।
    লিওর প্রতি এমন অবহেলা দেখানোর পিছনে অবন্তি কতগুলো যুক্তি দাঁড় করিয়েছে। এক. বিড়ালটা বাথরুম সারতে প্রতিদিন দুবার করে বাইরে যায় (লিওর হাগামোতার কাম ফ্ল্যাটের ভিতরেই সারার জন্য অবন্তি এক বান্ধবির পরামর্শে একটা বিশাল টবে মাটি ভরে বারান্দায় রেখেছে। কিন্তু অনেক চেষ্টা করেও লিওকে এই সহবত দিতে পারে নি। ওসব কাজ সারতে লিওর নীচেই যাওয়া চাই)।এভাবে নীচে যেতে যেতেই কোথাকার এক নোংরা মর্দবিড়ালের সাথে তার খাতির হয়েছেপ্রায়ই আকাম-কুকাম করে আসে, যা অবন্তি একদমই সহ্য করতে পারে না। দুই. হুটহাট করে আর রাতে তো বটেই লিও অবন্তির বিছানায় উঠে কম্বলের উপরে বা নীচে ঢুকে আয়েশ করে শুয়ে থাকে। আগে অবন্তি ব্যাপারটা খুশিমনে মেনে নিলেও বাইরের বিড়ালটার সাথে মেশার পর থেকে লিওকে বিছনাতে উঠতে দেয় না। বাইরে গিয়ে পা নোংরা করে সেই পা নিয়ে তার বিছানাও নোংরা করবে, অসম্ভব! একারণে লিওকে কোলে তো নেয়-ই না, বরং ওর গায়ে হাত ছোঁয়াতেও তার আর মন টানে না। তিন. খাওয়ার সময় লিও অবন্তির প্রায় গা ঘেঁষে মিউ মিউ করতে থাকলে অবন্তি খেতে পারে না (আগে বিলকুল পারতো)।আগে অবন্তি যাই খেত তার কিছু অংশ লিওকে না দিয়ে , এখন খাওয়ার সময় লিওর চেহারা দেখলেই তার খাওয়ার প্রতি অভক্তি আসে।
    শুভ একদিন হাসতে হাসতে অবন্তিকে তার বিড়াল পোষার খেয়াল শেষ হতে চলেছে বলায় অবন্তি লিওর বিরুদ্ধে এইরকম বেশ ক’টি অভিযোগের ফিরিস্তি শুনিয়ে দিয়েছিল। শুনে শুভ মনে মনে হেসেছিল কারণ আসল ব্যাপার হল তার খেয়ালি বউটি বেশিদিন এক জিনিস নিয়ে মজে থাকতে পারে না।
    শুভর কথাই অবশেষে সত্যি হয়। এ বাড়ি থেকে লিওর ভাত ওঠে। জমিলাকে একদিন অবন্তি কড়া করে হুকুম দেয় লিওকে বাড়িছাড়া করতে, এই পাড়াবেড়ানো লাফাঙ্গা বিলাই সে আর ঘরে রাখবে না।
    জমিলা মহাখুশিতে কোত্থেকে একটা মোটসোটা ডাণ্ডা যোগাড় করল। লিও সকালের পর বাথরুম সারতে নীচে নামলে জমিলা ডাণ্ডা হাতে বারান্দায় এসে বসল। এই বারান্দাই হল লিওর যাওয়া-আসার পথ। অবন্তিরা থাকে দোতলার ফ্ল্যাটে। লিও বারান্দা থেকে লাফ দেয় উঁচু পাঁচিলে, পাঁচিল থেকে মাটিতে। আধঘণ্টা বাদে লিও পাঁচিল হতে লাফিয়ে যখন বারান্দার দেয়ালে উঠল, সামনে বসা জমিলাকে দেখেই সে থমকে গেল, বলা ভাল পিলে চমকে গেল কারণ জমিলার কোমল আচরণ সম্বন্ধে সে খুব ভাল অবগত। এক ঝলকেই লিও বুঝে গেল বারান্দার দরজাটি বন্ধ, এট্টু ফাঁক থাকলে না হয় বিদ্যুৎগতিতে এক লাফে ভিতরে ঢুকে পড়ার রিকস্টা নেয়া যেত। লিওর চোখের মণি নড়ছে দ্রুত। জমিলার চোখে চোখ রেখে আবার নীচে লাফ দেবে কিনা নিয়ে লিও যখন চিন্তিত তখন জমিলা খুব সাবধানে ডাণ্ডাটি হাতের মুঠিতে নেয়। একটা জুতমতো বাড়ি দিয়ে বিলাইটার হাড্ডি ভাঙাই তার ইচ্ছা। তাড়াহুড়া করে সে সুযোগ হারাতে চায় না।
    মুহূর্ত মধ্যে ধাম করে দেয়ালে একটা আওয়াজ হয়।
    শয়তানডা, পারলাম না। এই ডাণ্ডার বাড়ি তোরে আমি খাওয়ামুই নাইলে আমার নাম জমিলা না।
    এই প্রথম লিও পাঁচিল ছাড়া সরাসরি মাটিতে লাফিয়ে পড়ল আর পড়েই হাওয়া।
    ঘণ্টা দুই পর।
    অবন্তি ড্রইংরুমে বসে টিভি দেখছে। এমন সময় বারান্দার দরজায় কিসের ঘস ঘস শব্দ এবং একটু বাদেই শোনা গেল নীচুস্বরে লিওর কণ্ঠ মিয়াও, মিয়াও। অবন্তির মনটা আনমনা হয়ে গেল। কি করুণ কণ্ঠে বিড়ালটা ডাকছে, যেন তার নাম ধরেই। হ্যা, তাকেই তো ডাকছে, নাইলে সে এসে বসার পরই ডাকতে শুরু করল কেন? নিশ্চয়ই দুপুরে কিছু খেতে পায়নি। আহারে।
    বিলাইডায় আইয়া পড়ছে আফা? এইবার ছাড়ন নাই, এমন বাড়ি দিমু এক্কেরে বাপের নাম ভুইল্লা যাইবো।
    অবন্তি তাকিয়ে দেখে সামনে জমিলা ডাণ্ডা হাতে দাঁড়িয়ে। বারান্দার দরজার দিকে জমিলা এগোতেই অবন্তি হুঙ্কার দিল, খবরদার, লিওর গায়ে একটা বাড়িও দেবে না। তুমি যাও এখান থেকে। সালেহাকে বলো লিওর জন্য দুধ নিয়ে আসতে।
    পুরোনো আস্তানায় সহি সালামতে ফিরে এল লিও। আর অবন্তি অ্যালবাম বের করে লিওর সাথে তোলা ছবিগুলো নাড়াচাড়া করতে লাগল। এতদিন লিওর সাথে তার কত সুন্দর সব মুহূর্ত কেটেছে আর আজ সে এত পাষাণ হতে পারে কীভাবে? না না, লিওকে সে খেদাতে পারবে না, আদর-যত্ন না হয় নাই করল কিন্তু গলা ধাক্কা দিয়ে বিদায় করতে পারবে না।

    দুই.
    দশ বছরের লেবু মিয়াকে নিয়ে আম্বিয়া আর পারে না, প্রতিটা দিনই পোলাটার কাম দেখে রাগে তার মাথায় আগুন জ্বলতে থাকে তখন পাগলের মতো সে চিল্লাতে থাকে, হারামির বাচ্চা তুই নিজে পাছ না খাইতে আবার কুত্তার ছাওডারে খাওয়াছ? ফুটপাথে থাইকা এমন জমিদারি স্বভাব পাইলি কোহান থেকা? আরে ফকিরনির পুত তোর বাপ যে আরেক মাগিরে লইয়া ভাইগা গেছে, তোর মায় তোরে ভিক্ষা কইরা আইনা খাওয়ায়, এইডা মনে থাকে না?...
    এসব কথা লেবু মিয়ার এক কানের ফুটা দিয়ে ঢুকে আরেক কানের ফুটা দিয়ে বেরিয়ে যায়; সুতরাং মাথায় কিছুই অবশিষ্ট থাকে না। আজকে দুপুরে তাদের মায়ে-পোয়ের খাওয়া হিসেবে জুটেছে তিন টাকা দামের একটি করে পাউরুটি। লেবু মিয়া নিজের ভাগের পাউরুটিটা খাওয়ার ফাঁকে ফাঁকে কালু আর সাদুকেও ছিঁড়ে ছিঁড়ে দিচ্ছে। কুকুর ছানাটা কালো বলে লেবু এটার নাম রেখেছে কালু আর বিড়ালটা সাদা বলে সাদু। কালুটাকে এক্কেবারে পিচ্চি বয়স থেকে তিনমাস হলো পালছে লেবু, সাদুটাকে পরশুদিন থেকে।
    সাদুর বাচ্চা, তুই তো বহুত হারামি, কালুর খাওন খাছ কিল্লেগা? হালার পুত, কালু তো তোর চেয়া বড়ো, কই তোর খাওন তো থাপা দেয় না। হালা, নেতা হইয়া গেছো, না? সাদুকে হাল্কা একটা কানপট্টি দিয়ে লেবু শেষ রুটির টুকরাটা কালুকে দেয়।

    শুভ-অবন্তি দশদিনের জন্য ইন্ডিয়া গেছে। যাওয়ার আগে জমিলাকে বলে গেছে লিওকে এবার বের করে দিও, তবে মারধোরের দরকার নাই, বারন্দাটা ভালমতো বন্ধ রাখবে যাতে ঢুকতে না পারে। কিন্তু জমিলা তো জমিলা, সে দুই দিন লিওকে ‘দেখিবামাত্র’ এমন ডাণ্ডা চালায় যে ও বেচারি তৃতীয় দিন আর বাড়িতে ঢুকতে এক ছটাক সাহস পায়নি।
    অবন্তিদের এপার্টমেন্টের উল্টো পাশের রাস্তার ফুটপাতে আম্বিয়ার চার হাত বাই আড়াই হাতের খুপরিটা। লেবু মিয়ার সহজ আপ্যায়ন জুটে গেল লিওর ভাগ্যে। আর বোবা প্রাণীরাও অতি তাড়াতাড়ি বুঝে যায় কে তার শুভাকাঙ্খী। দুদিন লেবু মিয়ার লগে লগে রইল। আর যাবেই বা কোথায়? তৃতীয় দিন লেবু মিয়া কালুর মতো লিওকেও তার বন্ধু করে নিল।
    রাস্তার পাশের এই খোলা জায়গার খুপরিতে লিওর সবই সয়ে এলো কেবল ভাল খাওয়ার কষ্টটা ছাড়া। কিন্তু কী আর করা? বেশি খিদা পেলে খুপরির পাশে বসে শূন্য ঘোলা দৃষ্টিতে উল্টো পাশের দোতলার বারান্দাটার দিকে কাতর চোখে তাকিয়ে থাকে। যেখানে অবন্তি নাই আছে শুধু জমিলা আর তার বেরহম ডাণ্ডা।

    দশদিনের জায়গায় পনের দিনের দিন রাতে শুভ-অবন্তি ইন্ডিয়া ভ্রমণ শেষে ফিরে এল।


    তিন.
    অবন্তির ঘুম ভাঙল দুপুর বারোটায়। কাল রাতে বাড়ি ফিরে খেয়েদেয়ে সেই যে মরাঘুম দিয়েছে, শুভ কখন উঠে অফিস চলে গেছে টেরও পায়নি। বেশ একটা মোচড়া-মোচড়ি দিয়ে বিছনা থেকে নেমে দাঁড়াল সে। আর তখনই চোখ পড়ল ড্রেসিং টেবিলের ওপর ফটো স্ট্যান্ডটাতে। লিওকে কোলে নিয়ে হাসিমুখে সেখানে বসে আছে অবন্তি। আচ্ছা লিওটা এখন কোথায়? তার কথামত জমিলা নিশ্চয়ই তাড়িয়ে দিয়েছে। যাক আপদ গেছে। ফটো স্ট্যান্ডের ছবিটা পাল্টে অন্য কোন ছবি রাখতে হবে, ভাবতে ভাবতে বাথরুমে ঢুকে যায় অবন্তি। কিন্তু বিকালে বারান্দায় বসে দার্জিলিং থেকে আনা চায়ে দুটা চুমুক দিয়ে রাস্তার ওপাশের খুপরিটার দিকে তাকিয়ে যে দৃশ্যটা অবন্তি দেখে তাতে তার ভুরু কুঁচকে যায়। চেয়ার থেকে উঠে দাঁড়িয়ে বকের মতো মুখটা সামনে বাড়িয়ে দৃশ্যটা সে ভালমত খেয়াল করে। একটা নয়-দশ বছরের ছেলে কোলে বিড়াল নিয়ে খেলা করছে। একটু পর পর বিড়ালটাকে পাশের দড়ি বাধাঁ কুকুর ছানাটার পিঠে ছেড়ে দিয়ে হে-হে করে হেসে উঠছে। না, অবন্তির চোখ ভুল করার কথা না, পিচ্চিটা যে বিড়াল নিয়ে খেলছে সেটা লিও। এই কয়দিনে খুব শুকিয়ে আর গায়ের রঙটা ময়লা হয়ে গেলেও চেনা যায়। লেজের শেষটায় হালকা বাদামি রং, ডান পায়ের নীচের দিকেও তেমনি, এ-তো লিও না হয়ে যায় না। অবন্তির ভিতরটা হঠাৎ ছ্যাৎ করে উঠল কারণ পিচ্চিটা এখন লিওকে বুকে চেপে ধরে আদর করছে, ঠিক যেভাবে সে এক সময় আদর করত! অবন্তি সাথে সাথে ডেকে উঠল, জমিলা! জমিলা!
    জমিলা প্রথমে বিশ্বাসই করতে চাইল না। না আফা, হইতেই পারে না। বিলাইডারে এমন মাইর দিছি, অয় তো এই এলাকা ছাইড়াই গেছে গা।
    থামো, গেলে ওটা কি আকাশ থেকে এসেছে? আমার বাড়ির সামনে আমার পালা-বিড়াল নিয়ে ফকিরনির ছেলে আদর-সোহাগ করবে এটা সহ্য করা যায়?
    সহ্য যে করা যায় না সেটা বোঝা গেল এরপর থেকে অবন্তির নাই কারণে অসংখ্যবার বারান্দায় চলে যাওয়া দেখে। চোখটাকে সে আতশ কাচ বানিয়ে খুটিয়ে খুটিয়ে পর্যবেক্ষণ করে চলে লিওর সাথে ফকিরনির ছেলেটার মাখামাখি। দেখতে দেখতে অবন্তির চোখমুখ শক্ত হয়ে যায়। ডান হাত কচলাতে শুরু করে। না, কিছুতেই সহ্য করা যায় না। তার ফেলে দেয়া জিনিস তার সামনে আরেকজন মাথায় তুলে নাচবে, এ অপমান সে সহ্য করে কীভাবে? ফকিরনির ছেলেটার কোলে লিওকে দেখলেই মনে হয় ওরা দুইজন তাকে তামাশা করছে, বলছে, তোমরা দালানের লোকরা সব নিষ্ঠুর, এইখানে এই খুপরি ঘরে আমরা দুই দোস্তে দারুণ আছি, এইখানকার মানুষেরা তোমার মতো ছোটলোক না।
    অবন্তি ভয়ানক ক্ষেপে গেল। জমিলাকে সে পাঠিয়েছিল লিওটাকে ফেরত আনতে, ফকিরনির ছেলেটা দিল না, এমনকি টাকা সাধার পরেও না। অবন্তির জিদ চেপে যায়। যেভাবেই হোক লিওকে ঐ ফকিরনির ছেলেটার কাছ থেকে সে সরাবেই।
    বুদ্ধি খুলতে দেরী হয় না। পরদিনই অবন্তি দোকানে গিয়ে ইঁদুর মারা বিষ কিনে আনে। তারপর পরীক্ষার হলে এমাথা থেকে ওমাথা গার্ড দেয়া স্যারদের মতো কেবল ঘর-বারন্দা বারান্দা-ঘর করতে লাগল। তক্কে তক্কে থাকল কখন ফকিরনির বাচ্চাটা খুপরি ছেড়ে বাইরে যায়। দুপুরের দিকে সুযোগটা এসে গেল। খুপরির বাইরে তখন কেবল কুকুরটা আর লিও। অবন্তি দৌড়ে গেল ডাইনিংরুমে। কয়েক পিস পাউরুটির সাথে মেশাল বিষ, সবশেষে একটু গুড়ো দুধের প্রলেপ।
    বারান্দা থেকে রাস্তার ওপাশের খুপরিটা বিশ-পচিশ গজ দূরে। অবন্তি প্রথমে একটা পিস ছিঁড়ে ছিঁড়ে রাস্তায় ফেলে। কাজ হলো। লিও খাওয়া দেখতে পেয়েই ক্ষুধার্তের মতো দৌড়ে আসে। কিন্তু খেতে গিয়ে একটু শুকে কী মনে করে উপর দিকে তাকাল। অবন্তিকে দেখে কেমন যেন দ্বিধা করল। তবে খাওয়া শুরু করতে দেরি হলো না। দুধের ছোঁয়া দেয়া রুটি গপাগপ গিলতে থাকে লিও। উল্লসিত অবন্তি এক পিস এক পিস করে দ্রুত পাঁচটা পিস ছুড়ে মারে। এ লোভনীয় দৃশ্য দেখে খুপরির পাশে বাধা কুকুরটা রসি ছিড়ে রাস্তার এপারে আসার প্রাণপণ চেষ্টা করে আর চিকন গলায় অসহায়ের মতো কেউ কেউ করতে থাকে।
    লিওর খাওয়া শেষ হলে অবন্তি তার হিটলারী সফলতায় গর্বিত হয়ে ঘরের ভিতর চলে আসে।
    ঘণ্টা দেড়েক বাদে ড্রইংরুমে বসে দার্জিলিং-চা খেতে খেতে অবন্তি একটা মিহি কান্নার শব্দ শুনতে পায়। মুহূর্তে লাফিয়ে উঠে চলে যায় বারান্দায়। খুপরিটার দিকে চেয়ে অবন্তি স্পষ্ট দেখতে পায় লিওর নিথর দেহটি। ফকিরনির ছেলেটা সে মরদেহ কোলে নিয়ে করুণ স্বরে কাঁদছে, আমার বন্ধুরে..।
    দৃশ্যটা দেখে অবন্তির চোখ খুশিতে ঝিলিক দিয়ে ওঠে, আমোদে মনে মনে হাত তালি বাজায়। বিড়বিড় করে ছেলেটার উদ্দেশে বলে, দ্যাখ ফকিরনির বাচ্চা, আমি যা চাই করি, আমি কখনো হারি না।

    মে-অ-ও, মে-অ-ও..।
    বেশ রাত। অবন্তি শক্ত করে শুভকে কোলবালিশের মতো জড়িয়ে ধরেছে। অনেকক্ষণ হলো শুয়েছে তারা। শুভ ঘুমিয়ে পড়লেও অবন্তির ঘুম আসছে না। যদিও বালিশঘুম তার, বিছানায় মাথা ছোঁয়ালেই হয়। কিন্তু আজকে সে চোখ বুজতেই পারছে না। চোখ বন্ধ করলেই দেখে এক জোড়া হলুদ জ্বলজ্বলে চোখ তার দিকে কটমট করে তাকিয়ে। শুধু তাই নয়, আস্তে আস্তে হলুদ চোখের প্রাণী গরগর করে মৃদু আওয়াজ তোলে, মে-অ-ও, মে-অ-ও..।অবন্তি ভয় পেয়ে দ্রুত চোখ খুলে ফেলে। শুভকে জোরে আঁকড়ে ধরেপ্রায় ঘণ্টা দেড়েক ধরে এই চলছে এর মধ্যে দুইবার শুভর ঘুম ভেঙেছে। তার ঘুম আবার পাতলা। এবার তিনবারের মতো ভাঙলে শুভর মেজাজ খারাপ হয়ে যায়। অবন্তির হাত-পা-শরীর নিজের উপর থেকে ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে দেয়।
    উহ, এতো জোরে চেপে ধরছো মনে হচ্ছে মেরেই ফেলবে। আমার শ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে বাবা। তোমার হয়েছেটা কী বলোতো?
    অবন্তি গত দুবার কথাটা বলেনি, এবার সাহস করে জিজ্ঞেস করল, একটা বিড়াল ডাকছে, তুমি শুনতে পাচ্ছ?
    কে ডাকছে? হতভম্ব শুভ ঘুমজড়ানো ভাঙা-গলায় ভয়ানকভাবে চোখ কুঁচকে তাকায়, বিড়াল? কই নাতো।
    শুভ সন্দেহ-চোখে অবন্তির মুখ পড়তে চেষ্টা করে, তোমার কি মাথাটাথা খারাপ হয়েছে? এই মাঝরাতে বিলাই ডাকবে কেন? আর ডাকলে ডাকবে, রাস্তাঘাটে বিলাই-কুত্তার তো অভাব নাই। তোমার ঘুম তুমি ঘুমাও। যত্তসব! ঘুমাও। ধমকে শুভ ডানহাতে অবন্তিকে জড়িয়ে চোখ বোজে।
    অবন্তি শান্ত ছোট্ট মেয়ের মতো মাথাটা শুভর কাঁধ ঘেঁষে বাম হাতে তাকে ভালমতো আঁকড়ে ধরে। চোখ বুজে ঘুমাতে চেষ্টা করে। কিন্তু খানিক বাদেই চোখের মধ্যে জ্বলে ওঠে সেই জোড়া হলুদ চোখ। ভয়ে চোখ খুলে ফেলে। সেই সাথে অবন্তি পেটে একটা ভীষণ চাপ অনুভব করে। বুঝতে পারছে নিম্নচাপ সারতে এখন তার বাথরুমে যাওয়া দরকার। তবে একা একা বাথরুমে সে কিছুতেই যেতে পারবে না।
    মে-অ-ও, মে-অ-ও..।
    একি? বাথরুম থেকে ডাকটা আসছে না? ওটা কি এখন বাথরুমে এসে বসে আছে? হায় আল্লা! অবন্তির শরীরটা ভয়ানক কেঁপে ওঠে, শুভকে প্রচণ্ড জোরে আঁকড়ে ধরে সে।


    ফাল্গুন ১৪১৩

  • দেনা

    ব্যাপারটা লজ্জারই বটে। দুই দুই বার রফিক স্যার বাড়ি এসে টাকা চেয়ে গেছেন।
    আমার ছোট দুই ভাই এস এস সি পরীক্ষা দেবে। ওরা এলাকার ‘মিরপুর কোচিং’ নামে একটি কোচিংয়ে পড়েছিল। পরীক্ষা কাছাকাছি হওয়ায় পড়া শেষ হয়ে গেল। কিন্তু দুই মাসের টাকা বাকি পড়ে রইল। দুই হাজার টাকা। তখন পরিবারে খুব টানাটানি চলছে। অতএব মিরপুর কোচিংয়ের সত্বাধিকারী রফিক স্যারকে শেষপর্যন্ত টাকাটা আর শোধ করা হয় না। সেটা ২০০২ সালের কথা। এখন ২০০৮। ইতোমধ্যে ছয় ছয়টি বছর পেরিয়ে গেছে। এই ইতোমধ্যে রফিক স্যারের সঙ্গে আমার বেশ কয়েক বার দেখা হয়েছে। প্রতিবারই ওনাকে দেখামাত্রই মুখ ঘুরিয়ে ফেলেছি। ভাব করেছি দেখিই নি। অথবা কাছাকাছি কোনো গলি থাকলে সেখানে ঢুকে পড়েছি। পাওনাদার এড়াতে মানুষ যা করে আর কী। তবে গত বছর এলাকার একটি সেলুনে একেবারে তার মুখের ওপর পড়ে গেলাম। দৃশ্যটা এরকম : চেয়ারে বসা আমার শরীরের উর্দ্ধভাগ কাফন-সাদা কাপড়ে মোড়ানো। নাপিত আমার চুল কাটছে। এমন সময় সেলুনে একজন ঢোকে। আয়নায় চোখ পড়তেই দেখি আমার পাশেই দাঁড়ানো রফিক স্যার। ক্ষণিকের জন্য চোখাচোখি। তারপর যা করতে হয় দ্রুত চোখ নামিয়ে ফেলি। চোখ তো বটেই মাথাও নিচু করে আড়ালের চেষ্টা করি। অবশ্য ভেতরে ভেতরে আমি তখন ভয়ানক কুঁকড়ে যাচ্ছিলাম। একটা লোক যার সঙ্গে আমার পরিচয় আছে, চোখাচোখি হল, আমার চেয়ারের পাশে সে দাঁড়ানো, অথচ আমি তার সাথে কথা বলতে পারছি না। চোরের মতো নিজেকে লুকিয়ে ফেলছি। কী লজ্জা! আমার কানে এল তিনি নাপিতকে জিজ্ঞাসা করছেন, কখন আসলে খালি পাব? তারপর বেরিয়ে যান। আমি হাঁপ ছেড়ে বাঁচলাম।
    রফিক স্যারের সঙ্গে আমার মুখোমুখি কথা হয়েছিল দুইবার। একবার তার কোচিংয়ে ভাইদের পড়াশুনার অবস্থা জানতে আমি নিজেই গিয়েছিলাম। তখনই পরিচয়। আরেকবার আমাদের বাড়িতে উনি যখন টাকা চাইতে আসেন তখন। দুইবারের সাক্ষাতে মোটামুটি তার সাথে একটা সম্পর্ক দাঁড়ায়। কথাবার্তা হয়। ওনার সম্বন্ধে জানি। জানি ওনার কোনো চাকরিবাকরি নাই। এই কোচিংই সম্বল। আর টিউশনি করেন। জগন্নাথ কলেজ থেকে গণিতে পাস করেছেন। বয়স ৩৪-৩৫।বিবাহিত। বউ নিয়ে কোচিংয়ের ভিতরেই থাকেন।
    তো রফিক স্যারের কাছে দেনা হওয়ার পর যে কয়বারই তাকে এড়িয়ে গেছি প্রতিবারই মনে মনে ঠিক করেছি নিজের আর্থিক অবস্থাটা একটু সুস্থির হলে টাকাটা শোধ দিয়ে আসব। এই সুস্থির সময়টা আসল ছয় বছর পরে সেদিন। এটা শুনে আপনার মনে হতেই পারে, মাত্তর দুই হাজার টাকা শোধ দিতে ছয় বছর লাগল? এতটাই খারাপ অবস্থা! আদতে ব্যাপারটা তা না। যখন ওনার কাছে টাকাটা দেনা হয় তখন সমস্যা ছিল বটে তবে মাস ছয়েক পরে সেটা শোধ দেওয়া সম্ভব ছিল। কিন্তু যা হয়। নিম্ন মধ্যবিত্ত পরিবার। টানাটানির সংসার। টাকাটা যেহেতু সময়মতো শোধ দেওয়া হয়নি, দেব দেব করে আর দেওয়াও হয় না। সংসারে এক প্রয়োজন যায় তো আরেক প্রয়োজন এসে দাঁড়ায়। আমি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ি। টিউশনি করে নিজের খরচ চালাই। আমারও তো কিছু সাধ-আহ্লাদ আছে। আমার কষ্টের টাকা দিয়ে ভাইরা কবে কোথায় পড়েছিল তার দেনা শোধ করতে হবে কেন? তাছাড়া প্রায় মাসে আমি নিজেই ধারে পড়ে যাই। অতএব রফিক স্যারের দেনার কথা আমার পিতা ভুলে যান, আমিও একরকম ভুলে যাই।
    কিন্তু ওই যে বললাম এই ছয় বছরে যে কবারই দেখা হয়েছে প্রতিবারই মনে মনে ঠিক করেছি টাকাটা এক সময় শোধ দেবই। কী দরকার একজন মানুষের কাছে সারা জীবন ছোট হয়ে থাকার? লোকটার সামনে দিয়ে হেঁটে যেতে সংকোচ বোধ করব, চোখের দিকে তাকাতে পারব না, কথা বলা তো দূরের কথা। অথচ তার কাছে কোনো ভয়াবহ অপরাধ তো আমাদের নেই। মাত্র দুইটা হাজার টাকার জন্য কেন মিছিমিছি এই যন্ত্রণা পুষে রাখব? টাকা তো জীবনে কম কামাব না। অতএব সেদিন রফিক স্যারকে সস্ত্রীক রিকশায় যেতে দেখে ভাবলাম মাসের বেতনটা হাতে পেয়েই দিয়ে দেব। আমার বিশ্ববিদ্যালয় জীবন শেষ। ছোটখাট একখানা চাকরি করছি। খরচটরচ পুষিয়ে জমার খাতায় যদিও তেমন কিছু রাখার অবস্থা আসেনি এখনো।
    মাসের মাঝামঝি সময়। মাসের বেতন হয়েছে অনেক দেরিতে। বেতনটা পেয়েই ব্যাংক থেকে টাকা তুললাম। সাথে রফিক স্যারের জন্যও দুই হাজার অতিরিক্ত। ইচ্ছা, বাসায় গিয়ে ছোট ভাইদের সাথে কথা বলে পরদিন সকালে গিয়ে দিয়ে আসব। মেজটা খুব সকালে বিশ্ববিদ্যালয়ে চলে যায়। সুতরাং সেজটাকে সাথে নিয়ে যাব। কিন্তু ও আবার ১০টা/১১টার আগে ঘুম থেকে ওঠে না। আর আমি ৯টা/১০টার দিকে বের হয়ে যাই। এসব ভাবতে ভাবতে বাস স্ট্যান্ড থেকে হাঁটতে হাঁটতে বাসায় ফিরছিলাম। ভিতরে এক ধরণের টলমলে আবেগ ও ভাল লাগা কাজ করছিল। ছয় বছর পর এই পাওনাটা পেয়ে নিশ্চয়ই তিনি ভয়ানক অবাক হবেন। তখন কী বলতে পারেন তিনি? সবচে বড় কথা টাকাটা দেওয়ার পর এতদিন তার কাছে আমি যে ছোট হয়ে ছিলাম সেটা ঘুচবে। এবার তার চোখে আমি বড় হয়ে যাব।
    বাসায় যাওয়ার পথে রফিক স্যারের কোচিং পড়ে। সেটার সামনে দিয়ে যেতে গিয়ে থেমে গেলাম। আজকেই দিয়ে আসব টাকাটা? ছোটভাইয়ের ঘুম ভাঙিয়ে সকাল সকাল নিয়ে আসা তো কম ঝক্কি না। ধুর, এখনই দিয়ে যাই; শুভ কাজে দেরি করতে নেই। মিরপুর কোচিংয়ের মেইন গেটে নক করলাম। দাড়িওয়ালা, খালি গায়ের এক যুবক গেট খোলে। রফিক স্যারকে চাইলাম। জানালাম, আমি এক অভিভাবক, টাকা দিতে এসেছি। শুনে ও, একটু দাঁড়ান বলে যুবকটি ভেতরে গেল। এক মিনিট বাদে গায়ে পাঞ্জিাবি গলিয়ে হাতে তালা নিয়ে বেরিয়ে আসে। মেইন গেটে তালা লাগাতে লাগাতে বলল, স্যার পাশের বাসায় থাকে, আসেন। বোঝা যাচ্ছে স্যারের অবস্থার উন্নতি হয়েছে। আগে কোচিংয়ের ভিতরেই পরিবার নিয়ে থাকতেন। এখন সেটাকে পুরোপুরি কোচিং বানিয়ে আলাদা বাসায় থাকেন।
    একেবারে গায়ে লাগানো পাশের বিল্ডিংয়ের নিচতলা। বিদ্যুৎ ছিল না। তবু রাস্তার ল্যামপোস্টের আলোতে সবকিছু স্পষ্ট। রাস্তার দিকের জানালায় যুবকটি নক করল, স্যার আসছেন? ভেতর থেকে পরুষ কণ্ঠের প্রশ্ন, কে? এবং প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই জানালায় রফিক স্যারের মুখ। যুবকটি আমাকে দেখিয়ে বলল, একজন অভিভাবক আসছে। রফিক স্যার ভাল করে আমার দিকে তাকালেন। আমি মুখে একটু হাসির ভাব এনে সালাম দিলাম এবং তার চোখের দিকে তাকালাম। দেনা শোধ করতে না-পারার লজ্জায় যে চোখকে এতদিন আমি কেবল চোরের মতো এড়িয়ে গেছি। কিন্তু আজ আমার চোখে-মুখে দীপ্ত গর্বিত ভঙ্গি। রফিক স্যার আমার দিকে তাকিয়ে চোখ কুঁচকালেন, আপনি..। খানিকটা অবাক হলাম। উনি আমাকে চিনতে পারছেন না তার মানে ওনাকে দেখে আমি যে এড়ানোর চেষ্টা করতাম সেটা না করলেও চলত। যাহোক, মুখে বললাম, আমি আপন নিপুনের বড় ভাই। ওরা আপনার এখানে পড়ত।
    ও আচ্ছা আচ্ছা, রফিক স্যার বললেন, তা হঠাৎ, কী ব্যাপার?
    আপনার কাছে কিছু টাকা ডিউ ছিল, ওটা দিতে এসেছি।
    ও, আসেন ভিতরে আসেন।
    ভিতরে ঢুকলাম। ডাইনিং স্পেসসহ তিন কামরার বাসা। ছোট ছোট রুম। রুমগুলোতে চুনকাম হয়নি। যে রুমে বসলাম সেখানে একটা সিঙ্গেল খাট, একটা পড়ার টেবিল, চেয়ার তিনটা। আমরা খাটের উপর বসলাম। চার্জারের আলোয় ঘরটা মোটামুটি আলোকিত।
    শুরুতেই রফিক স্যার আমার পরিবারের খবরাখবর জিজ্ঞেস করেন। আমার বাবা কেমন আছে? কাজটাজ করতে পারছেন কি না? ছোট দুই ভাই কোথায় কোথায় কোন বিষয়ে পড়ছে। আমি কী করছি, বিসিএস দিচ্ছি কিনা ইত্যাদি ইত্যাদি। কথায় কথায় তার সুঅবস্থার কথাও তিনি বললেন। জানালেন মোটামুটি আছেন। সামনের লেনে তার পৌনে দুই কাঠার জায়গা আছে। ভাবছেন সেখানে একটা স্কুল
    খুলবেন। নিউমার্কেটে, মুসলিম বাজারে দোকান কিনেছেন। সেগুলো ভাড়া দিয়েছেন। আর কোচিং ভালই চলছে। তবে মাঝেসাঝে কেবল ইংরেজির শিক্ষক পেতে মুশকিলে পড়তে হয়। আরো বললেন, অনুরোধের ঢেঁকি গিলতে তাকে এখনো বেশ কয়েকটি টিউশনি করতে হয়। যদিও টিউশনি করতে এখন তার ভাল লাগে না। আর কত?
    রফিক স্যারের আর আমাদের পারিবারিক অবস্থার পার্থক্যটা চিন্তা করে ভেতরে দীর্ঘশ্বাস ফেললাম। মনে হল টাকাটা ফেরত না দিলেই ভাল হত। এই ক বছরে লোকটার অবস্থা তো বেশ দাঁড়িয়েছে। আর আমাদের! এখনো তেমন কিছু হল না। যাহোক, বিশ মিনিটের বেশি সময় কথাবার্তা চলল। এর মধ্যে বিদ্যুৎ চলে আসে। আমি উঠলাম। টাকাটা রফিক স্যারকে দেয়ার জন্য পকেটে হাত ঢোকাই। দিতে দিতে বললাম, দুই হাজার টাকা বাকি ছিল কিন্তু এতদিনে তো টাকার অনেক অবমূল্যায়ন ঘটে গেছে। রফিক স্যার হাতে নিয়ে বললেন, কী জানি কত পাইতাম মনেও নাই।
    বুকটা উঁচিয়ে রফিক স্যারের বাসা থেকে বের হলাম। ভেতরে খুব সুখ অনুভব করছি। এখন থেকে তার সঙ্গে দেখা হলে আমি আগ বাড়িয়ে হেসে হেসে কথা বলতে পারব। আসলে মানুষকে দিতে পারার মধ্যে এক দারুণ আনন্দ আছে। যদিও এখানের দেয়াটা অন্য রকম ধার শোধ।
    বাসায় এসে ফুর্তি নিয়ে খেতে বসে মাকে জিজ্ঞেস করলাম, আচ্ছা, মিরপুর কোচিংয়ের রফিক স্যার দুই হাজার টাকা পাইত না?
    না, এত টাকা না, পাঁচশ না ছয়শ জানি পাইত। তরকারি গরম করতে করতে মা বলেন।
    কী বল? দুই হাজার না পাইত?
    নাহ। আপন পরে একবার এক হাজার, আরেকবার পাঁচশ টাকা দিয়ে আসছিল তো।
    আপন সে সময় এ ঘরে ঢোকে। আমি ওকে জিজ্ঞেস করি। ও-ও বলে, পাঁচশ না ছয়শ টাকা বাকি জানি। ঠিক মনে নাই।
    শুনে তো আমি থ। কেবল বলি, টাকা কবে শোধ দিলা, আমি তো জানলাম না।
    মা জিজ্ঞেস করলেন, কেন কী হয়েছে?
    আমি কিছু বলতে পারি না, শুধু বললাম, না, মাঝে মাঝে রফিক স্যারের সঙ্গে রাস্তায় দেখা হয়।
    ও। মায়ের মুখে এক ধরণের অপরাধবোধ ফুটে ওঠে। টাকাটা দিয়ে আসা দরকার। আপন তোর যে মাসে সুবিধা হয় টাকাটা একবার দিয়ে আসিস রে বাবা। নইলে মানুষের অভিশাপ লাগে।
    আমি এ বিষয়ে আর কিছু বলি না। নিঃশব্দে খেতে থাকি।


    জ্যৈষ্ঠ ১৪১৫, দৈনিক জনকণ্ঠে প্রকাশিত

  • আঁশটে কথা

    সাঁড়াশি অভিযান
    ভদ্রলোকের বাসার দরজার সামনে থেকে মাছ চুরি, এটা কি মগের মুল্লুক নাকি?
    সাইদের মা দরজার তালা খুলে ঘরে ঢুকে বোরকা ছেড়ে চারতলায় উঠার ক্লান্তিতে ফ্যানের নিচে বসে হাঁপাতে লাগলো, একটু পর ফ্রিজ থেকে ঠাণ্ডা পানি খেতে গিয়ে মাছগুলো ফ্রিজে রাখার কথা তার মনে পড়ে। কিন্তু এ ঘর-ও ঘর করে দ্যাখা গেলো পলিথিন ব্যাগে আনা মাছগুলো রান্নাঘরে নেই, ডাইনিংরুমেও নেই, তবে ঘরে এনে রাখলোটা কোথায় সে? ও আল্লা, সে অ্যাতো মনভোলা, দরজার তালা খোলার সময়ই তো ব্যাগটা বাইরে রেখে এসেছে। তাড়তাড়ি দরজা খুলে সাইদের মা তো তাজ্জব, আরে মাছগুলো গ্যালো কোথায়? দুইহাত বাই পাঁচহাতের দরজার সামনের সামান্য জায়গাটুকু তো খাঁ খাঁ করছে। সে তো দরজার বগলেই রেখেছিলো পলিথিন ব্যাগটা, তাহলে যাবে কোথায়?
    পাশের ফ্ল্যাটে চার-পাঁচবার কলিংবেল দিতে মিমের মা দরজা খোলে, সাইদের মা মাছের ব্যাগের কথা বলতেই প্রচণ্ড বিরক্ত হয়ে জানায় এধরনের কোনো মাছের ব্যাগ সে দেখেনি। সাইদের মা ধন্দে পড়ে, তবে কি সিঁড়িতে ওঠা-নামার সময় কোনো বাইরের মানুষ এসে নিয়ে গ্যালো? তাহলে নিচে দাড়োয়ানের কাছে খোঁজ নেয়া যাক। তার স্বামী তাবলিগ করে, সে-ও মাসে দুইবার মহিলাদের নিয়ে বাসায় মাস্তুরাত জামাত বসায়, সুতরাং তার মতো ধার্মিক মহিলা ভালোমতো না জেনে কাউকে দোষারপ করলে মানুষ কি বলবে! তাই ঘরে এসে নিজেকে কালো বোরকায় আবৃত করে সাইদের মা নিচে নামে। দাড়োয়ানকে এ ব্যাপারে বলতে পান খাওয়া লাল ঠোঁটে আবদুল মান্নান চোখ কুচকে চিবিয়ে চিবিয়ে বলে, ক্যান আপনে উপরে ওঠনের সময় তো আপনের হাতেই একটা মাছের পলিথিন দ্যাখলাম। অ্যারপর তো চাইরতালায় আর কেউ যায় নাই, এইরহম পলিথিন নিয়া কেউ নিচেও নামে নাই। এ পর্যন্ত বলে সে থামে তারপর বিজ্ঞের মতো নিজের মতামতটা জুড়ে দ্যায়, মাছ যদি কেউ নিয়া থাকে তাইলে এই বাড়ির মইধ্যেই আছে, আপনে পরতিডা ফেলাটে ফেলাটে গিয়া খোঁজ লন, ঘরের চিপা-চুপায় নজর দিয়েন, মাছ চুরি কইরা যাইবো কই?
    চারটা বড়ো বড়ো মাছ একহাজার টাকার বেশি হবে দাম! তাছাড়া এমন টাটকা মাছ কোথায় মিলবে? এখন তো ঢাকা শহরের মাছ মানেই ফরমালিন মেশানো অপঁচনশীল মাছ। সাইদকে নিয়ে স্কুল থেকে ফেরার পথে বোনের বাসায় গেলে জোর করে দিয়ে দিলো, ভোলা থেকে আসার সময় দুলাভাই বড়ো বড়ো টাটকা ইলিশ আর পাংগাশ কিনে এনেছে। ওখান থেকেই দুইটা ইলিশ, দুইটা পাংগাশ দিয়েছিলো।
    এই বিল্ডিংয়ে বাড়িওয়ালীর সাথেই তার বেশি খাতির, আগে বিষয়টা তার কানে দেয়া দরকার। বড়িওয়ালী সব শুনে নির্দ্বিধায় জানিয়ে দিলো এটা কার কাজ হতে পারে ; তবে ‘যদি’-র কথা তো বলা যায় না, একবার সব ফ্ল্যাটে ফ্ল্যাটে গিয়ে খোঁজ নেয়া ভালো।
    দ্রুত তিনতলা পর্যন্ত পাঁচটি ফ্ল্যাটে সাইদের মা পদধুলি দিয়ে ঘটনার বিবরণ দিলো : বিশাল বড় বড় চারটা মাছ যা ঢাকায় টাটকা পাওয়া তো কল্পণা আর দাম হিসাব করলে মিনিমাম দেড়-দুই হাজার। তারপর সম্ভাব্য চোর কে হতে পারে এ বিষয়েও সবার মতামত জানতে চাইলো।
    অ্যাতো বড়ো বড়ো চারটা মাছ তার ঘরের দরজা থেকে বেহাত হয়ে যাবে? চারদিন দানাপানি না খেয়ে থাকলেও সাইদের মা এ শোক কাটাতে পারবে না। সে-ও এখন নিশ্চিত এটা ওই চুন্নির মেয়ের কাজ, দরকার হলে ওই মাগির তামাম ঘর খুঁজে সে ফাতা ফাতা করে ফেলবে তবু মাছ বের করবেই। সাইদের মা দ্রুত চারতলায় উঠে কলিংবেল চাপলে মিমের মা মুখ-বের -করা দরজা ফাঁক করে উঁকি মারে, কি ভাবি মাছ পাইছেন?
    একটু ভিতরে ঢুকতে দেন গো ভাবি, চাইরতালা উঠা-নামা কইরা হাঁপাইয়া গেছি, একটু ঠাণ্ডা পানি খাবো।
    আমি তো বাথরুমে ঢুকতে লইছিলাম.., বলে মিমের মা মুখের ভাব এমন করলো যেন এই মুহূর্তেই বাথরুম সারার জন্য দরজাটা বন্ধ করা জরুরি।
    আমার ফ্রিজে ঠাণ্ডা পানি নাই, একটু ঠাণ্ডা পানি খাওয়ান গো।
    আচ্ছা আসেন..।অপ্রস্তুত হয়ে মিমের মা খুব অনিচ্ছার সাথে আগলানো দরজা ছেড়ে দাঁড়ায়ফ্রিজ থেকে পানির বোতল বের করে মিমের মা। দ্রুততার সাথে ভেতরটা পুরোপুরি চোখ বুলাতে না পেরে সাইদের মা ফের নিজ হাতেই ফ্রিজ খুলে বসে, ওইটা কি রাখছেন ভাবি? 

    ওইটা তো কাঁচা পেঁপে। বলে গ্লাসে পানি ঢালতে থাকে।
    আপনের ফ্রিজটা এখনও নতুনের মতো। বলতে বলতে সাইদের মা উপরের ডিপফ্রিজ খুলে দেখে বন্ধ করে দ্যায়। সে আগেই ভেবেছিলো ফ্রিজে রাখার কথা না, অন্য কোথাও রেখেছে। রান্নাঘর ও এদিক-সেদিক উঁকি দিতে দিতে সাইদের মা অনুরোধ করে, ভাবি ট্যাং আছে না? ট্যাং দিয়া চিনি দিয়া নাইরা দ্যান। গলাটা একবারে শুকাইয়া গেছে।
    দুটি বেড আর ড্রইং ডাইনিং এর ছোট ফ্ল্যাট। সাইদের মা বড়ো ঘরটায় ঢুকতে যেতেই মিমের মা হাহাকার করে ওঠে, ভাবি ওইঘরে না এইঘরে বসেন।
    না না, এইঘরেই বসি। সাইদের মা খাটের উল্টোপাশের চেয়ারটায় বসে। ডাইনিংরুম থেকে মিমের মা-র ট্যাং বানিয়ে আনতে যে সামান্য সময় লাগলো এর মধ্যেই সাইদের মা দূরবীন-চোখে ঘরের চিপা-চুপায় উঁকিঝুঁকি মেরে অবশেষে খাটের নিচে উঁবু হয়ে পর্যবেক্ষণ করতেই কেল্লা ফতে, ঐ তো সবুজ পলিথিনটা পরিস্কার দেখা যাচ্ছে। যাক এতক্ষণে প্রাণটা হাতে পেয়েছে। খাটে বসে মিমের মা-র আনা ট্যাং খেয়ে এবার সত্যি সত্যিই তার পরানটা শীতল হলো। গ্লাসটা ফিরিয়ে দিয়ে সাইদের মা মুচকি হাসে, তা ভাবি আপনের না বাথরুম পাইছে, বাথরুমে গেলেন না? আমি বসি আপনে বাথরুম যান।
    না.. বাথরুম গেছে গা।
    অসুবিধা নাই আপনে যান, আমি চোর না, ঘরের কিছু চুরি হইবো না।
    ছি ছি, এগুলা কি কন! মিমের মা নিচুস্বরে বলে।
    মানুষ যে আজকাল কি হইছে ভাবি কাউরে বিস করন যায়না। চেয়ার ছেড়ে মিমের মা-র পাশে খাটে বসতে বসতে সাইদের মা বলে। মিমের মাকে নিরুত্তর দেখে নিজেই আবার যোগ করে, তা ভাবি একটু চা-নাস্তা খাওয়াইবেন না, আপনের বাসায় আসলাম।
    কি খাইতে দিমু, ঘরে কিছু নাই, চা-ও শেষ হইয়া গেছে।
    না, চুন্নি মাগি ভয় পাইছে, তাকে এঘরে রেখে কিছুতেই উঠবে না, যা করার ওর সামনেই করতে হবে। এই ভেবে সাইদের মা আচমকা যেন খাপ থেকে তলোয়ার বের করে, ভাবি আমি তো মাছ পাইছি।
    শুনে তেমন আচমকাই মিমের মা চমকে ওঠে, মুখ ফ্যাকাসে হয়ে যায়, চোখ গোল করে জানতে চায়, কোন..কোন জায়গায়?
    সাইদের মা তড়িৎ মাটিতে হাঁটু ভেঙ্গে বসে খাটের তল থেকে সবুজ পলিথিনটা টেনে নিয়ে দেখায়, এই যে মাছ!
    কী? কী..কন? এইটা আমার ঘরে.. আমার ঘরে আইবো ক্যান? মিমের মা যেন সাত আসমান থেকে মাটিতে পড়ে।
    আল্লারে কি কয়, তাইলে আমি পাইলাম ক্যামনে? আপনের খাটের তল থেকা কি ম্যাজিক দিয়া বাইর করছি?
    না না, এইটা হইতেই পারে না, মিমের মা প্রতিবাদ করে, এইটা আমার ঘরে আইবো কোত্থেকা?
    আইবো কোত্থেকা মানে? সাইদের মা-র ধৈর্যচ্যুতি ঘটে, গলা উচিয়ে বলে, আপনে চুরি কইরা আইনা খাটের নিচে রাখছেন, আবার উল্টা ঝারি লন?
    কি, মুখ সামলাইয়া কথা কন কইলাম, আমার ঘরে ঢুইকা আমারে চোর কয়, সাহস কতো?
    সাহসের কি দেখছেন আপনে, আমি চোর হাতেনাতে ধরছি আমার সাহস থাকবো না? চোর কোহানকার!
    কি, আবার অপমান? মিমের মা তর্জনি উচায়, আপনে আমার বাসার থেকা যান কইলাম, যান।
    যামুই তো, চোরের বাসায় কি থাকতে আইছি নি, চোর ধরতে আইছি। যেতে যেতে সাইদের মা তীব্রস্বরে চেচায়, আমি অহনই সব ফ্লাটে ফ্লাটে যামু, শালিস বসামু।
    হ হ, অহন বাইরন। সব ষড়যন্ত্র, আমিও দেইখা লমু।
    দরজার বাইরে এসে সাইদের মা গলায় যেন মাইক বসিয়ে ফেলে, বিচার বসাইয়া তোমার আমি মাথা নাইড়া করমু চুন্নি, পুরা এলাকায় রাষ্ট কইরা দিমু তোরে।...

    পলিটিকস
    ঘটনার পরবর্তী স্টেপে সাইদের মা তখনই বাড়িওয়ালীর বাসায় গিয়ে এক নিঃশ্বাসে রোমাঞ্চকর উদ্ধারাভিযানের কাহিনী আদ্যোপান্ত বর্ণনা করে ‘দাবি মানতেই হবে নইলে আন্দোলন’-এর সুরে জানায়, এর একটা উপযুক্ত বিহিত করনই লাগবো ভাবি, ঘরের লগে চোর রাইখা তো নাকে ত্যাল দিয়া ঘুমান যায় না, আজকে আমার সামান্য মাছ চুরি করছে কালকে যে আপনের ঘরের সোনা-গয়না চুরি করবো না হের নিশ্চয়তা কি?...
    হ হ, দেহি কি করা যায়। আমি তো আগেই আপনেরে সাফ জানাইলাম, চোর মিমের মা ছাড়া আর কেউ না। আচ্ছা অহন শান্ত হন, মাথা ঠাণ্ডা করেন।
    শান্ত থাকি কেমনে কন, আগে চুন্নি নিচতালায় আছিলো আপনে আবার আমার পাশে ভাড়া দিলেন (মিমের নানি নিচতলায় ভাড়া থাকে, আগে একসাথেই ছিলো, দুইমাস হলো মায়ের সাথে ঝগড়া করে আলাদা হয়েছে, কারণ মিমের নানি নাকি মেয়ের ঘরের খাবার, জিনিস ইত্যাদি চুরি করে)। অহনচোর পাশে লইয়া শান্তিতে থাকি কেমনে। হাতেনাতে ধরলাম তারপরও চুন্নি মাগি ডাটে কয় এইটা আমার ঘরে আইবো কোত্থেকা? কতবড় জঘন্য শয়তান চিন্তা করেন!
    ওই মিমের মা মনটি আর কি, অই ছেমরির মায় তো আরো বেশি চুন্নি। নিচে আমাগো লেবু পেয়ারা গাছের ফল তো আমরা খাইতেই পারি না, সব অই মনটি আর ওর মায় সাবার করে, কতদিন হাতেনাতে ধরছি, কয়, দুই একটা নিলে কি হয়?
    এরপর লঘু আলোচনা গুরু আলোচনায় মোড় নিলে মিমের মা-নানি সহ চৌদ্দগুষ্ঠির স্বভাব চরিত্র উদঘাটন শুরু হয়। বড়িওয়ালী রসিয়ে রসিয়ে বলে : আসলে স্বভাব যাইবো ক্যামনে? ওরা তো আগে একরকম বস্তিতেই থাকতো। মিমের বাপে ভালো ফ্যামিলির ছেলে। ঢাকায় মেসে থাইকা পড়াশুনা করতো, অই মনটির বাসায় টিউশনি করাইতে গেলে ছেমরি শুরু করে মাস্টারের লগে পিড়িত, পড়তে বইয়া বলে হাত ধইরা বইয়া থাকতো। মনটির বাপে তখন নিউমার্কেটের রাস্তায় ফল বেঁচতো। চিন্তা করলো মনটির মতো কালা মাইয়ারে বিয়া দিবো ক্যামনে? তারপর একদিন ঘরের মধ্যে প্যাঁচে ফালাইয়া মানুষজন ডাইকা কাজি দিয়া বিয়া করাইয়া দ্যায়। বস্তির ফল বিক্রেতার মাইয়ারে বিয়া করছে শুইনা মনটির শ্বশুর-শ্বাশুড়ি ছেলেরে ত্যাজ্য পুত্র করে। আজ পর্যন্তও ছেলের বউরে স্বীকার করে নাই। মনটির জামাই খালি মাঝে মাঝে মা-বাপের লগে গিয়া দেহা কইরা আসে। আবার মনটির মায়ের সৎ মা কি করছে জানেন নি? মনটির সৎ নানি হের বড় জামাইয়ের সাথে ভাইগা গেছে।..
    ছি ছি, আস্তাগফিরুল্লাহ, কি জঘন্য! ঠিকই আছে, মানুষ গরিব হোক সেইটা মাইনা নেয়া যায়, কিন্তু স্বভাব-চরিত্র খারাপ হইলে.., সাইদের মা মন্তব্য করে। এরপর গলা চিকন করে যোগ করে, একবার মাসখানিক আগে আমি জামাতের দাওয়াত দিতে মিমগো বাসায় গেছিলাম, মিমের মা দরজা খুইলা কয়, আসেন। বিশ্বাস করবেন না ভাবি দেখি কি খালি ব্রা পরা। আমি তো ডরে আর শরমে নাই, তাড়াতাড়ি ঘরের ভিতর ঢুকছি, কওয়া তো যায় না, আমার ছোটভাইটা বা সাইদের বাপও ওইসময় দরজার সামনে আসতে পারে। জিগাইলাম, কি ভাবি, এমনে খালি গায়ে যে দরজা খুললেন আমি না হইয়া তো কোনো পুরুষও হইতে পারতো। বেহায়ার মতো কয়, কে আর আইবো এইসময়, বাইরে থেকা আইছি তো গরম লাগতাছে। মনে মনে কই, কি এমন শরীর যে মাইনষেরে দেহানের অ্যাতো শখ, আর আমাগো মতন সুন্দর হইলে না জানি কি করতো! আর মাগির কি কালা কুচকুইচচা শরীর ভাবি, দেখলে ঘিণ করে।
    হ, ওই ছেমরি অ্যামনই, শরম-লজ্জা নাই। এইসব কইরাই তো মিমের বাপের মতো সরল-সোজা মানুষটারে বিয়া করছে। তারপর হুনেন, বিয়ার পর বস্তি ছাইরা কোনোরকমের একটা দুইরুমের বাসায় ওঠে একরুমে মনটির জামাই আর অন্যরুমে শশুর-শাশুড়ি। মনটির জামাই চাকরি শুরু করলে বাসা ভাড়া একাই সব দিতো। পরে শ্বশুররে নিউমার্কেটে ফলের দোকানও লইয়া দিছে।..
    এসব ঘটনা সাইদের মা-র একেবারে অজানা নয়, আগে ভাসা ভাসা এর ওর কাছ থেকে শুনেছিলো, এখন আদ্যোপান্ত শুনে মেমোরি ঝালাই করে নিলো। এইভাবে দুপুরে না খেয়ে বেলা সাড়ে তিনটা কেটে যায় সাইদের মা-র সব ফ্ল্যাটে ফ্ল্যাটে গিয়ে এই মাছ উদ্ধারাভিযানের কাহিনী বর্ণনা করতে।
    এ তো গেলো দড়ির একপ্রান্তের কথা, অপর প্রান্তে মিমের মা-ও থেমে নেই, সব ফ্ল্যাটে ফ্ল্যাটে গিয়ে সে-ও তার পক্ষে প্রচারাভিযান চালিয়েছে। দোতালার তানিয়ার মা-র সাথে তার খাতির, সেখানেই আগে যায়। জোর গলায় বলে : আমি তো বিশ্বাসই করতে পারি না অই কিপটা বোরখাআলি মাছের পলিথিন দরজার বাইরে রাখতে পারে! আমি বাথরুমে গেছিলাম, বাইরইয়া দেহি দরজা খোলা, মিনায় খেলতাছেÑ দেহেন না অইডায় কি শয়তানি করে? অহন এর মধ্যে যে শয়তানডায় মাছের ব্যাগটা টাইনা টাইনা খাটের নিচে ঢুকাইছে হেইডা আমি কেমনে জানমু, কন?
    তানিয়ার মা টেটন-মাথায় দ্রুত হিসাব কষে, মিমের ছোটবোন মিনার বয়স দেড়বছর, চারটা বড় সাইজ মাছের পলিথিনের ওজন ৯-১০ কেজি; তাহলে মিনার পক্ষে টেনে নিয়ে যাওয়া সম্ভব? তাও আবার খাটি চোরের মতো বুদ্ধি করে খাটের নিচে? কিন্তু ঘটনায় মিমের মা চুরি করেছে মনে হলেও সে অই কিপটা সাইদের মা-র বিরুদ্ধে যাবে। সেবার ঝগড়ার পর থেকে বোরখার আড়ালে ঢাকা মিটমিটে শয়তান মাগি তার দু চক্ষের বিষ। সব শুনে অবশেষে মনটির মা-র সুরে তানিয়ার মা প্রতিবাদ করে, না না, ভদ্রলোকের রাসায় গিয়া চুন্নি কইবো অপমান করবো এর একটা বিহিত করমুই, আপনে নিশ্চিন্ত থাকেন।
    দোতলায় থাকা হিন্দু মধ্যবয়সী মহিলাটি মধ্যবর্তী পন্থা গ্রহণ করে। সাইদের মাকে বলে, আপনে এটা নিয়া বিচার বসান, আমি আছি আপনার সাথে। চুরিও করবে আবার স্বীকার না করে অপমান করে বাসা থেকে বের করে দেবে, তা তো হয় না, উপযুক্ত শাস্তি দিতেই হবে। আবার মিমের মা আসলে ভোল পাল্টে বলে, বোরখাআলিরা শয়তান হয় বেশি, আপনার চিন্তার কি আছে, আপনিও বিচার ডাকেন।
    মিমের মা সব বাসায়ই গেলো কেবল নিজের মায়ের বাসা ছাড়া। মা নিশ্চয়ই তার কথা বিশ্বাস করবে না, তখন হিতে বিপরীত হবে। ঘরের শত্রু বিভীষণ!


    সমকাল, ২১ জুলাই ২০০৬

  • এডিনব্রা’র একটি বিকেল

    মাশা ভ্লাদিমিরার কথা জিজ্ঞেস করে। নিকের একটু অস্বস্তির অনুভূতি হয়। নিক, মানে নিখিলেশ- নিখিলেশ পোদ্দার। কয়েক বছর ব্রিটেনে থাকার সুবাদে নামের এমন ' শর্ট, সুইট ও স্মার্ট' ইংলিশ ভার্সন। নিক বিয়ারে মৃদু চুমুক দেয়। মাশা পানির গ্লাসে। বারটার বেশি বাজে। রেস্টুরেন্ট এখনো পুরোটাই ফাকা। ওয়েস্টার্ন কিংস ম্যানর হোটেল থেকে বেরুলে ডানের রাস্তাটা পোর্টওব্যালো বিচের দিকে গেছে। সেদিকেই হাঁটছিল দুজন। পথে এই হাত-পা-ছড়িয়ে বসার মত এলাহি ইন্ডিয়ান রেস্টুরেন্ট দেখে ঢুকে পড়ে। জানালার পাশে একটা টেবিলে গিয়ে বসে। ঢোকার সময়ই চোখে পড়ে মাত্র দুজন কর্মচারী- দুজনেই গ্লাস পলিশ করছে। একজন স্কটিশ (ম্যানেজার নিশ্চয়ই), অন্যজন এশিয়ান। একটু বাদে খাবারের অর্ডার নিতে আসলে এশিয়ান ছেলেটির একসেন্টে ধরা পরে সে ইন্ডিয়ান।
    বাদামি চামড়ার পাশে সাদা চামড়া দেখে ইন্ডিয়ানরা যতটা অভ্যস্ত, বাংলাদেশিরা না। তারা লম্বা চোখে তাকায়। সেখানে থাকে ঈর্ষা। নিকের অবশ্য এতে ভালোই লাগে। আরো ভালো লাগে যখন কোনো ব্রিটিশ তাকে জিজ্ঞেস করে, তোমার কি এখানে জন্ম? উত্তরে 'বাংলাদেশ' শুনে তাদের চোখ বড় হয়ে যায়, ইউ গট আ পারফেক্ট একসেন্ট। এই পারফেক্ট একসেন্ট দিয়েই সে কখনো কখনো বাঙালিদের বোকা বানায়। হয়তো রাস্তায় একজন জিজ্ঞেস করলো, আর ইউ ফ্রম বাংলাদেশ? নিক তখন ছোট্ট হেসে জানায়, আ'ম ফ্রম মরিশাস। কাজটা সে ইচ্ছে করেই করে।
    বিদেশে এসে একটা জিনিস সে বুঝেছে। স্বজাতি ভাইদের থেকে যত দূরে থাকা যায় তত মঙ্গল। কারণ এরা নিজেদের ভিতর মারামারি, দলাদলি নিয়েই আছে। কোনো এক বাঙালি উপরে উঠছে দেখলে সবাই মিলে যুদ্ধে নামে কিভাবে তার পা টেনে নিচে নামানো যায়। এদের কাছে শেখার কিছু নাই। অনেকে আবার এখানে এসে ধার্মিক হয়ে যায়। মদ ছোবে না, বার-এ কাজ করবে না। ইংলিশ কালচার খারাপ। এদের মেয়েরা আরো খারাপ। বিয়ে-শাদি করে না, বাস্টার্ড বাচ্চা জন্ম দেয়। আরে এতই যদি খারাপ তো এই ইংল্যান্ডে আসার দরকার কি? খাবি এদের দেশে, পরবি এদের দেশে, আবার এদেরকেই বলবি বেজাত-বেজন্মা। বাঙালি স্রেফ এক নিমকহারাম জাত। নিজের বাদামি চামড়ার জন্য নিকের দুঃখ হয়। আরেকটু ফর্সা হলে তাকে ইউরোপিয়ান বলে চালিয়ে দেয়া যেত। যাহোক, কি আর করা! এই সস্তা বাঙালপনা বাদ দিয়ে নিক এখন এডিনব্রা দেখে, মাশাকে দেখে।
    চমৎকার আবহাওয়া আজ। হাল্কা মিষ্টি রোদ। জানালা দিয়ে মাশার চুলেও রোদের ছটা পড়েছে। ব্লন্ড চুল নিকের ভাল লাগে। তবে ওর চুল সাদাটে ব্লন্ড। বেশিরভাগ ইস্ট ইউরোপিয়ানের যেমন হয়। রাশান হিসেবে বেশ খাট মাশা। ওর মুখের একটা অদ্ভুত বৈশিষ্ট্য হল- ভুরু নাই। ভুরুর জায়গাটাতে সবসময় আইব্রাও পেন্সিলের টান। আজ মাশার জন্মদিন। সে উপলক্ষেই দুদিনের ট্রিপে স্কটল্যান্ড আসা। হোটেলের ক্যাফেতে কাল সন্ধ্যায় জন্মদিনের ডিনার হল; শ্যাম্পেনসহ। খেয়েদেয়ে রুমে ফিরে একটু কুইক-সেক্স। এবং ঘুম।
    এডিনব্রায় নিকের আসার কথা ছিল না। ছিল মাশার স্লোভাকিয়ান বন্ধু মনিকার। এসব দেশে সম্পর্ক ভেঙ্গে গেলে যা হয়- শেষটা বন্ধুত্বে এসে ঠেকে। মাশার সঙ্গেও তাই। বড়জোর অনলাইনে হাই-হ্যালো বা মোবাইলে টেক্সট। তাছাড়া দুজনের কেউই এখনো নতুন কোন সম্পর্কে জড়াতে পারেনি। অতএব ‘ফ্রেন্ডস উইথ বেনিফিটস’ (শারীরিক সম্পর্ক) ব্যাপারটা চলতেই পারে। এমনই একদিন মাশা বলল ওর বাসায় যেতে। ওর ফ্লাট-মেট কাম ইরানি হাজব্যান্ড ইরাজ এখন ছুটিতে দেশে গেছে। যাই-যাব করে একদিন সন্ধ্যায় নিক গেল মাশার ব্রিক্সটনের ফ্লাটে।
    ‘আজ থাকছ তো?’
    ‘হু। কিন্তু ভোররাতে উঠে কাজে যেতে হবে।’ নিক জানায়।
    এক বেডের কাউন্সিল ফ্লাট। মাশা থাকে ড্রয়িংরুমে। ওর হাজব্যান্ড বেডরুমে। কাগজে-কলমে তাদের এখনো পুরোপুরি ডিভোর্স হয়নি। এ নিয়ে আইনি কাজ এগুচ্ছে। কয়েক বছর যাবতই তাদের সম্পর্ক নেই। মাশার আয় যৎসামান্য এবং চাকরি অনিশ্চিত। তাই একা ফ্লাট নিয়ে থাকার সামর্থ্য নেই। ‘ফুড ফর ওয়ার্ক’ গোছের একটা অলিখিত চুক্তি আছে লোকটার সাথে- বাড়িভাড়া কিছু শেয়ার আর বাসা পরিষ্কার রাখে। ডেভিড ক্যামেরুনের সরকার এসে সব বেনেফিট কমিয়েছে। তাছাড়া, মাশার কাগজপত্রের কিছু জটিলতার কারণে সে সোশ্যাল বেনেফিটের জন্য আবেদনও করতে পারছে না।
    ইরাজ লন্ডন থেকে ইউনিভার্সিটির একটা সেমিনারে রাশিয়া যায়। সেখানেই পরিচয়, ভাল লাগা এবং বিয়ে। আর লন্ডন ফিরে আসে মাশাকে সঙ্গে নিয়ে। ইরাজ একাই এদেশে। ব্রিটিশ পাসপোর্ট পেয়েছে। লন্ডনের বাইরে একটা ইউনিভার্সিটিতে ফিজিক্স পড়ায়। মাশা কখনো শ্বশুরবাড়ি মানে ইরান যায়নি। সঙ্গত কারণেই কেউ তাকে স্বাভাবিকভাবে নেবে না। মাশার ভাষায়, ইরাজ ভয়ানক বদরাগী, যা তা ব্যবহার করে, চুন থেকে পান খসলেই হাত চালাতেও দ্বিধা করে না, লোকটা যতক্ষণ বাসায় থাকে ভয়ে তটস্থ থাকে সে। আর ভাল গুণ বলতে ইরাজের মধ্যে একটাই- মাগিবাজ নয়। গায়ে হাত তোলা বন্ধ হয় পুলিসের কাছে একবার রিপোর্ট করার পর। পরিণামে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইরাজের চাকরি যায় যায় অবস্থা হয়েছিল।
    একটা ব্যাপার বুঝতে নিকের কিছুটা সময় লেগেছে। এতো অল্পসময়ের পরিচয়ে মাশা ইরাজকে বিয়ে করার সিদ্ধান্ত নিলো কেন? নান্দনিক শহর সেন্ট পিটার্সবার্গ-এ স্কুলশিক্ষিকা মাশাকে চাকরি আর প্রাইভেট টিউশনিতে সকাল থেকে রাত অব্দি পরিশ্রম করতে হত। মাশার মা ইহুদি, বাবা ক্রিশ্চিয়ান। নিজ দেশে সাম্প্রদায়িক বৈষম্যের শিকার তাকেও হতে হয়েছে। মাশার মুখে কয়েকবারই শুনেছে, ‘আই হেইট দ্যাট কান্ট্রি।’
    ওয়েটার খাবার নিয়ে আসে। স্যামন মাছ, চিপস, অনিওন রিঙস আর সালাদ।
    ‘ভ্লাদি স্লোভাকিয়ার মেয়ে। হিলটন হোটেলে কাজ করতে গিয়ে পরিচয়। চমৎকার মেয়ে। অল্পকদিনেই মনে ধরে যায়। একদিন অনলাইনে ফুলের বিজ্ঞাপন দেখে কি মনে হল- ফুলের তোড়া কুরিয়ারে পাঠিয়ে দেই ভ্লাদিকে। বাড়ির ঠিকানা যেহেতু অজানা, হোটেলের ঠিকানায় দিলাম। পরে ফেইসবুকে চ্যাটের সময় স্বীকার করলাম যে আমিই ফুল পাঠিয়েছি।’ খেতে খেতে ভ্লাদির ব্যাপারটা মাশাকে সব খুলে বলে নিক। ‘কিন্তু বড় তাড়াহুড়ো করে ফেলেছি। তাই না?’ মাশার দিকে তাকায় সে।
    ‘না, ঠিক আছে।’
    ‘একটা মারাত্মক ভুল করে ফেলেছি, জানো? ওর নামে গুগলে সার্চ দিয়ে এক জায়গায় ওর অনেক তথ্য পেয়েছি। ও ম্যানচেস্টারে অ পেয়ারের (বাচ্চা দেখাশুনার) কাজ করত। চ্যাটের সময় আহাম্মকের মতো বলে ফেলেছি ওর সম্পর্কে আমি অনেক কিছু জানি এবং বলেছিও কিছু। কিন্তু কিভাবে জেনেছি তা বলিনি। পরে মনে হল কাজটা ঠিক হয়নি।’
    ‘হুম। তুমি জেনেছ ভাল কিন্তু শুরুতেই সেটা ফাস করা উচিৎ হয়নি।’
    ‘আসলে, এখানে কালচারালগত একটা ব্যাপার আছে- যেটা আমি বুঝিনি। আমাদের দেশে এমন করলে মেয়েটা ভাবত, আহা, আমাকে কত গুরুত্ব দেয়, কত কাঠখড় পুড়িয়ে এসব জেনেছে। আর এখানে ঠিক উল্টা- কারো অজান্তে তার ব্যক্তিগত বিষয় নিয়ে ঘাটাঘাটি অপরাধের মতন। ভ্লাদি হয়ত আমাকে এখন স্টকার ভাবছে।’
    ‘মেয়েটার সাথে কথা বলে তাই মনে হয়েছে?’ মাশা জিজ্ঞেস করে।
    ‘কাজে কথা বলার তো তেমন সুযোগ নেই। চ্যাটিঙের সময় ওর ভাবটা এমনি মনে হয়েছে। এখন কি করি বলতো, আমি সত্যি ওর প্রেমে পড়েছি।’
    মাশা নিকের দিকে তাকায়, হাসে। ‘হতাশ হয়ো না রোমিও, চেষ্টা করে যাও, দেখ কি হয়।’ কিছুক্ষণ জানালার পাশের চেরি গাছটার দিকে তাকিয়ে মাশা বলে, ‘তাও তো তোমার একটা পথ হল, আমার কি হবে বলতো, নিক। কাল রাতে শাহ এর টেক্সট পাওয়ার পর থেকেই মনটা কেমন করছে। অনেকদিন যোগাযোগ নেই কিন্তু আমার জন্মদিন ও ঠিকই মনে রেখেছে।’
    ‘তুমি এখনো ওকে ভালবাস, তাই না?’
    ‘বাসি।’ মাশার ছোট দীর্ঘশ্বাস। ‘দেখ, প্রতিটা সম্পর্কই একটা পরিণতি চায়। শাহ এর সাথে আমার সম্পর্কটা এক জায়গায় আটকে ছিল। তাছাড়া শাহ ভয়ঙ্কর ডিপ্রেশনে ভোগে। ওর শৈশব কেটেছে অনিশ্চয়তায়। বাবা পাকিস্তান থেকে বউ ছেলেমেয়ে লন্ডনে এনে নিজে উধাও হয়ে যায়। পরিবারের আর কোন খোঁজখবর রাখেনি। প্রচণ্ড অর্থকষ্টে বড় হয়েছে ওরা। শাহ সবার বড়। বাকি এক ভাই আর বোনটি কিছু করে না। মাসহ সবাই একসাথে থাকে এবং ওকেই সংসার চালাতে হয়।’
    ‘কি বল, এই সময়ে এসে একথা তুমি বিশ্বাস করতে বলছ, মাশা? সবাই শাহ এর ঘাড়ে বসে খায়?’
    ‘বাকিরা হয়ত সরকারি বেনিফিট খায় কিন্তু ঘরের মূল আয়ের মাথা অই একজনই।’
    ‘আশ্চর্য। আচ্ছা, শাহ এর মায়ের সাথে দেখা হয়েছে কখনো তোমার?’
    ‘পাগল! হার্টফেল করে মারা যাবে সে- টিপিকাল পাকিস্তানি মুসলিম মহিলা। সে বেঁচে থাকতে আমাদের একসঙ্গে থাকাও অসম্ভব। এজন্যই তো সম্পর্কটা-’ মাশার গলা ধরে আসে।
    এতোটা ইমোশনাল হতে কখনো দেখেনি মাশাকে নিক। ফর্সা মুখটা হঠাৎ মেঘে ঢেকে গেছে। ওর হাতের পিঠে আঙ্গুলের মৃদু চাপ দেয় নিক। মাশা টিস্যু দিয়ে চোখের কোণ মোছে। ‘শাহ নিজের একটা জগতে থাকে। লেখালেখি করে- গীতিনাট্য লেখে। চটি বই আকারে ওগুলো প্রকাশও করেছে। লেখালেখি আর অই মা- এই তার বেঁচে থাকার অবলম্বন। নয়ত এতদিন হয়ত আত্মহত্যা করে বসত।’
    ‘ডিপ্রেশন খুব বাজে জিনিস-’ নিক মাথা নাড়ে।
    ‘শাহকে নিয়ে আমি ক্লান্ত। তাও যদি সম্পর্কের একটা ভবিষ্যৎ থাকত। তুমি শুনলে অবাক হবে- ও যখন বাসায় থাকত পারতপক্ষে আমার সঙ্গে ফোনে কথা বলত না- যদি বাসার কেউ বুঝে ফেলে।’
    ‘অবিশ্বাস করছি না তোমার কথা। ইংল্যান্ডে অনার কিলিং তো পাকিস্তানিরাই করে।’
    ‘সবকিছুর পরেও শাহ এর সঙ্গে আমার অনেক সুন্দর সময় কেটেছে, জানো। আমরা কত জায়গা ঘুরে বেরিয়েছি। কত হোটেলে দিন পার করেছি।’ মাশা দীর্ঘশ্বাস ফেলে।
    দুজনেই কিছুক্ষণ চুপচাপ। খাওয়া শেষ হয়েছে আগেই। ড্রিঙ্কসে চুমুক চলছে। নিক জানালায় তাকিয়ে। বাইরে কি নরোম বিকেল। অথচ ভিতরে কেমন দম-বন্ধ লাগছে। মাশা যেন বুঝতে পারে।
    ‘আচ্ছা, আমরা কি করছি বলতো? ঘুরতে এসে এইভাবে মনমরা থাকলে হবে? শহরটাতো এখনো ভালমত দেখাই হল না। চল চল, উঠি। বিচে আর যাওয়া সম্ভব না। এখানে বাসের জন্য যা ওয়েট করতে হয়।’
    ‘হ্যাঁ, চল।’
    রেস্টুরেন্ট ততক্ষণে লাঞ্চের জন্য বেশ সরগরম। দুজন বের হয়। রেস্টুরেন্টের সামনে বিচে যাওয়ার রাস্তাটার দিকে তাকায়- একদম সোজা চলে গেছে। ওদিকে গেলে আর শহর দেখা হবে না। আজ রাতেই লন্ডন ফিরে যাচ্ছে তারা। এখান থেকেই বহুদূরের সাগর আর পাহাড় দেখা যাচ্ছে। চারদিক নীল আর নীল।
    ‘অদ্ভুত সুন্দর না?’
    ‘হ্যাঁ।’ নিক মাশার হাত ধরে।

    শ্রাবণ ১৪১৯

  • ঘরে ফেরা

    আমাদের এক সিনিয়র মহিলা কলিগ আছেন। এই তো সেদিন হঠাৎ তিনি অফিসে অনুপস্থিত। পরদিন তাকে এ নিয়ে জিজ্ঞেস করতেই তিনি ফুঁপিয়ে কেঁদে ওঠেন, আমার রুমিটা আর নেই! কদিন ধরেই শরীরটা খারাপ যাচ্ছিল। কিন্তু তাই বলে আচমকা এমনভাবে মারা যাবে কেউ ভাবতেই পারিনি। বলে তিনি চোখ মুছতে লাগলেন।
    সিনিয়র কলিগের পাশে বসা তৃষ্ণাদি তাকে সান্ত্বনা দিতে চেষ্টা করেন, থাক আপা, সবই ওপরওয়ালার ইচ্ছা, কেঁদে আর কী করবেন, মেনে নেওয়া ছাড়া উপায় কী?
    রিপনভাই তখন ফিসফিসিয়ে আমাকে জিজ্ঞেস করেন, আচ্ছা, রুমি কে? ওনার ছেলেমেয়ে কেউ নাকি?
    ছেলেমেয়ে কেউ হওয়ার কথা না, অন্য কেউ হবে।
    তৃষ্ণাদি আমাদের ফিসফিসানির কারণ বুঝতে পারলেন, আপাকে জিজ্ঞেস করেন, আপা, রুমি.. কে? আপনার আত্মীয়স্বজন কেউ?
    রুমি! ও আমার ছেলেমেয়ের চেয়ে কিছু কম ছিল না গো। ওকে খাইয়ে তারপর আমি খেতাম। ও নাই, দুদিন ধরে আমার খাওয়াদাওয়াও বন্ধ। হায়রে, দুনিয়াটা কেন যে এমন হয়! একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে তিনি উদাস দৃষ্টিতে সামনে কী দেখতে থাকেন।
    আমরা বুঝলাম রুমি তার ছেলেমেয়ে না হলেও সেরকমই কেউ হবে, যাকে তিনি খুব ভালবাসতেন।
    তৃষ্ণাদি এবার উসখুস করেন, আপা, রুমি তাহলে কে?
    আপা মুখ ঘুরিয়ে তৃষ্ণাদির দিকে অচেনা-দৃষ্টিতে তাকান। কিছুক্ষণ চুপ থেকে ফের দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলেন, আমার বিড়াল।
    ‘আমার বিড়াল’ শব্দ দুটি উচ্চারণ মাত্রই মুহূর্তে একটা জোয়ার উঠে গেল। কারও মুখ দিয়ে বিস্ময়সূচক ‘হ্যাঅ’, কারও মুখ দিয়ে অল্প হাসি, কারও মুখচাপা হাসি, অথবা কারও ‘হো হো’ হাসিতে বাতাসটাই আচমকা দুলে উঠল। তাও বড়জোড় দুই-তিন সেকেন্ড। আপা এমন আহত-দৃষ্টিতে আমাদের দিকে একে একে তাকালেন যে ফুলানো বেলুন চুপসানোর মতো দ্রুত আমরা সবাই চুপসে গেলাম।
    সেই গল্পটাই এখন চায়ের আসরে আবার উঠেছে। চা খেতে খেতে এক চোট হেসে সবাই চাঙ্গা হয়ে উঠছি আর কী। তবে তুহিন বিষয়টিকে হাসি-ঠাট্টার বিষয় হিসেবে মেনে নিতে নারাজ। সে সিরিয়াস হয়ে বলে, তাহলে শোনেন রুস্তমের গল্প।
    রুস্তম?
    হ্যা, আমাদের গ্রামের বাড়িতে কুকুর ছিল একটা।
    কয়েক সেকেন্ড নীরবতা। কীভাবে শুরু করবে ভাবছে তুহিন।
    এই রুস্তম আমাদের ভাষা বুঝত। তুহিন বলতে থাকে।
    কী রকম?
    এই ধরেন, এদিকে আয়, ওদিক যা, এসব তো বুঝতই, তারপর যদি বলতাম, চল আমার সাথে বাজারে চল, আব্বা কোন জায়গায় দেখতো। আমাদের বাড়িটা বেশ বড়, আব্বা হয়ত বাড়ির পিছনে, সেখানে গিয়ে তখন রুস্তম ডাক ছাড়ত। বুঝতাম আব্বা বাড়ির পিছনে। এরকম আর কী।
    রুস্তম একটা পিস ছিল বলতে হবে। ওর ডরে কোনো অপরিচিত মানুষ, আমাদের আত্মীয়স্বজনও বাড়িতে আসতো না। আরেকটা মজার বিষয় ছিল, আমাদের বাড়ির আশপাশ দিয়ে কোনো কুকুরকে যেতে দেখলেই হয়েছে। ওর একদিন কী রুস্তমের একদিন। সেই কুকুর দৌড়াইয়া যদি তাড়াতাড়ি যেতে পারে তো ভাল, নাইলে ওটারে রক্তাক্ত না করে ও ছাড়ত না। এটা ওর কাছে একটা খেলার মতো ছিল।
    ইন্টারেস্টিং তো। আচ্ছা, রুস্তম নামটা দিল কে?
    ওহ রুস্তম? আমার আব্বা। সে আবার ছোটবেলায় খুব যাত্রা দেখত। সোহরাব-রুস্তম ছিল তার প্রিয় পালা। সেখান থেকেই দিয়েছে।
    যাহোক, রুস্তম আমার খুব ন্যাওটা ছিল, যেহেতু আমি বেশি আদর করতাম। তা, ওকে নিয়ে সমস্যা ছিল ওইটাই। অপরিচিত কাউকে সে বাড়িতে কিছুতেই ঢুকতে দিত না। কেউ ঢোকার চেষ্টা করলে হয়েছে, কামড়িয়ে কাপড় ছিঁড়েটিরে শেষ। ধরেন, বাড়িতে আমরা দুইভাই হয়ত নাই, আব্বা ঘুমে, মা পাকেরঘরে। সেই মুহূর্তে বাড়িতে কেউ আসলে মা পাকঘর থেকে এসে রুস্তমরে থামাতে থামাতে ততক্ষণে ওই লোকের দফা রফা। এক্কেরে বিদিক অবস্থা করে ফেলত। এজন্য আত্মীয়স্বজনরা ছিল দারুণ ক্ষ্যাপা। স্বাভাবিক, খালি ওর যন্ত্রণাতেই অনেকে আমাদের বাড়িতে আসত না।
    তা মেনে নেয়া গেল, পরে একসময় যেটা সমস্যা দেখা গেল, ও মুরগি ধরে ধরে মেরে ফেলে। খায় না কিন্তু। খালি মেরে ফেলে। কল্লা আর শরীর আলাদা করে ফেলে। এরকম আশেপাশের বাড়ি থেকে মাঝেসাঝে নালিশ আসতে লাগল। শাসন করতাম। এরকম শুনলে হালকা মাইর দিতাম। খাওয়া দিতাম না। কিছুদিন ভাল থাকত। পরে যেই লাউ সেই কদু। আবার একদিন হুট করে কারো বাড়ি থেকে নালিশ আসত। আসলে ওর জানি কী হয়েছিল সে সময়। পাগলামি না, কেমন জানি, একটু অন্যরকম। আমাদের যেমন এক-দুই রাত না ঘুমালে, কয়েকদিন দাড়ি না কাটলে, কেমন উস্কোখুস্কো লাগে না? চোখেমুখে একটা পাগলামি ভাব চলে আসে। রুস্তমের মধ্যেও একটা ওইরকম ভাব চলে এসেছিল। দুই-তিন মাস ধরে এরকম মুরগি মেরেছে। এইসময় বিড়ালকেও সে একদম দেখতে পারত না। আগেও পারত না, কিন্তু তখন শুধু দাবড়ানি দিত। পরে দুই-তিনমাসের ওই সময়টায় বিড়াল দেখলেই জানে মেরে ফেলত। বেশ কয়েকটারে এরকম মেরেছে। তবে এরকম কোনো ঘটনা ঘটানোর পর একটা জিনিস লক্ষ্য করতাম ওর মধ্যে। যেমন ওইদিন পারতপক্ষে আর আমার চোখের দিকে তাকাত না। মাথা নিচু করে চোখ নামিয়ে রাখত। কাছে ডাকলে সবসময় যেমন দৌড় দিয়ে আসত, ওইরকম আসত না। আস্তে আস্তে পা ফেলে, অপরাধী মুখ নিয়ে ভয়ের সাথে আসত।
    তার মানে সে বুঝতে পারত সে অপরাধ করেছে।
    হ্যা। তারপর ও একদিন করল কী, আমাদের নিজেদের বাড়িরই একটা ডিমপাড়া মুরগি মেরে ফেলল। আমি তখন স্কুলে। বিকালে স্কুল থেকে এসে এই খবর শুনে মাথা গেল গরম হয়ে। ছোটভাইরে বললাম, দড়ি নিয়া আয়, আজকে ওরে জনমের শিক্ষা দিমু। রুস্তমরে কষে গাছের সাথে দড়ি দিয়ে বাঁধলাম। তারপর একটা মোটা চেলাকাঠ নিলাম। এলোপাথারি শুরু করলাম পিটানি। চেলাকাঠ বুঝেন? এক্কেবারে সাথে সাথে কালশিরা পড়ে গেল। তবে আজব ব্যাপার কী জানেন? এতো মারলাম, ব্যাটা সব চুপ করে হজম করল। আছে না অনেক সময়, মাইর খেতে খেতে ক্ষেপে উঠে? না, ও একটা টু শব্দও করল না, এক্কেরে চুপ করে দাঁড়িয়ে মার খেতে লাগল। আমার তো মেজাজ বেজায় গরম হয়েছিল, ওর জন্য আত্মীয়স্বজনের কাছেও আমার কথা শুনতে হত।
    তো সবকিছু মিলিয়ে মাথা সেদিন হট। পিটাতে পিটাতে ঠিক করলাম শালারে আজকে মেরেই ফেলব। আধাঘণ্টা পরে ও আর দাঁড়াতে পারল না, আধমরা হয়ে মাটিতে প্রায় শুয়ে পড়ল। একঘণ্টার মতো ইচ্ছামত পিটালাম। নাক-মুখ দিয়ে রক্ত তো বের হয়েছেই, সারা শরীরও রক্তাক্ত হয়ে গেছে। পরে আমার কাছে একটা বিষয় খুব অবাক লেগেছে। পিটানি শুরু করার কিছুক্ষণ পরে বানগুলো মানে দড়ির বাঁধনগুলো ঢিলা হয়ে গেছিল। ও কিন্তু একটু চেষ্টা করলেই পালাতে পারত। ব্যাটা তা করে নাই, চুপ করে ভোন্দার মতো মাইরগুলা খেয়েছে। যাইহোক, মারতে মারতে এক পর্যায়ে মেরেই ফেললাম।
    মেরে ফেললেন? আমি, রিপনভাই দুজনেই একসাথে প্রায় চেচিয়ে উঠি।
    শোনেন, আরো কাহিনী আছে। এরপর ছোটভাই আর আমি মিলে রুস্তমরে ধরে বাড়ি থেকে সামান্য দূরে খালপাড়ে ফেলে দিয়ে আসলাম। ব্যস, ঘটনা খতম। কিন্তু শালা মরে নাই আসলে, অজ্ঞান হয়ে গেছিল। পরে রুস্তম যেটা করল, খাল তো, ব্রিজের ওইপারে চলে গেল। ওখানে সরদার বাড়ির একটা বিশাল মাঠের মতো জায়গা ছিল। সেখানেই সে থাকত আর কী। আমাদের বাড়িতে আর আসে নাই।
    আর আসে নাই? একবারের জন্যও না?
    নাহ, আর আসেই নাই। এবং তখন থেকে ও খুব শান্ত হয়ে গেছিল। আর কাউকে কখনো কামড়িয়েছে বলে শোনা যায় নাই। চুপচাপ থাকত। কেউ খাবার দিলে খেত, নইলে না। মানে একরকম স্বেচ্ছা নির্বাসনে ছিল আর কী।
    অদ্ভুত তো! এত বিশাল চেঞ্জ!
    হু। এখনও শেষ হয় নাই। আসল কাহিনীই তো রয়ে গেল।
    আসল কাহিনী কী?
    রুস্তমের মৃত্যু। শেষটা এরকম না ঘটলে এই কাহিনী আমি আপনাদের বলতাম না। রুস্তম বছর দুয়েক বাদে একদিন আমাদের বাড়িতে ফিরে আসল। আমি তখন ঘরের দুয়ারে বসে আছি। দেখলাম বাড়িতে ঢোকার মুখে রাস্তার ওপর দাঁড়িয়ে আছে। বাড়ির সীমানায় ঢোকেনি কিন্তু, রাস্তার ওপরে, আমার দিকে তাকিয়ে আছে। বুড়ো হয়ে গেছে, গায়ের লোম অর্ধেক ঝড়ে গেছে, দুর্বল শরীর। আমি দেখে চিনলাম, গায়ের রঙ তো আর বদলায়নি। হাত ইশারা করে ডাকলাম। আস্তে আস্তে ভিতরে আসল, চোখ ঘুরিয়ে বাড়ির এদিক-ওদিক দেখতে দেখতে। আমার তিন-চার ফিট সামনে এসে দাঁড়িয়ে পড়ল। আমার দিকে চেয়ে রইল। আমি দুয়ার থেকে নিচে নামলাম। নামা মাত্রই আমার পায়ের মধ্যে এসে মুখ ঘষা শুরু করল আর কান্না। বিশ্বাস করবেন না, সে কী কান্না রে ভাই, কী বলব। এমন আবেগী, দরদী কান্না! মা যেমন অনেকদিন পরে তার হারানো সন্তানকে ফিরে পেয়ে চুমোয় চুমোয় মুখ ভরিয়ে আনন্দের কান্না কাঁদে, রুস্তমও ঠিক সেরকম করেই কাঁদছিল। ওর কান্নার শব্দে বাড়ির ভিতর থেকে সবাই বেরিয়ে আসে। এমন করে কাঁদল, আমার নিজেরই কান্না চলে এসেছে। আমি তো পুরো তাজ্জব, কিংকর্তব্যবিমূঢ় অবস্থা।
    যাহোক, তারপর বাড়িতেই থাকল। আমরা একটু আদর-যত্ন করার চেষ্টা করলাম। এতদিন পরে আমাদের মনে করে ফিরে এসেছে। মানুষই মনে রাখে না, আর ও সামান্য প্রাণী হয়ে মনে রেখেছে! কিন্তু সপ্তাহ খানেক ছিল মাত্র। তারপর এক সকালে উঠে দেখি মারা গেছে।
    শুনে দুজনেই তুহিনের মুখের দিকে চেয়ে রইলাম, মুখ দিয়ে হঠাৎ কোনো কথা বেরুল না।

    ফাল্গুন ১৪১৫

  • ওড়ার স্বপ্ন

    ‘শইলের ত্যাজ তোর কয়দিন, ঢইল্যা গেলেই সব শেষ ! নিজে তো মাজা ভাইঙ্গা বছর ধইড়া পইড়া রইছি ; বন্যায় মাইনষের ধান-পান সব গেল, তোরে কামের লেইগা কেডা ডাকব ? শইল ঠিক থাকলে আমিও মাইনষের লাহান ঢাহা যাইতাম কাম করতে, কয়ডা ভাতের লেইগা মাইনষের চেট দোয়াইতাম না।’ আক্ষেপ আর নিচু গলায় কথাগুলো বউ-এর উদ্দেশে বলে চলে আমের আলী।
    তার বউ বনির মুখে রা নাই দেখে আমের আলী খানিক চুপ থাকে, তারপর অপরাধী-কণ্ঠে বলে, ‘আইজ আইব, তুই না-করিস না। এই বন্যাডায় আলাউদ্দি না থাকলে আমরা বাঁচতাম ? আপদে-বিপদে সাহাইয্য করছে।’
    বনি নিশ্চুপ, তার চোখে সন্ধ্যার ঘনায়মান ছায়া। শূন্য চাহনি নিয়ে তাকিয়ে আছে সে দূরের আসমানে।
    রাশি রাশি ছায়া নদীতীরের গ্রামটিকে জাপটে ধরেছে। দিনটা আজকে খুব গুমোট গেছে, বাতাস নেই। ভূত-অন্ধকারে দীঘির বটগাছটিকে খুব রহস্যময় লাগে। বছরের পর বছর নির্জন মাঠে একা দাঁড়িয়ে আছে গাছটা। কালো ছোপ-ছোপ অন্ধকার বটের মাথায় যেন গুচ্ছ-গুচ্ছ চুল। সন্ধ্যারাতের চাঁদের আলোয় গাছটকে বুড়ো দানব মনে হয়।
    এই নির্জন অন্ধকারে একটি ছায়ামূর্তি হেঁটে আসছে। চলন্ত ছায়ামূর্তি নদীতীর ছেড়ে এবার দিঘির রাস্তা ধরে। বেশ খানিকটা পথ মাড়াতেই অদূরে নারকেল গাছটির মাথায় ঝুলে থাকা চাঁদ নজরে আসে। স্বস্তির নিশ্বাস ফেলে এবার হাঁটার গতি কিছুটা কমিয়ে দেয়। ফুরফুরে হাওয়া ওঠে চারপাশে। গাছের পাতায় শিরশিরে আওয়াজ তোলে। চলন্ত মূর্তির লোমে ভরতি বুকেও বাতাসের পরশ লাগে, পরিপূর্ণ সুখের আবেশ অনুভব করে সে, রক্তের প্রতিটি বিন্দু তার আন্দোলিত হয়। চলন্ত মূর্তির নিশ্বাস দ্রুত হয়, বড়ো বড়ো পা ফেলে এক সময় পৌঁছে যায় জীর্ণ নারকেল গাছটির কাছে। পাশেই আমের আলীর এক চিলতে উঠান।
    আমের আলী উঠানে ছায়ামূর্তির গলা খাঁকারি শোনে। তার বউ বনি দাওয়ার কোণে ছোট ছেলেটি নিয়ে বসেছে। ক্ষুধার জ্বালায় সারাদিন কেঁদেছে মাসু। সকাল থেকে পানি ছাড়া কারো গলায় তো কিছু ঢোকেনি। গতরাতে অবশ্য সাদা ভাত জুটেছিল। পাঁচ বছরের রাসুটা ক্ষুধায় ঘ্যান ঘ্যান করে এই মাত্র ঘুমিয়ে পড়েছে।
    ‘ও আপনে, আহেন ভাইসাব,’ আমের আলীর গলায় বাঁক, কণ্ঠে দরদ।
    ঘরে আলো জ্বলেনি। আর আলোই বা লাগে কিসে ! খাওয়ার ঝামেলা নেই, অন্য কোনো কাজ নেই, শুধু পেটভরে পানি খেয়ে মরাঘুম দেয়া। খাওয়াই জোটে না তায় আবার কুপির তেল !
    বনি দাওয়া থেকে উঠে ঘরে ঢোকে। চৌকিতে বিছানো জীর্ণ তালিমাড়া কাঁথার ওপর ঘুমন্ত ছেলের হালকা শরীরটাকে শুইয়ে দেয়। লিকলিকে দেহ। গায়ের হাড় সবই গোনা যায়। চৌকিতে বিছানো কাঁথাটি জরাজীর্ণ কিন্তু মলিন নয়। ছাপড়া ঘরের ভিতরে দারিদ্র্যের মলিনতা স্পষ্ট হলেও সবকিছুতে পরিপাট্য। এক ধরনের মিথ্যে খোয়াবি স্নিগ্ধ হাওয়া বিরাজ করে। ছেলেকে নামিয়ে রেখে উন্মুক্ত স্তনে শাড়ির আঁচল টানতে গিয়ে স্বামীর কথাটা বনির কানে আটকে যায়, ‘আপনের দয়ার দিল ; আপনেগো মতন মানুষ আছে বইলাই তো আমরা বাঁইচা আছি।’
    ‘তা মিয়া তোমার শইল কেমন অহন ?’ প্রশ্নটি কেবল উচ্চারিত হয়, কিন্তু জবাব পাবার আগেই আলাউদ্দিন নিজের নির্ভুল দূরদর্শিতা হাজির করে, ‘আমি তো আগেই কইছিলাম মিয়া, রিকসা চালান তোমার কাম না, মাজা ভাইঙ্গা অহন বোঝ !’
    কিছুক্ষণ স্তব্ধতা। কোনো সাড়া-শব্দ নেই। আলাউদ্দিন একসময় কাশাকশি শুরু করে, গলা পরিষ্কার হলে সে ফিসফিস স্বরে বলে, ‘কী মিয়া, হইব তো !’
    ফের নিস্তব্ধতা। অন্ধকার ফুড়ে একসময় ঠাণ্ডা স্বর বেজে ওঠে, ‘যান মিয়াভাই, ভিতরে যান, কোনো অসুবিধা নাই।’
    ‘না !’ সাথে সাথে ঠাণ্ডা অথচ দৃঢ় কণ্ঠে উচ্চারণ আসে ঘরের ভিতর থেকে।
    পান-খাওয়া কালো দাঁত, মোটা ঠোঁটের ফাঁক দিয়ে ভস ভস করে বেরিয়ে আসা সিগারেটের কটু গন্ধ। বেঢপ দেহের কর্দয একটা মূর্তি বনির চোখে ভেসে ওঠে। অনেক দিন থেকেই এ ভূতছায়া তাকে তাড়িয়ে বেড়াচ্ছে। সেদিন ঘাট থেকে ফেরার পথে বাঁশঝাড়ে লুকিয়ে-থাকা বেঢপ-দেহ হাত টেনেছিল তার, কিন্তু পারেনি। সে আবার জোরাজুরিতে অবিশ্বাসী, এভাবে নাকি সুখ পাওয়া যায় না।
    নিস্তব্ধতা। অদূরে কোথাও কুকুর ডাকছে। চৌকিদার-বাড়ির বড়ো কাঁঠালগাছে হঠাৎ রাতের বেলা কাকেদের অস্বাভাকি ডাকাডাকি শুরু হয়। নির্জনতা ভেঙে দেয় কা কা শব্দ।
    ‘তাইলে অহনই আমার বারশো’ টাহা ফেরত দে। পানির সময় বিশ কেজি চাইল দিছি। আইজই সব ফিরত দিবি হালারপো, তোগো কত ত্যাল হইছে আইজকা সব বাইর করুম।’ লোকটা গজরায়।
    আমের আলী ঘাবড়ে যায়। একটু পর গলায় জোর টেনে নিয়ে বলে ‘আপনে ভিতরে যান মিয়াসাব। মাইয়া মাইনষের কথা দিয়া তো আর দুন্নাই চলব না।’
    আবার অপেক্ষা। একটানা ঝিঁঝিঁর শব্দ শোনা যায়। ভেতর ঘর থেকে আর কোন সাড়া শব্দ না পেয়ে আলাউদ্দিন উঠে দাঁড়ায়, সাহসে ভর দিয়ে ইতস্তত পায়ে অন্ধকার মাড়িয়ে দরজায় এসে দাঁড়ায়। ঘরের ভিতর দৃষ্টিজাল ফেলে দেখে, জমাট বাঁধা কালোর মাঝে একজোড়া স্থির নিষ্পলক চোখ জ্বলজ্বল করছে। আলাউদ্দিন দোরের ঝাপিটা ঠেলে দেয়।
    ‘খবরদার লুইচ্চার বাচ্চা, আর এক পাও আইবি তো কল্লা ফালাইয়া দিমু !’ ক্ষিপ্র কণ্ঠের বজ্রাঘাত হতেই আলাউদ্দিন ভূতগ্রস্তের মতো ঘরের ঠিক মাঝখানে দাঁড়িয়ে পড়ে। প্রচণ্ড ঝড়ে কাঁপতে থাকা গাছের মতো বুক তার কেঁপে ওঠে। নিশ্বাস আটকে যায়। ভয় পেয়ে দুকদম পিছিয়ে এসে দরজার ঝাপিটা এক ঝটকায় সরিয়ে ফেলে সে। ফিনকি দিয়ে ঘরের ভিতর চাঁদের ফিকে আলো প্রবেশ করে। অস্পষ্ট আলোতে দুইহাতে উঁচু করে ধরা দাওটার দিকে তীক্ষè চোখে তাকিয়ে বনিকে ফণাতোলা গোখরোর চেয়েও ভয়ংকর মনে হয় তার। নিজের অজান্তে ঘাড়ে হাত বুলাতে গিয়ে আলাউদ্দির পুরো গা ছমছম করে ওঠে। নিঃশব্দে দাওয়ায় নেমে টুঁ-শব্দটি না করে একবারও পেছন না ফিরে হনহন করে উঠান পেরিয়ে যায় লোকটা।
    বনি উদ্যত ফণা নিয়েই দাওয়ায় এসে দাঁড়ায়। একটা বিশ্রী গালি আমের আলীর জিহ্বার ডগায় এসে আটকে যায়। বউয়ের হাতে খাড়া দা’টার দিকে তাকিয়ে ঠোঁটের ফাঁক দিয়ে শব্দ বের করতে পারে না। বনি দাও নামিয়ে রাখতেই আমের আলী দীর্ঘশ্বাস ঝরিয়ে বিড়বিড় করে, ‘কামডা তুই বালা করলি না।’
    দূরের কোনো বটের পাতায় পাতায় অস্পষ্ট শব্দগুলো যেন ঝনঝন করে ওঠে। আমের আলী আর কিছু বলল না বটে, তবে এই একটি কথার অর্থ বুঝতে বনির বিন্দুমাত্র কষ্ট হয় না।
    রাত বাড়ে। রাত গাঢ় হয়। আমের আলীর শঙ্কাগ্রস্ত কথাটা নির্জীব হয়ে পড়ে। চোখের পাতা ভারি হয় এবং একসময় তা বুজে আসে। কিন্তু সমস্ত চোখ বুজে গেলেও ছাপড়া ঘরের ভিতর শুধু একজোড়া জ্বলজ্বলে চোখ নিদ্রাহীন হয়ে ভোরের প্রতীক্ষা করে।
    আবছা অন্ধকার এখনো পুরোপুরি কাটেনি। সূর্যের লাল দ্যুতি চারদিকে। বনি তার সযত্নে রক্ষিত পলিথিন ব্যাগটিতে কাপড়সহ দু-একটি প্রয়োজনীয় জিনিস ভরে নেয়, তারপর ঘুমন্ত মাসুকে কোলে নিয়ে বড় ছেলের হাত ধরে দাওয়ায় এসে দাঁড়ায়। আমের আলীর চোখে ঘোলাটে দৃষ্টি। কী ঘটতে যাচ্ছে বুঝতে পারছে না। এমন পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়ে সে কেমন অস্থির বোধ করে, অবাক কণ্ঠে জানতে চায়, ‘তুই কই যাস ?’
    ‘ঢাহা।’ বনির সহজ জবাব।
    ‘ঢাহা গিয়া কী করবি ?’
    বনি ঠোঁটের ফাঁকে এক চিলতে ঘৃণার হাসি ফুটিয়ে তোলে, তার শুকনো মুখে সে হাসি মরা দেখালেও বড়ো দৃঢ় সেই ভঙ্গি, ‘শইলে যহন জোর আছে খাইটটা খামু, আকাম করমু না।’
    উঠানের প্রান্তে জীর্ণ নারকেল গাছটির শাখাগুলো তখন হাওয়ায় পাখা মেলছে। বিয়ের পর স্বামীর ভিটায় এসে বনি নারকেলের চারাটি লাগিয়েছিল। উঠানে নেমে গাছটির দিকে বনি একবার তাকায়, তার মনে হল পাখির মতো ডানা দুলিয়ে গাছটা বুঝি এখুনি উড়ে যাবে। অথচ গাছটির শেকড় মাটি কামড়ে আছে শক্ত করে। স্তব্ধ হয়ে যায় বনি। স্বামী, এই বাড়ি, এই গ্রাম, দুটো সন্তান জন্ম দিতে গিয়ে এই চালা ঘরটার রক্তমাখা মাটি পেছনে ফেলে কোথায় যাবে সে ?
    ভোরের বাতাসে বনির জীর্ণ শাড়ি পাখা হয়ে উড়ে যেতে চায়। অথচ তার পা দুটো নারকেল গাছটার শেকড়ের মতোই মাটি কামড়ে আছে। তখন বনির দুচোখ ঝাপসা হয়ে আসে।

    জানুয়ারি ’০৫

  • আমার দুই প্রেমিকা

    আমার দিকে ড্যাবড্যাব করে তাকান ক্যান? আম্মুকে বলে দেবো।
    কী?! আচমকা তিয়ার কথাটা শুনে থতমত খেয়ে উঠি, একেবারে বেক্কেল হয়ে যাই। বলে কি মেয়েটা? এইটুকুন মেয়ে, মাত্র ছয় ক্লাসে পড়ে, নাক টিপলে এখনো যার দুধ বেরুনোর কথা, সে কিনা আমার চোখের চারিত্রিক দুর্বলতা নিয়ে অভিযোগ তোলে! আবার আম্মুকেও বলে দেওয়ার হুমকি!
    কয়েক সেকেন্ড আমি পুরো থমকে যাই। থমকে ওর মুখের ওপর তাকিয়ে থাকা আমার অবাক স্থির চোখদুটোকে একটু বাদে সরাতে বাধ্য হই। চোখ রাখি খোলা অংক বইটার ওপর। শতকরা অনুশীলনী থেকে দশটা অংক তিয়াকে হোমওয়ার্ক দিয়েছিলাম। একটাও করেনি শুনে বিরক্ত-চোখে খানিক ওর দিকে তাকিয়েছিলাম, শেষটায় অবশ্য সে দৃষ্টির একটু রকমফের হতে পারে কিন্তু তাই বলে এমন সাংঘাতিক অভিযোগ! শত হলেও আমি ওর শিক্ষক, হই না প্রাইভেট টিউটর, তাতে কী? বয়সেও আমি ওরচে’ বারো বছরের বড়ো। এতসব কিছুকে ছাপিয়ে পুচকে মেয়েটা বেফাঁস কথাটা মুখে আনলো কী করে? আরো অবাক লাগছে, এই ড্যাবড্যাবের শব্দটা তিয়া শিখলই বা কোত্থেকে? ও, দুপুরবেলা হোমওয়ার্কের বদলে আজকাল মায়ের সাথে বসে বসে নিশ্চয়ই বাংলা ছবি দেখা হয়!
    এমন ড্যাবড্যাব করে তাকানোর কথাটা জীবনে আর কোনো মেয়ের মুখ থেকে আমাকে হজম করতে হয়েছে? মগজের অলিতে-গলিতে দ্রুত উঁকি-ঝুঁকি মারতে সেই স্কুলজীবনে ফিরে যাই। শাওনই ছিলো একমাত্র মেয়ে যে এই কথাটা আমাকে বলেছিলো। বলে ফেলেই টুক করে মিষ্টি হেসে কোমর দুলিয়ে চলে গিয়েছিলো। শাওনের সেই অভিযোগে রস ছিলো, যেই রসে জারিত হওয়া যায়, যেই রসে কেবল চুমুকে চুমুকেই তৃপ্তি, অভিযোগ স্বীকার করে নেয়াতেই আনন্দ কারণ এতে অভিযোগওয়ালারও পূর্ণ সমর্থন আছে। কিন্তু তিয়ার ক্ষেত্রে? ঠিক তার উল্টোটা। ছোটোখাটো কোমল মেয়েটা যে মাত্র সদ্য কৈশোরে পা দিয়েছে, গায়ে এখনো শৈশবের গন্ধ ওর মুখে এমন কমপ্লেন শোনা শিক্ষক হিসেবে আমার জন্য যেমন দারুন লজ্জার আবার কথাটার একেবারে প্রতিবাদ না-করা মানে আমার বেচরিত্র স্বীকার করে নেয়া।
    এ-ক থাপ্পড় লাগাবো ফাজিল মেয়ে, বেত্তমিজের মতো কথা! তোমার দিকে আমি ড্যাবড্যাবিয়ে তাকাতে যাবো কেন? চোখ গরম করে ডানহাতের থাবা তুলে মনে মনে তিয়ার কথাটার প্রতিবাদ করি। কিন্তু ও যেমন মেয়ে, বিন্দুমাত্র দমে না-গিয়ে ফস্ করে বলে ফেলতে পারে, এ-হ, নিজে খারাপ করে তাকাবে আবার বললে বলে থাপ্পড় মারবে? মারেন দেখি?
    কোনটা যে ড্যাবড্যাবিয়ে তাকানো আর কোনটা যে নরমাল করে তাকানো দুটোর বিচারকই যেহেতু তিয়া, অতএব সে যা বলবে সেটাই শেষকথা এবং বিচারে তালগাছ ওরই ভাগে। অবশেষে একটা হাঁটুরবয়সী মেয়ের কাছ থেকে ‘চরিত্রহীন গৃহশিক্ষক’ আখ্যা পেতে হবে? উঃ, কী সাংঘাতিক! না না, এ ব্যাপারে ধমকি-ধামকি তো দূরের কথা, কথা বলারই দরকার নাই। এম্নিতেই কথাটা ওর মা’র কানে যায় কিনা সেটা নিয়েই তো এখন ভয় লাগছে। তিয়া তাহলে এবার বড়ো হয়ে গেছে, পুরুষের দৃষ্টির ভাষাও পড়তে শিখে গেছে!
    স্যার, এখন কি করবো?
    অ্যা? আমি প্রায় চমকে অংক বই থেকে চোখ তুলে তিয়ার দিকে তাকাই। প্রশ্নের উত্তরের জন্য তিয়া আমার দিকে চেয়ে। স্বাভাবিক চাহনি। একটু আগে যে কথাটা বলে আমার বুকের ধড়ফড়ানি ঘণ্টায় পঞ্চাশ মাইল করে দিয়েছিলো সেটা যেন ভুলেই গেছে, যেন এটা আর আট-দশটা কথার মতোই সহজ সাদসিধে কথা।
    কী হলো, বলেন না কী করবো?
    ও, ইয়েÑএই হোমওয়ার্কটাই শেষ করো আগে। কোনোরকমে গলা স্বাভাবিক রেখে জবাবটা দেই।
    আচ্ছা। বলে তিয়া বই টেনে নিয়ে করতে শুরু করে।
    আমি চেয়ারে পিঠ এলিয়ে দিয়ে একটা চাপা স্বস্তির নিশ্বাস ছাড়ি। আড়চোখে তিয়াকে দেখি, অংক করছে। ছোট্ট টুনটুনি পাখিটা ছোট্ট হাতে কলম চেপে গুটি গুটি করে খাতায় লিখছে। ওর হাতের লেখা মোটেই সুন্দর না, কাকের ঠ্যাং বকের ঠ্যাং মার্কা কিন্তু ও যখন লিখতে থাকে আমার দেখতে ভালো লাগে। লেখার সময় ও ঘাড়টা এমন ভাবে বাঁকায়, চোখে থাকে এমন একটা দৃষ্টি, হাত এতো আস্তে আস্তে সুন্দর করে চলতে থাকে যে আমি মুগ্ধ হয়ে তিয়াকে দেখি। ওকে পড়াতে এলে সবসময় আমি চেষ্টা করি কীভাবে ওকে লেখা দিয়ে ব্যস্ত রাখা যায়। ও আবার একদম লিখতে চায় না। পড়াশুনাও যে তেমন একটা করে তা-না। ধাক্কিয়ে ধাক্কিয়ে পড়াতে হয়। খালি ফাঁকিবাজির তালে থাকে। আমার জান দফা-রফা করে ফেলে মেয়েটা। মাঝে মাঝে অতিষ্ঠ হয়ে যখন বকাঝকা শুরু করি ও ভুরু-চোখ-মুখ কুঁচকে বিদঘুঁটে একটা চেহারা তৈরি করে, গোঁজ হয়ে কথার উত্তর না দিয়ে ঝিম মেরে বসে থাকে। ওর চেহারা তখন বড়দের মতো রাগি-রাগি হয়ে যায়, নাকের পাটা ফুলে ওঠে। টুনটুনিটা আবার রাগও করতে পারে! উপরে উপরে গলা তুলে ধমকি-ধামকি চালালেও ভিতরে ভিতরে ওর এই ভঙ্গিটা দেখতে আমার দারুন লাগে। আমার খুব ইচ্ছে করে ও তখন প্রেমিকার মতো আমার সাথে ঝগড়া করুক, আমার সাথে চোখ রাঙিয়ে কথা বলুক। ঝগড়ার মধ্যেও তো একটা মজা আছে, তাই না? কিন্তু ও একেবারে বোবা সেঁজে থাকে তখন, দশটা কথা জিজ্ঞেস করলে ঝাঁমটা মেরে একটা কথার উত্তর দেয়।
    যা হোক, তিয়া এখন শান্ত হয়ে শতকরার অংকগুলো করছে। কালকে ওর এটার ওপর ক্লাস টেস্ট। দশটা অংক ওকে আগে বহুবার করানো হলেও প্রত্যেকবারই ও সিলি মিসটেক করে দু-তিনটা অংক ভুল করবেই। এর মধ্যে তিয়া দুটো অংক ভুল-ভাল না-করে শেষ করে এখন তিন নম্বরটি শুরু করেছে। আমি জানি আর একটা বা দুইটা শেষ করেই তিয়া ঠাস করে খাতার ওপর কলমটা রেখে চেয়ারে দেহটা সোজা করে বলবে, উহ, হাত ব্যথা হয়ে গেছে, আর করবো না স্যার, সবগুলাই পারি।
    আমাকে তখন বলতে হবে, পারলে করে দেখাও।
    আরে বাবা, পারি তো, খামাখা করবো কেন?
    সবগুলা অংক তুমি একদিনও কারেক্ট করতে পারছো?
    তিয়া তখন অকৃত্রিমভাবে হেসে উঠবে, স্বীকারোক্তিপূর্ণ দুষ্টমি ভরা হাসি। হাসলে ওর দুই গালে বিন্দুর মতো টোল পড়ে, অদ্ভুত লাগে দেখতে বড়সড় টোলের চেয়ে এ ধরনের বিন্দুর মতো টোল-পড়া গালের হাসি আরো সুন্দর ও রহস্যময় লাগে। হাসার সময় তিয়ার দুই কাঁধ খানিক উঁচুতে উঠে যায়, বুকও ওঠে পুরো দেহেই কয়েক সেকেন্ড মৃদু কাঁপুনি চলে। আমি তখন চোখেমুখে একটা রাগের নকল-ভাব এনে ওর দিকে তাকাই। আমি রেগে যাচ্ছি দেখে তিয়ার হাসিতে নতুন মাত্রা যোগ হয়, ও মজা পায়। কিন্তু ভেতরে ভেতরে ওর এই হাসির জন্য আমি যে পিপাসার্তের মতোই অপেক্ষায় থাকি ছোট্ট টুনটুনিটা এটা জানে না। এমন হাসির সময়েই ছোট্ট টুনটুনিটার কুঁড়ির মতো দুটি বুক ক্ষিপ্র ভঙ্গিতে ওঠা-নামা করে। সেই মুর্হর্তে সেদিকে অবশ্য আমি আঁশ মিটিয়ে তাকাতে পারি না কারণ তিয়ার চোখ থাকে আমার দিকে। আমি কেবল আঁড়চোখে কোনরকমে একবার দৃষ্টিটা সেদিকে ঘুরিয়ে এনেই জোরে ধমকে উঠি, থামো।
    তিয়া থেমে যায়, সাথে সাথেই থেমে যায়।
    করো, সবগুলা শেষ করো। আমি গম্ভীরস্বরে আদেশ দেই।
    আমি সবগুলাই পারি, শুধু শুধু কষ্ট করতে পারবো না।
    সবগুলা করে তারপর বলো পারি।
    আমি সবগুলা করবো না, ব্যস।
    আমি বলেছি তোমাকে সবগুলা করতে হবে, তুমি করবে।
    তো প্রায়ই পড়া নিয়ে এরকম টানাটানি চলে। মাঝে মাঝে আমি জিতি, মাঝে মাঝে তিয়া। কখনো কখনো মনে হয় আমি না তিয়াই আমাকে পড়াচ্ছে। তিয়ার ওপর জোর খাটিয়ে কাজ করানো খুবই কঠিন মামলা। মেয়ে মানুষ, গায়ে হাত তোলারও উপায় নেই। তার উপর বাপের পেয়ারের কন্যা। বাপ থাকে অ্যামেরিকায়, বাপের কড়া নির্দেশ মেয়েকে পেটানো যাবে না। কী আর করা? মায়ের কাছে বিচার দিয়ে আর ধমকি-ধামকি-রাগারাগি করে যতটুকু চালানো যায়, সেভাবেই চলছে। ইদানীং আবার তিয়াকে নিয়ে আমার অন্য টেনশনও হচ্ছে। সেদিন বললো, ওই পাশের বিল্ডিংটার একটা ছেলে নাকি ওকে দেখতে পেলেই বারান্দায় এসে দাঁড়িয়ে থাকে। দেখে মিটিমিটি হাসে। শুনে আমার মাথা দিয়ে আগুন বেরুচ্ছিলো, যৌবনের বাতাস মাত্র লাগতে শুরু করেছে তিয়ার গায়ে, এখনই এরকম হলে কদিন পরে তো..., আমার নিশ্বাস আটকে আসছিলো, জিজ্ঞেস করলাম, আর তুমি? তিয়া খিলখিল করে হেসে উঠলো, আমি আবার কী করবো? বাধ্য হয়ে ঘরের জানালা বন্ধ করে দেই।
    আমি ঘড়ি দেখি। আধাঘণ্টা হয়েছে পড়াতে এসেছি। আর বিশ-পঁচিশ মিনিটের মধ্যেই তিয়ার মা নাস্তা নিয়ে আসবে। আজকে সম্ভবত নুডুলস্। খানিক আগে অফভয়েসে শোনা গেলো, কাকে যেন নুডুলস্ আনতে পাঠানো হচ্ছে। ভালোই, নুডুলস্ আমার পছন্দের একটা খাবার আর তিয়ার মা’র হাতে বানানো নুডুলস্ তো অসাধারণ, বাংলাদেশে আর কোথাও আমি এতো ভালো নুডুলস্ খাইনি। একদিন সুযোগ বুঝে এ-কথাটাই তিয়ার মাকে বলতে তিনি খুশি হয়েছিলেন এবং এর পর থেকে দেখা গেলো নাস্তা হিসেবে ঘন ঘন নুডুলস্ আসছে।
    আমি আবার ঘড়ির দিকে তাকালাম। পাঁচটা বাজতে খুব বেশি দেরি নেই। অপরাজেয় বাংলার সামনে পাঁচটা বাজে মিলা আমার জন্য অপেক্ষা করবে। তিয়াকে শেষ করে সিএনজি-তে গেলেও বিশ মিনিট লেট হয়ে যাবে। কমপক্ষে একঘণ্টা না-পড়িয়ে চলে যাওয়া খারাপ দেখায়। অবশ্য তিয়া একঘণ্টার বেশি পড়েও না। আমি বেশি সময় দিতে চাইলেও কাটায় কাটায় একঘণ্টা পার হলেই মেয়েটা উসখুশ শুরু করে। তারপর হোমওয়ার্কের খাতাটা এগিয়ে দিয়ে বলে, নেন স্যার, হোমওয়ার্ক লিখে ছুটি দ্যান।

    সিএনজি করে ইউনিভার্সিটির অপরাজেয় বাংলার সামনে যখন এসে পৌঁছলাম তখন সাড়ে পাঁচটা। ঝকঝকে বিকেল চারপাশে ছড়ানো। মিলা একটা ইউক্যালিপ্টাস গাছের নীচে গালে হাত দিয়ে বসে আছে। দূর থেকেই বোঝা যাচ্ছে ওর মুখের কঠিন ভঙ্গি। আমি গুটি গুটি পায়ে সামনে এগিয়ে অপরাধীর মতো ওর পাশে বসে বললাম, সরি। মিলা কটমট করে তেরছা চোখে একবার আমাকে দেখে নিয়ে পলকে চোখ অন্যদিকে ঘুরিয়ে ফেললো।
    চটে আছে মিলা। চটারই কথা। শুক্রবার ও ছায়ানটে গান শিখতে আসে। গানের ক্লাস শেষ হয় পাঁচটা বা পাঁচটার আগেই। এতোক্ষণ শাড়ি পড়া একটা সুন্দরী মেয়ের জন্য একা একা অপেক্ষা করা মোটেই সুখকর কাজ না।
    আই, শোনো না বাসায় গেস্ট আসছিলো তো, বের হতেই দেরি হয়ে গেছিলো। আমি আস্তে আস্তেকৈফিয়ত দেয়ার সুরে বলতে থাকি কিন্তু মিলার মুখ এইদিকে ঘোরে না। আমি কণ্ঠে আদুরে ভঙ্গি আনি, কী করবো বলো? ওই টিউশনিতেও-তো একঘণ্টার নীচে পড়ানো যায় না। শুক্রবারসহ তিনদিন মোটে পড়াই।
    কথা আর শেষ করা হয় না, মিলা গরম-চোখে তাকিয়ে ছ্যাৎ করে ওঠে, টিউশনিটা তুমি ছেড়ে দিতে পারো না? দরকার কী তোমার টিউশনির? সপ্তাহের একটা দিনও আমারে সময় দিবা না?
    তিয়াকে আমি ক্লাস ফাইভ থেকে পড়াচ্ছি। স্বভাবমতো যত্ন নিয়ে পড়ানোয় প্রথম পরীক্ষায় ভালো করে। ভালো টিচার হিসেবে আমার একটা বিশ্বাসযোগ্যতা তৈরি হয়ে যায়। অংকে বহুকষ্টে পঞ্চাশ পাইয়ে ওকে সিক্সে উঠাই। এদিকে আমারও মাস্টার্স শেষ হয়ে যায়। এখন ছয় মাস হলো একটা মোবাইল কোম্পানিতে চাকরি করছি। সাড়ে সতেরো হাজার টাকা বেতন। আমার চাকরির সুখবরটা শুনে তিয়ার মা হাসিমুখে বলেছিলেন, ভালোই তো। ..অফিস-টাইম পাঁচটা পর্যন্ত? তাহলে আর অসুবিধা কী? তুমি তো আসো সন্ধ্যার পরে। কষ্ট করে হলেও আমার মেয়েটাকে তুমি পড়াও বাবা, দরকার হলে একদিন কম আসো। ছোট্ট টুনটুনিটাকে ছেড়ে আমিই কি যেতে চাই? চাকরির কথাটা বলে নিজের একটু দাম বাড়িয়ে নিলাম আর-কি। মাস শেষে দেখা গেলো চারদিনের জায়গায় তিনদিন পড়ানোর পরেও বেতন পাঁচশো টাকা বেড়ে গেলো।
    আমি কাঁচুমাঁচু মুখে উত্তর দেই, অনেকদিন ধরে টিউশনিটা করাই, একটা ভালো রিলেশন হয়ে গেছে। ..চাকরি পেয়েতো ছেড়েই দিতে চাইছিলাম.., তাছাড়া বেতন আর টিউশনির টাকাটা মিলে একটা রাউন্ড ফিগার বিশ হাজার টাকা আসে।
    কথাটা বলে আগুনে যেন ঘি ঢেলে দিলাম, মিলা আমার দিকে তীক্ষ্মচোখে চেয়ে হঠাৎ ক্ষেপে যায়, বাজে কথা না-বলে সত্যি কথাটা বললেইতো পারো? বলতে পারো না তুমি ঐ মেয়ের প্রেমে পড়ছো?
    তিয়াকে জড়িয়ে মিলা এমন একটা কথা বলবে আমি স্বপ্নেও ভাবতে পারি নি। মেয়েদের কি ঈগল-চোখ? মনের ভিতরটাও দেখে ফেলতে পারে? মিলার কাছে কি আমার অবচেতন মনের কোনো আচরণে ধরা পড়েছে তিয়ার প্রতি আমার দুর্বলতা? হঠাৎ বুকের ভেতরটা ফাঁকা মাঠের মতো শূন্য লাগে, নিজেকে অপরাধী মনে হয়। এই প্রথমবারের মতো মিলার চোখের দিকে তাকাতে সংকোচ লাগে। মিলা তো মিথ্যে বলেনি, আমি বোধ হয় তিয়ার প্রেমেই পড়ে যাচ্ছি। দেখার প্রেম। তিয়াকে আমার কেবল দেখতেই ভালো লাগে, এছাড়া অন্য কোনো ব্যাপার নেই। ও যখন বইখাতা বুকে চেপে আমার কাছে পড়তে আসে, চেয়ারে এসে বসে কী অদ্ভুত সুন্দরভাবে যে তিয়া হেঁটে আসে! ছোটোখাটো টুনটুনিটা ছন্দের তালে তালে যেন হাঁটে, আমি দেবীর দৃষ্টিতে ওকে দেখতে শুরু করি, কারণ আমার দেখা শুরু হয় পা থেকে। আমি দেখি ছোট্ট দুটি কোমল পা আমার দিকে এগিয়ে আসছে..।আমি অপেক্ষায় থাকি ও কখন পড়ার মাঝে কোনো অজুহাতে উঠে অন্য ঘরে যাবে আর আমি চেয়ে চেয়ে দেখবো ওর 

    প্রসারমান সদ্য কিশোরী-নিতম্বের-নিতম্বের উল্লাস, ওর কাঁধের ওপর নেমে আসা চুলের গোছার নাচানাচি। হ্যাঁ, আমি কেবল ওকে দেখতেই ভালোবাসি, শুধু চোখভরে দেখতে আর কিচ্ছু না। এটাকে প্রেম বলা যায় কিনা আমি জানি না। মনে পড়ে স্কুলজীবনে আমার এক ঘনিষ্ঠ বন্ধু ওর পাশের বাড়ির মেয়েটির নামের প্রেমে পড়েছিলো। বন্ধুটি সমস্ত বই-খাতা-ডিকশনারি-টেবিলে এমনকি ওদের ঘরের দেওয়ালের আনাচে-কানাচে পর্যন্ত মেয়েটির নাম লিখে লিখে ভরিয়ে ফেললো। আমি যতোই ওকে বলি, তুই মেয়েটার প্রেমে পড়েছিস। ও বলে, না, ওর নামটা আমার ভালো লাগে তাই লিখি। এর দুই বছর পর শুনলাম, বন্ধুটি ততোদিনে মেয়েটির গভীর প্রেমে তলিয়ে গেছে। আমার ক্ষেত্রেও কি সেরকম কিছু ঘটতে যাচ্ছে?
    আমি হতভম্ব গলায় বলি, তু-মিÑ, কী বলছো এসব? একটা বাচ্চা মেয়ে, মাত্র ক্লাস সিক্সে পড়ে! ওকে নিয়ে ছিঃ, এতো ছোটো মনের তুমি!
    মোটেই দমে না গিয়ে মিলা ঝাঁঝালো কন্ঠে বলে, তাহলে তুমি বিয়ে করতে চাচ্ছ না কেন? তোমার সমস্যাটা কোথায়? বলো আমাকে?
    আমি যখন ফোর্থ ইয়ারে মিলা তখন ফার্স্ট ইয়ারের ছাত্রী। একই ডিপার্টমেন্ট। মাস্টার্সে এসে কিভাবে কিভাবে যেন ওর সাথে হয়ে গেলো। চাকরি পাওয়ার পরপরই মিলা বললো, এবার আস্তে আস্তে বিয়ের প্রস্তুতি নাও, বাসা থেকে আমার বিয়ে দিয়ে ফেলতে চাচ্ছে। চাকরি পাওয়ার পর ফ্যামিলিও আমার বিয়ের ব্যাপারে আগ্রহী। আমাদের আর্থিক অবস্থা মোটামুটি। বাবা চাকরি থেকে রিটায়ার করেছেন, তার আগেই মাথা গোঁজার জন্য একটা দোতলা বাড়ি করেছেন, একমাত্র বোনটার বিয়ে হয়ে গেছে। এখন বাড়ি ফাঁকা। মা-বাবা চাচ্ছেন ঘরে বউ আসুক। মিলাকে সে কথা বলেছিও। কিন্তু তার মানে এই নয় যে খুব শিগগিরই আমাদের বিয়ে করতে হবে। এতো তাড়াহুড়ার কি আছে? তাছাড়া বিয়ে করে ফেললে ছোট্ট টুনটুনি পাখিটার কি হবে? ওকে নিশ্চয়ই আমি আর পড়াতে পারবো না? এ-কারণে বিয়ের কথাটা আসলেই মনটা কেমন আকুলি-বিকুলি করে, ছোট্ট টুনটুনির দুষ্টমিভরা মিষ্টি মুখটা চোখের সামনে ভেসে ওঠে, ওকে না-দেখে আমি থাকবো কি করে? কিন্তু মিলাকে আমি সত্যিকারের ভালোবাসি, ওর দিকে তাকাই আমি উপর দিক থেকে যে দৃষ্টিতে কাম থাকে। এই যে প্রতি শুক্রবারে মিলা শাড়ি পরে আসে, আমি ফাঁকে-ফোঁকড়ে সুযোগ বুঝে চোরা-চাহনি দিয়ে ওর উন্মুক্ত পেটের গোল চাঁদটি দেখার চেষ্টা করি, আর ভাবি বিয়ের পর সেই গোলকের সুরা আমি অঢেল পান করবো। আমি মিলাকে পেতে চাই তবে ওই টুনটুনি পাখিটাকেও যে দেখতে চাই! টুনটুনিকে কেবল দেখতেই চাই, পেতে না।
    তুমি এসব কি উলটা-পালটা কথা বলতেছো? বিয়ে করতে চাইবো না ক্যান? আমি অধৈর্য হয়ে মিলার মুখের দিকে তাকাই।
    মিলার গাল লাল হয়ে গেছে, মুখ যেন তিরতিরিয়ে কাঁপছে। মিলা রাগ সামলাতে চেষ্টা করে বলে, কেন চাচ্ছো না সেটাই তো জানতে চাচ্ছি?
    আমি বোঝাতে চেষ্টা করি, দ্যাখো, বিয়ে তো কোনো ঘটনা না, করলেই করে ফেলা যায়। কিন্তু তোমার অনার্সটা কমপ্লিট করে নিলে ভালো হয় না? বিয়ের পর পড়াশুনায় ঢিলামি এসে যায়। ..আমি চাচ্ছিলাম তোমার অনার্সটা শেষ হোক আর এই ফাঁকে হাতে কিছু টাকা-পয়সা জমাইÑ
    আমার বাসায় আর অপেক্ষা করতে চাচ্ছে না। আমি বলে বলে এতো দিন রাখছি। তুমি একটু বুঝতে চেষ্টা করো। মিলার গলা এতক্ষণে প্রায় স্বাভাবিক শোনায়। একটু থেমে বলে, আজকে সকালে ফুফু এসে বলতেছে, একটা ডাক্তার ছেলে পাইছে, ওদের নাকি সামনের শুক্রবারে দেখাতে নিয়ে আসবে।
    শুনে বুকটা ধরাস করে ওঠে। বলে কি? কোথাকার কোন ডাক্তার-মাক্তার এসে আমার মিলাকে গরু দেখার মতো করে দেখে যাবে? বুঝেছি, এই জন্যই মিলার মেজাজ আজকে এতো চড়া। তাই তো বলি আসতে না-আসতেই আজকে আমার সাথে এমন ব্যবহার কেন? তিয়াকে নিয়ে ও-কথাটা মিলা তাহলে আমাকে রাগানোর জন্য বলেছে, যাতে কথটাকে মিথ্যা প্রমাণ করার জন্য আমি তড়িঘড়ি বিয়েতে রাজি হয়ে যাই। আসলে ও কিছু বুঝতে পারে নি। যাক, বাঁচলাম। মিলা এম্নিতে শান্ত মেয়ে, তবে সেন্টিমেন্টাল হওয়ায় রেগেও যায় দ্রুত। বাট শি ইজ রিয়েলি আ গুড গার্ল। মাস্টার্সে পড়ার সময় বেশিরভাগ দিনই আমার ক্লাস শুরু হতো সকাল আটটায়। সেসব দিনে মিলা আমার জন্য নাস্তা নিয়ে আসতো। কারণ ক্লাস ধরতে ঘুম থেকে উঠেই নাস্তা না খেয়ে আমি ইউনিভার্সিটি দৌড়াতাম। ক্লাস শেষে ডাকসু বা আইবিএ ক্যান্টিনে বসে মিলার আনা নাস্তা খেতাম। কলা, সিদ্ধ-ডিম, সাদারুটি। অনেকেই তখন আমাদের দিকে কৌতূহলী-চোখে তাকাতো। আমার লজ্জা লাগতো, মিলাকে বলতাম, ধুর, তুমি আর নাস্তা এনো নাতো, মানুষ তাকিয়ে থাকে। মিলা সেদিকে মোটেও ভ্রুক্ষেপ করতো না, বলতো, ওরা তাকায় কারণ ওরা মনে মনে আফসোস করে ওদের প্রেমিকারা কেউ কষ্ট করে ওদের জন্য নাস্তা নিয়ে আসে না। নাস্তা ছাড়াও মাঝে মাঝে মিলা বাসা থেকে নুডুলস্, পিঠা, পুডিং, এটা-সেটাও নিয়ে আসতো। সত্যিই মিলা চমৎকার একটি মেয়ে। এমন একটি মেয়েকে ভালোবাসতে পেরে এবং ভালোবাসা পেয়ে সত্যিই আমি গর্বিত।
    কি, চুপ করে আছো যে?
    একেবারে শান্ত স্বাভাবিক গলা মিলার, যে গলায় সবসময় আমার সাথে কথা বলে।
    আমি চোখ তুলে দেখি মিলা আমার দিকে জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে চেয়ে। একটু আগ পর্যন্ত যে মেয়েটা আমার সাথে কড়া কড়া কথা বলছিলো সে যেন অন্য কেউ। আমিও ওর চোখে খানিক তাকিয়ে ঠোঁটের কোণে মৃদু হাসি আনার চেষ্টা করি, শ্বাস ফেলে বলি, হু, ভাবছি।
    মিলা এবং মা দুদিক থেকেই এখন বিয়েটা করা জরুরী হয়ে পড়েছে। কাল রাতে খাবার সময় মা আমাকে উদ্দেশ্য করে সগতোক্তির মতো বলছিলো, কবে পোলায় বিয়া করবো আর কবে নাতি-নাতকুরের মুখ দেখমু, এর আগেই না-জানি কবরে যাইতে হয়!
    দাঁড়াও দাঁড়াও, কয়টা দিন ওয়েট করো মা, বিয়া তো করবোই, তারপর দেখবা নাতি-নাতকুরে ঘর ভরে গেছে। মশকরাটা করতে গিয়েও চুপ করে গিয়েছিলাম। শুধু মনে মনে হাসছিলাম। কিন্তু বিয়ের কথাটা ভাবলেই যে টুনটুনির মুখটা মনে পড়ে যায়। বুকটার মধ্যে হু হু করে ওঠে। না না, টুনটুনির প্রতি আমার অন্য কোনো আকর্ষণ নেই, শুধু দেখার আকর্ষণ। এখানে হয়তো ফ্রয়েডকে হাজির করে বলা যেতে পারে, তিয়ার প্রতি আমার আকর্ষণ চেতন মন থেকে অবদমিত হয়ে নির্জ্ঞান মনে অবস্থান করছে। স্কুলে পড়াকালীন একটি মেয়েকে আমার ভালো লাগতো। ছাদে উঠে প্রায়ই আমি ওকে দেখতাম। একদিন রাতে স্বপ্ন দেখলাম বিছানায় আধশোয়া হয়ে আমরা পরস্পরকে আদর করছি। এবং অবাক কাণ্ড সেই বিছানারই কিনারে পা ঝুলিয়ে বসে আছে মেয়েটার বাবা-মা, তারা আমাদের দিকে পিছন ফিরে ভাবলেশহীন ভঙ্গিতে টিভি দেখছে। নির্লজ্জের মতো তাদের সামনেই আমরা যে এমন একটা কাজ করছি এতে তাদের কোনো ভ্রুক্ষেপই নাই যেন খুব স্বাভাবিক একটা ঘটনা এবং তাজ্জব ব্যাপার, আমার কাছেও বিষয়টাকে মোটেই অস্বাভাবিক মনে হচ্ছে না। আজো এ স্বপ্নের কথাটা মনে হলে আমি মনে মনে হেসে উঠি। ফ্রয়েড মিয়া অবশ্য বলেছেন, আমাদের নির্জ্ঞান মনে অবস্থান করা অবদমিত আবেগ বা ইচ্ছাগুলো ঘুমের মধ্যে প্রকাশিত হওয়ার চেষ্টা চালায় আর সেগুলোকেই আমরা স্বপ্ন বলি। আরে ধুর, এইসব ফ্রয়েড-ম্রয়েডের তত্ত্ব ভাবলে মাথাটা উলটা-পালটা লাগে। নির্জ্ঞান মনে কি আছে ওইসব জানার দরকার কী? আমার স্বপ্নের মধ্যে মিলার সঙ্গে তিয়া যদি জোর করে ঢুকেই পড়ে তো আমি কী করবো? ওইসব জানাজানির মধ্যে আমি নাই। আমি জানি টুনটুনিটারে আমি প্রাণভরে দেখতে চাই আর মিলারে শরীর-মনে পেতে চাই, ব্যস। কিন্তু একজনকে পেয়ে আরেকজনকে তো হারাতে চাই না! ব্যাপারটা নিয়ে আমি ভাবতে থাকি, প্রতিবারের মতো ভাবনায় কেবল তলিয়ে যাই, ভাবনার আর তল খুঁজে পাই না।
    কি হলো? তোমার জবান বন্ধ হয়ে গেলো নাকি? মিলা রসিকতা করে। আমার হাত টান দিয়ে বলে, চলো তো হাঁটি। বসে বসে পায়ে ঝিঁঝি ধরে গেলো।
    আমি চাপা শ্বাস ফেলে উঠে দাঁড়াই, চলো।

    অক্টোবর’০৬

  • একটি জোড়া লাগানো দশ টাকার নোট

    নোটটি পেয়েছিলাম বেইলি রোডে। শাহবাগ থেকে তাড়াহুড়ো করে মহিলা সমিতিতে এসেছি ‘রক্তকরবী’ দেখব বলে। সেই তাড়াহুড়োতেই রিকশাঅলা আঠা দিয়ে জোড়া লাগানো দশ টাকার নোটটি গছিয়ে দেয়। এসে তো ফাঁপরে পড়লাম। টিকেট নেই। কাউন্টারে অসহায় মুখে অনেকে দাঁড়িয়ে। অপর দৃশ্যে, অডিটরিয়ামে ঢোকার লাইন রাস্তা পর্যন্ত। ভীড়ের ঢেউ ধীরে ধীরে ভিতরে ঢুকছে। আমরা না-পাওয়ার দল অপেক্ষারত, টিকেট কি আদৌ পাব ? অনেকক্ষণ পর টিকেট ছাড়া হল। আর ছাড়ার সাথে সাথে না-পাওয়া দলের সবাই ধাক্কাধাক্কি শুরু করল : ব্রাদার আমাকে দুইটা, এই যে একটু তাকান না, আমাকে তিনটা, আমার...। ভেতরে ঢোকার যন্ত্রণাও কম নয় পুরুষদের গায়ে হাত দিয়ে চেক করা হচ্ছে আর মহিলাদের হাত-ব্যাগ খুলে। বোমাতংক !

    দুই.

    শীতের সকাল বড়ো মড়মড়ে, শুকনো পাতার মতো। নড়েচড়ে মড়মড় করে উঠতে উঠতে প্রায়ই নটার ক্লাস করতে পারি না। কিন্তু আজ ক্লাসটা ধরতেই হবে। ঝপাঝপ দুই বালতি পানিতে গোসল সারলাম। মনে হল এন্টার্কটিকা থেকে এইমাত্র উঠে এসেছি। প্লেটে ভাত দেখে উৎসাহ দমে গেল। উহ! সকালবেলা ভাত খাওয়া যায় ? কণ্ঠে কিছুটা বিরক্তি প্রকাশ করতেই মায়ের ঝাঁঝালো উত্তর শোনা যায়, তোর বাপ চৌদ্দটা দাসি-বান্দি রাখছে যে রুটি বানাইব ? ভয়াবহ সত্য কথা। অতএব সোনালি ধানের শুভ্র ভাত কোনোরকমে গলাধঃকরণ করে তাড়াতাড়ি বাসস্ট্যান্ডে রিকশায় এলাম। ভাড়া দিতে গিয়ে সেই পুরনো সমস্যা, গতকাল থেকে যা বউয়ের মতো আমাকে আঁকড়ে আছে।
    টাকাটা পালটাইয়া দ্যান।
    কী হয়েছে এটা ? বলে যেন নতুন দেখছি ভাবে নোটটি প্রতিবারে মতো চোখের সামনে উল্টেপাল্টে পকেটে পুরলাম। মহা যন্ত্রণা ! কাউকে দুই টাকা বাট্টা দিয়ে নোটটি চেঞ্জ করা যায় না ?

    তিন.

    ক্লাস শেষে বরাবরের মতো রিংকি আজ আর আমাদের খাওয়া স্পন্সর করল না। ওর নাকি এখন খুব তাড়া। শেরাটনে সামনের সপ্তাহে জাঁকজমক করে ওর বাবা-মা’র বিয়ের ২৫ বছর পূর্তির অনুষ্ঠান হবে। মন্ত্রী-আমলা-বিদেশী কূটনীতিকরা হবে চিফ গেস্ট। আমাদের বন্ধুদের সবাইকে দাওয়াত করবে কিনা কে জানে, দিলে তো এই সুযোগে পোড়াকপালে ফ্রি শেরাটন হোটেলে ঢোকার আর খাওয়ার অভিজ্ঞতাটা জুটে যায়। প্রসারিত গলার স্লিভলেস শর্ট কামিজ পরা রিংকি সিঁড়িতে হাই-হিলের শব্দ তুলে নিচে নামে, আঙুলের ইশারা দিতেই প্রভুভক্ত কুত্তার মতো রিংকির ড্রাইভার গাড়ি নিয়ে হাজির হয়। তারপর ক্যাট করে দরজা খোলার শব্দ, ভিতরে ঢুকে চড়াম করে চড় মারার মতো দরজা লাগানো, এরপর পে-পু হর্ন দিয়ে ধোঁয়া উড়িয়ে গাড়ি ছাড়া। রিংকিদের গাড়ি মোট তিনটা। দুইটা পাজেরো একটা সলিল। একেকদিন একেকটা নিয়ে আসে। দেখে পিত্তি জ্বলে যায়। দেশে এত হরতাল-অবরোধ-এক্সিডেন্ট হয় ওদের দু-একটা গাড়ির ওপর হামলা করলেই তো পারে। তবে মনে হয় না লাভ হবে। কয়েকদিন বাদে হয়ত নতুন মডেলের আরেকটা কিনে নিয়ে আসবে। চকচকে নতুন গাড়ি যা চোখের সামনে পড়লেই মনটা উদাস হয়। ইচ্ছে হয় জোরে বাম্পারে দুইটা লাথথি লাগাই।

    চার.

    দুপুরের পরের সময়টা বড়ো বাজে। কাজ-কাম নাই শুধু বেলা পুড়িয়ে সময়ের ধোঁয়া ওড়াও। সিগারেটের ধোঁয়া উড়িয়ে তাই নিুমধ্যবিত্ত জীবনের ফেলে আসা ধারাপাত নিয়ে বসি। ক্লাস সেভেনে পড়ার সময় একদিন এক ছেলে দেড় গজ দূরের বেঞ্চ থেকে আমার বেঞ্চে হনুমানের লঙ্কা পার হওয়া লাফ দিয়ে গর্বে এক পা উঁচিয়ে বলেছিল, নতুন কিনছি, বহুত দামি জুতা ; একটা লাথথি দেই ? দামি জুতার লাথথিও দামি, দেই ? আমি নিষ্পাপ বাছুরের চোখ নিয়ে ফ্যালফ্যাল তাকিয়ে ছিলাম ছেলেটির দিকে। ঈদের সময় আব্বাকে ঐ জুতা কিনে দেয়ার আবদার করলে দাম শুনেই চোখ কপালে তুললেন, য়্যাতো দামি জুতা, য়্যাতো টাকা কই পামু ! তোর মায়রে দুই ঈদে একটা শাড়ি দিতে পারি নাই, তোগো পরীক্ষা আইসা পড়ছে আধসের দুধ রোজ করন দরকার, হেইডাও পারতাছি না। দামি জুতা পরলেই কি দামি মানুষ হয় ! পড়াশুনা ভালো মতো কর, চাকরি-বাকরি কইরা নিজেরাই একসময় কত দামি জুতা কিনতে পারবি।
    এরপর জীবন অনেক বর্ষা-শীত-বসন্ত খেলো। জীবনের দোলনাও দুলতে থাকে ধীরে ধীরে, টুপ টুপ পড়া বৃষ্টির ফোঁটায় দোল খাওয়া গাছের পাতার মতো। প্রথম অভিসারে বিন্দুকে নিয়ে বলধা গার্ডেন যাচ্ছিলাম। পথে ঠাঁটারি বাজারের নাড়ি-ভুড়ির গন্ধ ওকে অসুস্থ করে তুলল। রাগে ও আমায় রিকশা থেকে ধাক্কা মেরে ফেলে দিতে চেয়েছিল, কোন আবর্জনায় নিয়ে চলেছ আমাকে ? এই তোমার রুচি ? পরদিন হলের ফোনবক্সে একটা আধুলি ফেলে জেনেছিলাম, পুরান ঢাকার রাস্তায় রিকশা চড়ে বিন্দুর কোমরে ব্যথা ধরে গেছে। আসলে আমারই ভুল ছিল, ওর টয়োটা করোলার নরম গদিতে চড়া পাছা, নারিকেলের কর্কশ ছোবরার রিকশার সিটে বসে ঝাঁকুনি সহ্য করতে পারবে কেন? বিন্দুর গাড়িতে যেদিন আমায় প্রথম লিফট দিল সেদিন আমার মরে যেতে ইচ্ছে হয়েছিল। পরস্পর বিদায়ের উষ্ণ হাসি বিনিময় করে নামতে উদ্যত হতেই বুঝতে পারলাম, আমার অনভ্যস্ত হাত দরজা খুলতে পারছে না। তখন ঢাকার রাস্তায় ট্যাক্সি নামেনি, এর আগে বেশ কয়েকবার কার-মাইক্রো চড়েছি, কিন্তু আজ এমন কেন হল ? হয়ত অনেকদিন না-চড়াতে হঠাৎ ভুলে গিয়েছিলাম। বিন্দু আমার দিকে ঝুঁকে একটা করুণার দৃষ্টি ছুড়ে দরজা খুলে দিল। গাড়ি থেকে মাথা নিচু করে নামলাম। নিজেকে মনে হল ডাস্টবিনে প্রচণ্ড আক্রোশে নিক্ষেপিত কোনো আবর্জনা ; মুহূর্তে রাস্তার কিনার থেকে সোজা মাঝখানে এসে দাঁড়ালাম। দুই সেকেন্ডের মধ্যেই একটা জিপ এসে ঠিক আমার সামনে ক্যাচ করে ব্রেক কষলো। আমি তখন আকাশে কাশফুল দেখছিলাম। হয়ত পাগল-টাগল ভেবেছিল, জিপটি পাশ কাটিয়ে চলে যায়।
    একটা চকলেট খান। আমি স্বপ্নালু চোখে সামনে তাকাই। চার-পাঁচ বছরের একটি ছেলে। ডানহাতে একটি চকলেট বাড়িয়ে বাঁ-হাতের বুড়ো আঙুল মুখে চুষছে। ধূলোভরা শরীর, লালচে চুল, নাক বেয়ে সিকনি পড়ছে, খালি পা আর হাফপ্যান্টের জিপার নিশ্চয়ই নষ্ট। নুনু দেখা যাচ্ছে। আমি ছেলেটাকে না করতে পারি না, পাঁচ টাকার কয়েন দিয়ে চকলেটটি নেই।
    দুই-টাকা দাম, দুই-টাকা। ভেঙে ভেঙে আস্তে আস্তে বলে শিশুটি।
    আরে ওটা তো পাঁচ টাকা দিছি, এক টাকা না, তোর টাকা ফেরত লাগব না, সব নিয়ে যা।
    না দুই-টাকা দ্যান, দুই-টাকা।
    কী মুসবিতে পড়লাম, এ ছেলে তো টাকাই চেনে না, চকলেট বিক্রি করে কীভাবে। একটু দূর থেকে একটি মেয়ে বোধহয় বড়বোন হবে ডাক দিলে ছেলেটি দৌড় দেয়। ছেলেটির হিসাবমতো আমি যদি ওকে এক টাকা কম দিয়েই থাকি ওর দৌড় দেখে মনে হল ওটা ওর কাছে কোনো বিষয়ই না। বুক থেকে একটা ভারি নিশ্বাস বেরিয়ে আসে। বড্ড ঘুম পাচ্ছে। ঘুমানোর অবশ্য সুযোগ নেই, সন্ধ্যায় টিউশনি সেরে একবারে বাসায়। কী করা যায় এখন ? বিন্দুর বাসায় গেলে কেমন হয় ? সম্পর্ক সমাপ্তির পর বহুদিন যাইনি। যাব ? কিন্তু গেলে যদি অপমান করে !

    পাঁচ.

    কলিংবেল চাপতেই বিন্দুর বাবা দরজা খুললেন। লম্বা-চওড়া একজন মানুষ, ‘কাকে চাই’ শুনে চোখ দুটো তার অসন্ধিৎসু হয়ে উঠে। এক সেকেন্ড অপলক তাকিয়ে তারপর মুখ পেছনে ঘোরান, বিন্দু তোমার গেস্ট।
    ভালো আছ ? বিন্দুর হাসিমুখ, এসো। বিন্দুর সাথে ড্রয়িংরুমে ঢুকলাম। এই ঘরটা চেনা বাগানের মতো। আমি যে দিকটায় বসি ঠিক উল্টোদিকে বিন্দুর দাদার যৌবনকালের একখানা বাঁধানো ফোটো। বামদিকে দেয়ালের অর্ধেক জুড়ে টাঙানো হয়েছে কাবাশরীফের ছবি। ডানদিকের দেয়ালে দেয়ালঘড়ি। টি-টেবিলে নীল রঙের অ্যাশট্রে, টিভির রিমোট তুলে দেখলাম প্লাস্টিক কাভারে এখনো সেই ছেঁড়াটা আছে। তবে আগে এ বাসায় আসলে বুক দুরু দুরু যে ভাবটা ছিল এখন আর তেমন বোধ হচ্ছে না।
    তারপর বল। বিন্দু পায়ের উপর পা তুলে বসল।
    এই তো চলছে। আমার সংক্ষিপ্ত জবাব।
    তুমি নাকি আমার নামে বদনাম ছড়াচ্ছ ?
    বদনাম ! বিস্ময়ের ভাব করে কথার মারপ্যাচে কোনোরকমে আমি প্রশ্নটা এড়িয়ে যাই।
    মিষ্টি বিস্কিট আর কোক দিয়ে আপ্যায়ন হল। বিদায় নেবার বেলায় আজ কেমন অন্য হাওয়া বইল। সবসময় ‘যেতে চায় না মন’ একটা ভাব থাকে। কিন্তু আজ সাপের মতো ছোবল দিয়ে ফিরে যেতে ইচ্ছে হচ্ছে।
    ইচ্ছে হলে আসতে পার। বিন্দুর বিদায় প্রস্তাব।
    ভালোবাসার উত্তাল দিনগুলিতে আগে প্রতিবার যাওয়ার সময় বলত, এসো মাঝে মাঝে বাসায় কিছু মনে করবে না, তবে সপ্তাহে একবারের বেশি না। পরিচিত ঘরটার দিকে আরেকবার তাকিয়ে সিঁড়িতে পা দিলাম, জানিনা আর কখনো আসব কিনা।
    মোড়ের দোকানে এসে সিগারেট কিনলাম। বুকপকেটে হাত দিতে দশ টাকার নোটটি বেরুলো। দোকানদারও এক পলক দেখে ড্রয়ারে ঢুকায়। যাক হাফ ছেড়ে বাঁচলাম। সিগারেট ধরাতে গিয়ে হাত কাঁপছিল। একি জোড়া লাগানো নোটটি দেয়ার অপরাধবোধের জন্য, নাকি বিন্দুর সাথে সাক্ষাৎ-উত্তেজনায় ? ‘আরে ভাই সিগারেট তো উল্টা ধরাইছেন !’ কী ! আমি আঙুলের দিকে তাকাই, সত্যিই তো। ইলিয়াসের গল্পের আব্বাস পাগলার কথা মনে পড়ল। উল্টোভাবে ঠোঁটে বসিয়ে ব্যান্ডেজঅলা সিগারেট খায় না বলে সে সিগারেট ছুড়ে ফেলে দেয়। মুখ ভরতি ধোঁয়া ছেড়ে ভালো লাগছে হাঁটতে। হালকা লাগছে। বুকপকেট থেকে জোড়া লাগানো টাকাটাও গেছে ! রিকশা নিয়ে টিউশনিতে এলাম। আমোদের সাথে মানিব্যাগ থেকে শেষ দশ টাকার নোটটি বের করি। কিন্তু রিকশাঅলাকে দিতেই চরম বিরক্ত হল, টাকাটা পাল্টাইয়া দ্যান।


    অগাস্ট ২০০৩

  • লাল ফ্রক

    ঘুমের ওষুধ আজকাল আর খাই না। শুধু শুধু। ওতে আমার কিছু হয় না। ঘুম বলতে কোন কোন রাতে চোখটা হয়ত একটু লেগে আসে, পরক্ষণেই নাইটগার্ডের তীব্র হুইসেলে চোখ খুলে যায়—এইটুকুই।

    আজ অনেকক্ষণ হল নাইটগার্ডের সারাশব্দ নেই। বিহারী বুড়ো লোকটার অসুখবিসুখ করল কিনা কে জানে। আমার রাতের একমাত্র সঙ্গী বলে কথা। নোনা জলে ভেজা বালিশে মুখ ঘুরিয়ে শুই। আজ সারাটা দিনই অস্থিরতায় কেটেছে। ডান চক্ষু লাফিয়েছে। অহেতুকই ঘরের আলমারিটা লাগিয়েছি আর খুলেছি। কী যেন একটা মনে হয়েছে নেই, সেটা খোঁজা দরকার। কিন্তু সেটা যে কী, তাই জানি না। অনেক সময় হয় না এরকম? হয়তো খুব তুচ্ছ জিনিসই সেটা।

    ঘুম মানুষের না আসে কিভাবে, এটা একসময় আমার মাথাতেই ঢুকত না। বালিশে মাথা দিলেই ঘুম। অথচ এই বালিশে মাথা দিয়ে, ভালবাসার মানুষটার পাশে শুয়ে, প্রথম আমার না-ঘুমের শিক্ষা। ইনসমনিয়া! বিয়ের তৃতীয়দিন থেকেই। আর আমার পাশের বালিশেই, আমার প্রিয়তম মানুষটি, যার সঙ্গে পুরো জীবন কাটাব বলে পণ করেছিলাম, তখন নাক ডেকে অঘোরে ঘুমাচ্ছে। মিলনের পরিশ্রমও তো কম নয়!

    সেজভাইর কথাটা এখনও কানে বাজে। ইমরানদের সম্পর্কে খোঁজখবর নিয়ে এসে বলেছিল, ওদের ফ্যামিলিটা আমার কাছে ভাল লাগেনি। মা-টা জানি কেমন। জানিস তো মা ভাল তো সব ভাল। আমি ওখানে তোর বিয়ে সাপোর্ট করি না, তারপরও যদি করিস, সেটা তোর রেসপনসিবিলিটি।

    পরিবারের সবাইও একরকম আপত্তি জানাল। কিন্তু আমি একবার যে সিদ্ধান্ত নেই সেটা করেই ছাড়ি। দেড়বছরের প্রেম। অতএব বিয়েটা করলাম। এবং বিয়ের তৃতীয়দিনই টের পেলাম—ভালবাসার মানুষটির ভালবাসার রূপ।

    কলেজে অনার্স ফার্স্ট ইয়ারের পরীক্ষা ছিল। প্রায় সারারাত লাইট জ্বালিয়ে পড়েছি। ইমরান তাই ভালমত ঘুমাতে পারেনি। দুপুরে পরীক্ষা। সকালে উঠেও অনেকক্ষণ পড়লাম। বিয়ের পর আমরা মহাখালিতে একটা সাবলেটে উঠি, ওর এক কাজিনের সাথে শেয়ার করে। মহাখালি থেকে গার্হস্থ্য কলেজে কীভাবে কোন বাসে যেতে হয়, জানি না।
    আমাকে আজকে একটু কলেজে দিয়ে আসবে? রাস্তা চিনি না তো।
    উত্তরে ওর চোখে তখন রাগ, কণ্ঠে বিরক্তি। বলল, বালের পরীক্ষা দিতে যাবা, যাও, আমি যাব কেন? আমি হা হয়ে যাই। আমার চোখের মণি দ্রুত নড়তে থাকে। কানকে বিশ্বাস করাতে পারি না। এমন কিছু শুনেই কি সতী সীতা বলেছিল, ধরণী দ্বিধা হও? আমি জানি না।

    ওর কাজিনের বউ, মানে লিনাভাবি এসে ওকে ধমক দিলেন, কী ইমরান, এ কেমন কথা, বউয়ের দায়িত্ব নিতে পারবে না তো বিয়ে করেছ কেন? মেয়েটা মহাখালি থেকেছে কখনো? সাথে যেতে না পার, একটু বাসে উঠিয়ে দিয়ে আস।

    ইমরান গজগজ করতে করতে শার্ট গায়ে চড়ায়। সিঁড়িতে নেমে কিছু বুঝে ওঠার আগেই আচমকা আমাকে একটি চড় বসিয়ে দেয়। মুহূর্তে আমার পৃথিবীটা ঝাঁকুনি দিয়ে ওঠে। গালে হাত দিয়ে আমি হতবাক-চোখে ওর দিকে তাকিয়ে ছিলাম। কে অই মানুষটা? তাকে কি আমি চিনি? আমার রাগি বাবাও আমার গায়ে কখনো হাত তুলেছে বলে মনে পড়ল না। অথচ আমার প্রিয়তম মানুষটি...। ইমরান নেমে যাচ্ছে আর আমি দাঁড়িয়ে আছি দেখে আবার গজরায়, দাঁড়িয়ে আছিস কেন, পরীক্ষা দিতে যাবি না? আয়।

    এক-দুইটা দিনের ফারাকে মানুষ এত বদলে যেতে পারে! মানুষ চেনা তবে এতটাই দায়? পরীক্ষায় কি লিখেছিলাম মনে নেই। তবে পরীক্ষা শেষে বাসায় ফিরতে ফিরতে সিদ্ধান্ত নিলাম, চলে যাব। লিনা ভাবি তখন বোঝালেন, দেখো, ছেলেরা একটু অমনই হয়। সংসার করতে গেলে মেয়েদের অনেক কিছু মানিয়ে চলতে হয়। ওর এরকম আচরণ তো তুমি আর কখনো দেখোনি, তাই না? সারা রাত না ঘুমিয়ে ইমরানের মেজাজ হয়তো ঠিক ছিল না, বুঝতে পারেনি।

    ভাবির কথা মেনে নিলাম। ছেলেরা একটু অমন হয়-ই। তাছাড়া বিয়ের দুদিন যেতে না যেতে কোন মুখে আমি বাড়ি ফিরে যাব? আবার ছোটপা, মানে হাসি আপাও একটা বড় ফ্যাক্টর। পরপর দু-দুটা বোনের যদি একই অবস্থা হয়, লোকে বলবে কী? আমরা কুফা, স্বামীর ঘর করতে পারি না!

    অথচ ছোটপার অ্যারেঞ্জড বিয়ে ছিল। ছেলে এবং ছেলের পরিবার দুই বেশ ভাল। ছেলে তার বড়ভাইর সঙ্গে থাকত। দেবর-ভাবির একবারে গলায় গলায় পিরিত। হবে না? তার শ্বাশুড়ি ছোট ছেলেকে দশ বছরের রেখে মারা যায়। মায়ের আদরটা তো তেমন পায়নি। ভাবি-ই সব। সন্দেহ হলেও প্রথম প্রথম খারাপ লাগলেও ছোটপা বিষয়টাকে তেমন আমল দিত না। কিন্তু একদিন সন্দেহটা সত্যি হয়ে যায়।

    বিয়ের কয়েক মাস পরের ঘটনা সেটা। ছোটপার গোসলে বেশ সময় লাগে। টয়লেট ও গোসল দুই সে একসাথে সারে। সেদিন টয়লেট সেরে নতুন কেনা শ্যাম্পুটা নিতে মাঝখানে বেরিয়েছে। আবার বাথরুমে ঢোকার আগে ড্রইংরুমে একবার উঁকি দেয়। স্বামীধনটি সেখানে পত্রিকা পড়ছিল। নেই। ভাবির ঘরের দরজা বন্ধ। কোথায় তাহলে? বুকে ধিড়িম ধিড়িম দুরমুশ পড়তে শুরু করে ওর। ছোটপা ছুটে গিয়ে ভাবির বন্ধ দরজায় কান পাতে। ভেতরে কথার ফিসফিসানি। পাগলের মতো সে মেঝেতে শুয়ে পড়ে দরজার ফাঁকে কান রাখে। শীৎকারের শব্দ!

    ছোটপা সেদিনই বাড়িতে চলে আসে। এবং পরিবারের সিদ্ধান্ত মোতাবেক একসময় ডিভোর্স দেয়।

    এই যদি করবি তাহলে কেন বিয়ে করেছিস? কেন আরেকজনের জীবনটাকে নষ্ট করলি? ছোটপা সে বদমাশটাকে এ প্রশ্ন করেছিল।

    সেই জন্যেই তো বিয়েটা করা, যাতে কেউ সন্দেহ করতে না পারে। সাথে লোকটা এও জানিয়ে দিয়েছিল, বউকে সে ছাড়তে পারবে কিন্তু ভাবি ছাড়া তার চলবে না।

    এসব কিছু বিবেচনা করে সেদিন ইচ্ছে সত্ত্বেও আমি চলে আসতে পারিনি। তাও বেশিদিন সম্ভব হল কই? দেড়বছর। অনেক চেষ্টা করেছিলাম। কিন্তু না, ও ঠিক হবার নয়। গায়ে হাত তোলা ওর খাসলত। এতে ইমরানের ফ্যামিলির প্রভাবও আছে। সেজভাই ঠিকই বলেছিল। ইমরানদের পরিবারটা কেমন যেন। বিয়ের কিছুদিন পর আমি বুঝতে পারলাম শ্বশুর-শাশুড়ির মধ্যে সম্পর্ক ভাল না। ইমরান যখন ছোট তখন থেকেই তারা নাকি আলাদা ঘরে ঘুমান।

    ঈদের সময় খুলনায় ওদের বাড়িতে যেতাম। ওর মায়ের একটা অদ্ভুত আচরণে খুবই অবাক হয়েছিলাম। রাত্রে আমরা দরজা বন্ধ করে ঘুমাতে পারব না। ওনার আদেশ। এটাকেই ইডিপাস কমপ্লেক্স বলে কিনা জানি না।

    ইমরানও ছিল, একেবারে ফ্যামিলি প্রাণ। মা-বোনরা যা বলত তাই বিশ্বাস করত। বিয়েটা ইমরানের দিক থেকেও যেহেতু ছিল নিজের পছন্দের এজন্য ওর পরিবার আমাকে সহজভাবে নিতে পারেনি। তাদের ধারণা, তাদের ছেলে আরো বড় ঘরে, আরো ভাল মেয়ে পেত, আমি ডাইনি মাগিই ওর মাথাটা খেয়েছি। আমার বিরুদ্ধে সবসময় ওকে বিষিয়ে তুলতে তাই তারা চেষ্টায় খুঁত রাখেনি।

    আজ এখন আমি আর কোন পুরুষকেই বিশ্বাস করি না। করতে পারি না। সব পুরুষই এক। বিয়ের পর ধীরে ধীরে টের পেয়েছিলাম, ইমরান কার সঙ্গে যেন গোপনে কথা বলে। হয়ত আমার অগোচরে দেখাও করত। সংখ্যাটা একাধিক হওয়া আশ্চর্য নয়। প্রমাণ ছাড়া আমার কোন কিছুতে বিশ্বাস নেই। রাতে ইমরান যখন ঘরে তখন বাথরুমে গিয়ে আমার মোবাইলের সিম চেঞ্জ করে ওর সঙ্গে কথা বলা শুরু করি। অদ্ভুত ব্যাপার হল, আমার গলা তো ও ধরতেই পারেনি বরং কয়েকদিনের মধ্যেই আমাকে প্রেম নিবেদন করে বাইরে দেখা করার জন্য ভজাতে থাকে।

    ওর ল্যাপটপ ছিল। অনেক রাত অব্দি তাতে কাজ করত। ও বাথরুমে গেলে আমি ওটায় গুতোগুতি করতে গিয়ে দেখতাম, মেয়েদের সাথে চ্যাট করছে। আর কথার কী ছিরি। সেক্স নিয়ে তো আছেই। এসব দেখে আমার বুকটায় আগুন ধরে যেত। আচ্ছা, পুরুষ মানেই কি বহুগামী? অথচ সেপারেশনের এতদিন পরেও আমি তো পারলাম না মনের মধ্যে অন্য কাউকে স্থান দিতে।

    মাঝে মাঝে মনে হয়, ইস, ইমরানকে নিয়ে যদি দূরে কোথাও, দেশের বাইরে চলে যেতে পারতাম! যেখানে ওর পরিবার-আত্মীয়-লোকজন—অন্যান্য সবকিছুর হাত থেকে বাঁচা যাবে। ওর যে সবই খারাপ তা তো না, কিছু ভাল গুণও আছে। আমার মাইগ্রেনের সমস্যা আছে। মাথা ব্যথায় দুনিয়াটা যন্ত্রণাকর হয়ে উঠলে, ও আমার মাথা টিপে দিত। অসুস্থ হলে সেবা করত। তখন সকালে নাস্তা না বানাতে পারলে কিছু বলত না। দুজনে বাইরে কোথাও বের হলে রাস্তায় লোকজন যদি আমার দিকে অশ্লীলভাবে তাকাত, ও খেকিয়ে উঠত, পারে তো মারামারি লাগিয়ে দিত। আমাদের কত সুখের স্মৃতি আছে। ছুটির দিনে সন্ধ্যায় দুজনে খেতে বের হতাম। আমাদের পছন্দ ছিল কেএফসির চিকেন ফ্রাই আর কফি।

    তবে লিনাভাবির মেয়ে বুন্নিটাকে খুব মিস করি। ইমরানকে ছেড়ে আসার চেয়েও বেশি কষ্ট হয়েছে ওর জন্য। বাচ্চাদের সাথে আমি খুব বাচ্চামি করতে পারি কিনা, ওই বাসায় যাওয়ার কয়েকদিনের ভেতরই আমি তাই ওর জানি বন্ধু হয়ে যাই। সারাক্ষণ ওর সঙ্গে খেলা, দুষ্টুমি, এটা-সেটা নিয়েই থাকতাম। অবস্থাটা এমন দাঁড়িয়েছিল যে রাত্রেও বুন্নি আমার কাছে ঘুমানোর জন্য চলে আসত। অনেক বুঝিয়েসুঝিয়ে মায়ের কাছে পাঠিয়ে, কোনদিন গল্প বলে ঘুম পাড়িয়ে তবে ছাড়া পেতাম। আহারে সোনাটা, না জানি তোর পরানটা এখন কেমন করে!

    সি রি রি...।
    নাইটগার্ডের বাঁশি বেজে ওঠে। যাক লোকটা তাহলে সুস্থ। গতকাল থেকেই আমার মনটা খুব খারাপ। ছোটপা রাগ করে চলে যাওয়ার পর থেকেই। আমরা অনেকগুলি ভাইবোন। সবাই যার যার সংসার নিয়ে আছে। কেবল সেজভাই আম্মা-আব্বা ও আমাদের দুই বোনকে নিয়ে থাকে। সে অফিস থেকে ফ্ল্যাট পেয়েছে। আম্মা-আব্বা সবসময় যে এখানে থাকে তা না, আজ এ বোনের বাড়ি, কাল ও ভাইয়ের বাড়ি, এরকম ঘোরাঘুরির ভিতর আছে। আমরা স্বামী ছাড়া দুই বোন কোথায় আর যাব, এখানেই থাকি।

    কাল ছোটপার সাথে সেজভাইর একটা বিষয়ে তর্কাতর্কি শুরু হয়। সেজভাই ফট করে বলে বসে, দেখেন, এটা আমার বাসা, এখানে থাকতে হলে আমার কথা মতো চলতে হবে, আপনার যদি না পোষায় যেখানে খুশি যেতে পারেন। এই কথার পর ছোটপা রাগে ক্ষোভে ঘরে ঢুকে ধুপধাপ সুটকেস নামায়। ওয়ার্ডরোব-আলমারি খুলে তার কাপড়-চোপড় যা পেয়েছে সুটকেসে ঢোকায়। তারপর বিশ-পঁচিশ মিনিটের মধ্যে গটগটিয়ে বের হয়ে যায় বড়আপার বাসার উদ্দেশে।

    আচ্ছা, ছোটপার কাপড়-চোপড়ের সাথে আমার দু-একটা চলে যাওয়া বিচিত্র কিছু না। আমার কাপড়-চোপড়...ফ্রক...। আরে মনে পড়েছে! আমি লাফিয়ে বিছানা থেকে নামি। আলো জ্বালাই। পাগলের মতো আলমারির সেই রোয়াকটা খুঁজি। আমার সোনামণির জামাটা যেখানে রাখা ছিল। নেই! ও আল্লাহ! ওটা তাহলে ছোটপা নিয়ে গেল! চারবছর ধরে আমার সোনাকে আগলে আছি! এটা তুই কি করলি আপা? আমি মাটিতে বসে পড়ি।

    আমি তখন কলেজে ফার্স্ট ইয়ারে। নিউমার্কেট গিয়েছি স্ক্রাব কিনতে। একটা দোকানের পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় হুট করে একটা ফ্রকে চোখ আটকে যায়। লাল টকটকে। সুন্দর ফুলের কাজ করা। খুব সিম্পল। কিন্তু কী সুইট দেখতে! দু বছরের বাচ্চার ফ্রকটা আমি নেড়েচেড়ে মুগ্ধ হয়ে গেলাম। হুড়মুড় করে একটা কষ্টও বুকে বিঁধল। আমার কেন একটা বাবু নেই? একটা ছোট্ট সোনামণি থাকলে এই সুন্দর ফ্রকটা পরাতে পারতাম। ফ্রকটা এতো নেড়েচেড়ে রেখে যেতে খারাপ লাগছিল। একদিন তো বাবু হবেই। কিনে ফেললাম। ফ্রকের প্যাকেটটা হাতে নিয়ে হাঁটতে হাঁটতে মনে হচ্ছিল আমি একটা ছোট্ট প্রাণ নিয়ে যাচ্ছি। এত ভাল লাগছিল। পৃথিবীতে এ আনন্দ আগে কখনো অনুভব করিনি, যেন আমার সোনামণিকে নিয়েই হাঁটছি। ছোট্ট দু পা টেনে টেনে এক হাতে আমার কড়ে আঙুল ধরে আমার মা হাঁটছে। মাথাটা ক্ষণে ক্ষণে তুমুল কৌতূহলে এদিক-ওদিক ঘোরাচ্ছে। আধোবোলে বলছে, মা মা, উ-ইটা নিবো..। আমার চোখে পানি এসে যায়।

    আমার বিয়ে হয়েছে তারও বছর খানিক বাদে। অবশ্য ফ্রকটার কথা ছোটপা ছাড়া কাউকে বলিনি। পৃথিবীতে ওকেই যে সবচে বেশি ভালবাসি। ইমরানের বাসা থেকে পুরোপুরি চলে আসার পরে একদিন ছোটপাকে বললাম, আমার তো অনিশ্চিত, তোমার বাবু হলে ফ্রকটা ওকেই পরাবো।

    ছোটপার ততদিনে একটা সম্পর্ক হয়েছে। এবং শিগিগিরই তাদের বিয়ে হচ্ছে। ছেলেটাকে আগের ঘটনা সব খুলে বলার পরও রাজি। শুধু সতর্ক করেছে, এ কথা তার পারিবার যাতে ঘুণাক্ষরেও জানতে না পারে। আমার ক্ষেত্রে মিথ্যার আশ্রয় নিতে হয়েছে। বলতে হয়েছে, আমার হাজব্যান্ড বিদেশে, তাই ভাইয়ের বাসায় থাকি। সত্য বড় কঠিন। দু দুটো বোনের একি পরিণতি কেইবা ভালভাবে নেবে? অবশ্য চেনা-পরিচিতদের কাছে একটা মিথ্যার বলয় আমাকে মেনটেন করতেই হয়। দেখা হলেই তারা খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে চরম কৌতূহলে স্বামী, সংসারের খোঁজখবর জিজ্ঞেস করে। আমিও হু হা করে কাটিয়ে দেই। দ্রুত সামনে থেকে কেটে পড়ি। কারণ মুখে যতই তারা আফসোসের ভাব দেখাক, ভিতরে ভিতরে এসব শুনে তারা দারুন আনন্দ পায়।

    কপালে যে আমার কী আছে কে জানে। দশ মাসের মাথায় কিছুদিন আগে পারিবারিকভাবে ইমরানের সাথে ডিভোর্স হল। আরও কিছুদিন এটাকে ঝুলিয়ে ওকে শাস্তি দিতে চেয়েছিলাম। কিন্তু পরিবারের চাপের কারণে দিতে হল। তবে জাতীয় পরিচয়পত্রে ইমরান এখনও আমার স্বামী। কী অদ্ভুত নিয়ম! আমি আবার বিয়ে করলে এটা পাল্টে নতুন স্বামীর তকত লাগাতে হবে। কেন? ছেলেদের মতো মেয়েদের বেলায়ও বাবার নাম লিখলে অসুবিধা কী?

    ছোটপা চলে যাওয়াতে একটা মানুষ রইল না যার সাথে সব শেয়ার করা যায়, মন খুলে দু-চার কথা বলা যায়। ফ্রকটা থাকলেও ভাবতাম, যাক আমার বাবুটা তো সঙ্গে আছে। শয়তানটা সেটাও নিয়ে গেল। না হয় বলেছিলাম, তোর বাবু হলে এটা ওকে পরাব। তাই বলে নিয়ে যেতে হবে? এত ছোট মন!

    সবাই কেমন আমাকে ছেড়ে চলে যাচ্ছে। আমার সোনামণিটাও গেল! এত কষ্ট নিয়ে মানুষ বাঁচে কীভাবে? ধুঁকতে ধুঁকতে কেবল একটা খোলস নিয়ে টিকে থাকা?

    দপ করে সব অন্ধকার। এত রাতে বিদ্যুৎ চলে গেল। আলমারির খোলা ডালাটা বন্ধ করে আমি ক্লান্ত শরীরটা টেনে বিছানায় এলিয়ে দেই। গাঢ় আধাঁরে ঘরটা ডুবে গেছে। চকচকে কাল-আলোতে কিছুই ঠাহর হয় না। জোরে চোখ রগড়াই। চোখ খুললে সব লালে লাল। তলপেটে একটা চিনচিনে ব্যথা টনটনিয়ে ওঠে। বিয়ের পরপরই আমার ভিতরে একটি প্রাণ এসেছিল। মাত্র একমাস। অন্ধকার ভালবেসে ও আর আলোতে আসেনি। আজকাল যে কী হয়েছে, আগে অন্ধকারে আমি ভয় পেতাম, দম বন্ধ হয়ে আসত। অথচ এখন অন্ধকারেই স্বস্তি বোধ করি। তাতে যে খুব সহজে মিশে যাওয়া যায়। আলোর যন্ত্রণা অনেক।

    ভাদ্র ১৪১৬

  • টিকটিকি

    টিকটিকিটা আমার সঙ্গী, সারাটা দিন বাসায় একলা থাকি, ও ছাড়া আর কে আছে ?

    কী যে তুমি কও না, টিকটিকি আবার কারো সঙ্গী হতে পারে নাকি ! শোনো, এটাকে মেরে ফেলি, বাথরুমের সুইচ টিপতে গেলেই বিরক্ত লাগছে।
    না না, প্লিজ মেরো না, টিকটিকি মারা ভালো না। এমনেই দেখবা সরে গেছে।
    ঝাড়– হাতে নিয়ে মারতে উদ্যত হয়েও শেষ পর্যন্ত লাজুর আর্জি রাখতে গিয়ে টিকটিকিটা আর মারা হয় না, যদিও ছোটবেলায় অনেক টিকটিকি মেরেছিলাম, বহুগুলার খালি লেজও খসিয়েছি। মারব না কেন, নবীজী একবার কাফেরদের আক্রমণ থেকে বাঁচার জন্য একটা গুহায় গিয়ে লুকায়, একটা বড়ো মাকড়সা তখন গুহামুখ আকঁড়ে নবীজীরে প্রটেকশন দেয় ; সেইখানে শালার গুহার ভিতরের টিকটিকিটা কিনা টিকটিক শব্দ করে নবীজীরে ধরাইয়া দিল ! দাদির মুখে এ গল্প শোনার পর টিকটিকি দেখলেই মারতাম। আর একটা টিকটিকি মারলে নাকি সত্তর নেকি সওয়াব পাওয়া যায়। তবে বাথরুম বা ঘরের ভিতর বড়ো বড়ো মাকড়সা দেখে ভয় লাগলেও মারতাম না। বড়ো হয়ে অনেক কুসংস্কারমুক্ত হতে পারলেও শৈশবের বিশ্বাসের বৃত্ত ভাঙতে এখনো সংকোচ লাগে।
    সকালে অফিসে যাওয়ার সময় খেয়াল করেছিলাম বাথরুমের সুইচের পাশের ফিউজটার উপর একটা টিকটিকি। বাথরুমের সাথে বেসিন, সুইচ টিপলে ওটা ক্ষিপ্র গতিতে বেসিনের আয়নার ফাঁকে ঢুকে যায়। তখন আমল দেই নাই, কিন্তু রাতেও বাসায় ফিরে টিকটিকিটাকে একইভাবে ফিউজে বসে থাকতে দেখে খটকা লাগল, হয়েছেটা কী ? আশেপাশে এটা কোথাও ডিম পেড়েছে নাকি ?
    আচ্ছা, একটা জিনিস খেয়াল করছ, লাজুকে বলি, একটা টিকটিকি সকাল থেকে ঠিক এই জায়গাটায় বসে রইছে। একটুও নড়ন-চড়ন নাই, খালি সুইচ টিপতে গেলেই দৌড় দেয়।
    সকাল না, কালকে রাত থেকেই এরকম। তোমার তো কিছুই চোখে পড়ে না, লাজু টিপ্পনি দেয়, যাক, তবুও ভালো যে একদিন পর চোখে পড়ছে। ঘরে আমি যে একটা প্রাণী সারাদিন একলা থাকি মাঝে মাঝে সেইটাও তো ভুলে যাও।
    কী কথার কী উত্তর ! ওকে বলাটাই ভুল হয়েছে। আমি টিকটিকিটাকে খুঁটিয়ে দেখতে থাকি। লাজুর নকিয়া সেটে টর্চ আছে, ফিউজের ডান পাশের সকেটে টর্চ মেরে দেখি : না, ডিম জাতীয় কিছু দেখা যাচ্ছে না।
    আচ্ছা, তোমার বিয়ে করার দরকারটা কী ছিল বল তো ? সকাল আটটায় যাও, রাত নয়টা-দশটায় আস। বিয়ের আগের আর এখনকার জীবনে আমি তো কোনো চেঞ্জ দেখি না, পার্থক্য খালি রাতে একসাথে ঘুমাই, তারচে’ বিয়ের আগেই অনেক সময় দিতা।
    ওহ, এমন বোকার মতো কথা বল ক্যান ? তুমি যেভাবে বলতেছ মনে হচ্ছে আমি ইচ্ছা করে বাইরে থাকি, তাইলে ঠিক আছে, তোমারে সময় দেয়ার জন্য এখন চাকরি ছেড়ে দিয়ে না খেয়ে থাকি, নাকি?
    তারপর এসেই শুরু হয় তোমার এমবিএ ! বাসায় এসেও আমার সাথে কথা বলার সময় থাকে না। লাজুর কণ্ঠ আর্দ্র হয়।
    এখন তো বিবিএ-এমবিএ-র যুগ। এমবিএ-টা শেষ করতে পারলে আরো ভালো চাকরি পাব, বেশি বেতন পাব। অ্যাতো টাকা দিয়ে ভর্তি হলাম, পড়াশুনা না করলে তো ফেল করব। খামাখা টাকা নষ্ট করে লাভ আছে ?
    লাজু এবার শুয়ে পড়ে দেয়ালের দিকে মুখ ঘুরিয়ে কম্বল টেনে নেয়। বিয়েতে পাওয়া কম্বল। লালের ওপর ক্রিম কালারের ফুল, পাতা, আর চিতার গায়ের মতো অসংখ্য ফোঁটা। এত সুন্দর মখমলের মতো জিনিস আসলে গায়ে দিতে ইচ্ছা করে না, দেয়ালে টাঙানো গেলে বেশ হত। কম্বলাবৃত লাজুকে চমৎকার লাগছে, মনে হচ্ছে ফারকোট পরা জড়সড় কেউ।
    শুধু শুধু কে কষ্ট করতে চায়, অফিস থেকে এমবিএ-র ক্লাস শেষে বাসায় এসে আমার কি ইচ্ছা করে না তোমারে নিয়া একটা মুভি দেখতে বসি ? যার জন্য করি চুরি সেই বলে চোর ! কথাটা মনে মনে রেখে ছোট্ট করে শ্বাস ফেলি। ওর কথা চিন্তা করেই এমবিএ-তে ভর্তি হয়েছিলাম, সিঙ্গেল থাকলে কার এইসব ঠেকা পড়েছিল ! সন্ধ্যাবেলা বগল বাজাতে বাজাতে বন্ধুদের সাথে আড্ডা মারতে যেতাম। দেড়মাস হল লাজুর ছোটবোনটার বিয়ে হয়েছে, জামাই কোটিপতি ; ঢাকা শহরে বাড়ি আর জায়গার অভাব নাই, গাড়ি তিনটা। হানিমুনে গিয়েছিল মরিশাস। নাজুর কাছ থেকে মরিশাসের গল্প শুনে কয়েকদিন শুধু ওই প্যাচাল পেরেছে। শুনে হিংসা হত, রাগ তো লাগতই। শালার বাপের এরকম সম্পত্তি পেলে আমরাও বউ নিয়া বাইরে মউজ করতে যেতাম। নাজুর জামাইর নিজের কৃতিত্বটা কোথায় ? বাপের বিশাল সম্পত্তি নেড়ে-চেরে খাচ্ছে, এই তো ? শেষে বিরক্ত হয়ে লাজুরে কথা দিলাম, শোনো যদি বেঁচে থাকি তাইলে নাজুগো মতো আমরাও একবার মরিচ দেশে যাব।
    শ্বশুরবাড়িতে গেলে এখন শ্বাশুড়ির মুখে সারাদিনই নাজুর জামাইর প্রশংসা। মরিশাস থেকে দুই-চারটা জিনি পেয়ে শ্বাশুড়ি একেবারে খুশিতে গদগদ। আসলে টাকাই সব !
    টিকটিকিটার লেজটা এমন ক্যান ? মনে হয় কাটা পড়ছে, না ? লাজু চায়ের কাপ টেবিলে রেখে আমার মতামত প্রত্যাশা করে।
    টিকটিকিটাকে তখন খুঁটিয়ে দেখেছিলাম, ঈগলচোখে লেজের খুঁতটাও খেয়াল করেছি, তাই টেবিলে বইয়ের মাঝে চোখ রেখেই উত্তরটা দিলাম, প্রথম দৃষ্টিতে তাই মনে হয় কিন্তু ভালোমতো তাকিয়ে দ্যাখো, লেজের শেষটা দ-য়ের মতো। কাটা না।
    খাওয়ার পরপরই সিগারেটখোরদের যেমন সিগারেট, আমার এক কাপ চা। অনেকের রাতে চা খেলে ঘুম হয় না, আমার বরং উল্টোটা। আগে অবশ্য এত চা খেতাম না ; বিয়ের পর বন্ধু-বান্ধবের সাথে কালেভদ্রে মদ খাওয়া তো ছাড়তে হলই, এমনকি বহু কষ্টে সিগারেটও। পৃথিবীতে নাকি কোনো কিছুর ধ্বংস নাই, শুধু রূপান্তর ঘটে। আগে যে আসক্তি ছিল সিগারেটের প্রতি, এখন তা চায়ের প্রতি।
    হু। লাজু চশমা চোখে পর্যবেক্ষণ করতে থাকে।
    ধুর, চায়ে চুমুক দিয়ে বলি, একটা ঝাড়– নিয়ে দুইটা বাড়ি দাও তো, খামাখা এইটা বিরক্ত করতেছে।
    দেখছ, এ সামান্য টিকটিকিটাও বুঝে গ্যাছে তুমি কতটা পাষাণ, কথাটা বলার সাথে সাথেই আয়নার তলে চলে গ্যাছে।
    লাজু টেবিলমুখি হয়ে বিছানায় এসে বসে। নিঃশব্দে আমাকে কিছুক্ষণ দেখে, তারপর থেকে থেকে বলে : অ্যাই, শোনো না, পড়া শেষ হয় নাই ? চলো ঐ নাটকটা দেখি। কী হবে পড়ে, অ্যাতো টাকা দিয়ে ? জীবনে যদি আনন্দই না থাকল ! আমার নিরুত্তর মূর্তি দেখে এবার ও দীর্ঘশ্বাস ছাড়ে, টিকটিকিটা যেমন আয়নার তলে যায়, একদিন আমিও কোথাও চলে যাব যাতে তুমি আর খুঁজে না পাও। ভালোই হবে, কেউ তোমারে বিরক্ত করবে না, কাছে আসতে বলবে না ; সারাদিন তোমার কাজ আর পড়াশুনা নিয়ে ব্যস্ত থাকতে পারবা।
    কিশোরী মেয়ের মতো অভিমানী কণ্ঠ আমাকে স্পর্শ করে, খোলা বইয়ের উপর পেপার ওয়েট চেপে চেয়ার ছেড়ে উঠি। বিছানায় লাজুর পাশে বসে ওকে জড়িয়ে ধরি। হালকা গোলাপি রঙের কামিজটাতে ওকে সুন্দর লাগছে, একটু আগে মুখে পানি দেয়ায় গালের ত্বকে উজ্জ্বলতা, দুপুরে শ্যাম্পু করা সিল্কি-চুলে টিউবলাইটের আলো গড়িয়ে পড়ছে। কোমল গালে গাল ঘষে ঠোঁটে চুমু দিতে গেলে ও মুখ ঘুরিয়ে নেয়, যাও, পড়তে যাও, আহ্লাদ দেখাতে হবে না। আমার কাছে আসলে আজকের মতো কালকের পরীক্ষায়ও সি গ্রেড পাবে। যাও পড়গা।
    পাইলে পাব, তুমিই যদি না থাক তাইলে ওইসব দিয়া কী করব ?
    বেশ কিছুক্ষণ এইভাবে জড়িয়ে থাকলে লাজু কাঁধে মাথা এলিয়ে দেয়। নির্বিকার ভঙ্গিতে ওর মাথায় হাত বুলাই, কিন্তু ভিতরে তাড়া অনুভব করি : বারোটা বেজে যাচ্ছে, ঘুমাতে হবে, পড়া তেমন হল না, ফ্রিজে নাকি কিছু নাই, ভোরে উঠেই যেতে হবে বাজারে, কালকে অফিসেও দৌড়াতে হবে আগে আগে, চীন থেকে ডেলিগেট আসতেছে..।
    আচ্ছা, তুমি আমারে একটা চাকরি দিতে পারো না ? সারাদিন বাসায় একলা থেকে একসময় তো মানসিক রোগি হয়ে যাব। লাজু মাথা উঠিয়ে আমার চোখে চোখ রাখে।
    অনার্স পাস না করে কী চাকরি করবে, টুকটাক কিছু করা যায় কিন্তু ওইসব সামান্য বেতনের চাকরি করার চেয়ে না করাই ভালো। একটু থেমে নরম সুরে বলি, অনেক দিন তো ইউনিভার্সিটি যাও না, ইয়ার ফাইনাল কবে ? খোঁজ-খবর রাখতেছো ?
    কত দূর ইউনিভার্সিটি, যেতে ভালো লাগে না ; আগে তো যাহোক তুমি ছিলা, একলা লাগত না।
    কেন, তোমার বান্ধবীরা আছে না ?
    ওরা নিজেদের প্রেম নিয়া ব্যস্ত, লাজুর কথার তলে দীর্ঘশ্বাসের ঢেউ ওঠে, আমার সাথে কথা বলার সময় পায় না।
    আমার চোখে মৃতব্যক্তির খোলা চোখের মতো শূন্যতা, ভাবতে থাকি কী করা যায় : লাজুর একাকীত্বের যন্ত্রণা লাঘবে এবং কয়েকবার এর সমাধানকল্পে দুজনে মিলে কিছু প্রকল্প হাতে নেয়া হয়েছিল, যেমন প্রতি শুক্রবারে আমরা কোথাও ঘুরতে যাব, অফিস শেষে যেদিন এমবিএ-র ক্লাস থাকবে না বাসায় এসে সন্ধ্যা থেকে রাত পর্যন্ত ওর সাথে সময় কাটাব ইত্যাদি। দুই-তিন সপ্তাহ এইরকম চলার পর উৎসাহে ভাটা পড়ে। বাংলাদেশে প্রণীত অসংখ্য আইনের মতো আমাদের প্রকল্পও অকার্যকর হয়ে পড়ে।
    লাজু হতাশাবাদী একজন মানুষ, জীবনের কোনো মানে ও খুঁজে পায় না, এ পৃথিবী, মানবজন্ম, বেঁচে থাকা সবকিছুই ওর কাছে বিষাদময়। বহুবার তর্কে জীবন সম্পর্কে আমি ওকে একটা পজিটিভ ধারণায় না আনতে পেরে শেষমেষ ফ্রয়েডের এই সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছি যে, ওর কৈশোর যে অবরুদ্ধতার ভেতর কেটেছে, ধর্মের যাতাকলে ওর সমস্ত ভালো লাগা শখ যেভাবে পিষ্ট হয়েছে ; মানুষের নিষ্ঠুরতা, কঠোর শাসন আর না-পাওয়ার বেদনাগুলো ক্রমে তাই ওকে জীবনবিমুখ করে দিয়েছে।
    আমি বোঝাতে চেষ্টা করেছি, পৃথিবীটা কত সুন্দর, কত কিছু দেখার আছে এখানে, জীবনটাকে উপভোগ না করে, কিছুই না দেখে, না করে তুমি চলে যেতে চাও ?
    এসব মিথ্যা স্বপ্ন দেখে কী লাভ ? লাজু বিষণœ গলায় তেতে ওঠে, ছোটবেলা থেকে কোনো স্বপ্নই আমার কখনো পূরণ হয় নাই, আমার সব স্মৃতিই শুধু দুঃস্বপ্নের স্মৃতি। ছোটবেলায় শিশু একাডেমিতে গানে ভর্তি করাইল কিন্তু আমার নাচ ভালো লাগত, গান বাদ দিয়ে আমি নাচের ক্লাস করতাম। আব্বা জানতে পেরে একাডেমি যাওয়াই বন্ধ করে দিল, বলে, মাইয়া মানুষ নাচ শিখখা কী করবি, নটী হইতে চাস, নটী ? গানের জন্য বাসায় একটা হারমোনিয়াম ছিল, মাঝে-সাঝে বাজাতাম, আব্বা তাবলিগ শুরুর পর ভেঙ্গে ফেলে ; খুব কষ্ট পাইছিলাম তখন। তারপর সময় কাটানোর জন্য ছবি আঁকতাম, একদিন আব্বা অনেকগুলো ছবি ছিঁড়ে বলে, ছবি আঁকাআঁকি এসব অনৈসলামিক কাজ যেন না করি। এরপর আমার সময়ই কাটত না, নিচের মাঠে অন্য মেয়েরা খেলত আমি তাকিয়ে দেখতাম, আমার যাওয়া নিষেধ কারণ ততদিনে আমি সিয়ানা হয়ে গেছি, আর সিয়ানা মেয়ের দৌড়-ঝাপ করা নিষেধ। আমি খুব চুপচাপ হয়ে গেলাম, নিজেরে শামুকের মতো গুটিয়ে নিলাম, বাস্তবতা থেকে দূরে সরে ধীরে ধীরে কল্পনাপ্রবণ হয়ে উঠলাম ; সময় কাটাতাম গল্পের বই পড়ে, আকাশ দেখে, জানালার পাশের গাছের সাথে সুখ-দুঃখের কথা বলে। ইন্ট্রোভার্ট স্বভাবের জন্য স্কুল-কলেজে আমার তেমন কোনো বন্ধু ছিল না। এতটুকু বলে লাজু থামে, একটু হাসার চেষ্টা করে দীর্ঘ করে শ্বাস টেনে বলে, তারপর বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তি হওয়া পর্যন্ত বই-ই ছিল একমাত্র সঙ্গী, ঘনিষ্ঠ বন্ধু। জাহাঙ্গীরনগরে ভর্তি হতে গিয়েও অনেক কাঠ-খড় পোড়াতে হয়েছে, ঢাবিতে চান্স পাই নাই, আব্বা কিছুতেই এত দূরে ভর্তি করাবে না। শেষে মা বড়ো চাচারে ধরে। আব্বা আবার বড়ো চাচার কাছে বিলাই, বড়ো চাচা এসে আব্বারে ধমক দিল, মানুষ ইউনিভার্সিটি চান্স পায় না, আর মেয়েটা চান্স পাইয়াও ভর্তি হইব না ক্যা ? কী এমন দূর সাভার ? নবীজী বলে নাই, জ্ঞানার্জনের জন্য সুদূর চীনে যাও ? আচ্ছাÑ, লাজুর কথা শেষ হলে জিজ্ঞেস করি, আমি তো ছোটবেলায় ছোট ভাইবোনদের সাথে খেলতাম, তুমি নাজুর সাথে খেল নাই ?
    লাজু ঠোঁট প্রশস্ত করে হাসির রেখা তৈরি করে, নাহ, ও ছোটবেলা থেকেই মায়ের ফটোকপি, সাজগোজ, পরচর্চা আর স্বার্থপর সব চিন্তা-ভাবনা নিয়ে ব্যস্ত, ওর সাথে আমার কখনোই মিলতো না।

    আচ্ছা, চুলে বিলি কাটা আমার আঙুল থামিয়ে দিয়ে লাজু মাথা সোজা করে। দেশের থেকে আব্বা-আম্মাকে ঢাকায় এনে রাখলে কেমন হয় ?
    সেটা তো আমিও চাই। তাহলে তোমারও আর একা লাগত না, কিন্তু যে ইনকাম তাতে দেড়রুমের এই ফ্লাটের ভাড়া দিয়ে, খাওয়া খরচ আর বিয়ের ধার শোধেই তো টাকা শেষ। তোমার ইচ্ছা হলে তোমাদের বাড়িতে গিয়ে তুমি থাকতে পারো, আমার আপত্তি নাই, কিন্তু প্লিজ, আমারে রাত্রে যেতে বলবা না ; তখন কয়দিন পর মানুষ ঘরজামাই ডাকতে শুরু করব। গলা স্বাভাবিক রাখার চেষ্টা করে খানিক বিরতি দিয়ে বলি, তুমি যদি আর দেড়-দুই বছর বিয়েটা ঠেকিয়ে রাখতে পারতে.. তাহলে মাস্টার্সটা শেষ করে চাকরি করে টাকা-পয়সা জমিয়ে তারপর..,
    এখন আমারে দোষ দাও ক্যান ? তুমি বিয়ে না করলেই পারতা। লাজু উত্তেজিত হয়।
    থাক, এখন আর এইসব আলোচনায় লাভ কী।
    অনেকক্ষণ কথা এগোয় না। দুজনেই নিশ্চুপ। রাস্তা থেকে কেবল থেকে থেকে ভেসে আসছে গাড়ি চলাচলের শব্দ।
    আসো শুয়ে পড়ি, লাজুর মাথায় হাত বুলাতে বুলাতে ঘুমে আমার চোখ জড়িয়ে আসে।
    অ্যাতো তাড়াতাড়ি ? মাত্র ১২টা বাজলো। বলেই মাথা উঠিয়ে লাজু আমাকে দেখে। ইস, তোমার দেখি ঘুমে অবস্থা খারাপ। ঠিক আছে, তুমি দাঁত ব্রাশ করো।
    ঝপাঝপ দাঁত মেজে, মুখ ধুয়ে, ঠোঁটে ভেজলিন মেখে, লাইট নিভিয়ে যখন কম্বলের তলায় গেলাম ততক্ষণে ঘুম কেটে গেছে। লাজু আমার সাথে লেপ্টে বুকের ওপর মাথা রাখে, আমারে একটু ঘুম পাড়িয়ে দেও না, তুমি তো একা একাই ঘুমিয়ে যাও। গলায় অসন্তুষ্টি মিশিয়ে বলে, কালকে শোয়ার এক-দেড় ঘণ্টা পর ঘুম আসছে। বিয়ের আগে তো বলতা, তোমারে রাত্রে ঘুম পাড়িয়ে দিব।
    ঠিক আছে, চুলে হাত বুলাই, ঘুমাতে চেষ্টা কর। চোখ বন্ধ করে চুপ করে থাকো, দেখবা এমনেই ঘুম আসবে।
    লাজু চোখ বুজে ওর আজকে দেখা ‘লাইফ ইজ বিউটিফুল’ ছবির কাহিনী বলা শুরু করে। সেসব আমার কানে কিছুই ঢোকে না, আমি চুলে হাত বুলিয়ে চলি আর মাথায় কালকের চিন্তা-স্রোত ঘূর্ণি খায় : পড়া হল না, কালকের পরীক্ষায়ও সি পাব, ফ্রিজে কিছু নাই, ভোরে উঠেই যেতে হবে বাজারে, অফিসে দৌড়াতে হবে আগে আগে, চীন থেকে ডেলিগেট আসতেছে, মিজান ফোন করছে, ওর টাকাটা দিতে হবে..।


    পৌষ ১৪১২
    (জনকণ্ঠ, ৬ জানুয়ারি ’০৬)

  • মেয়েটি এবং ছেলেটি

    মেয়েটি বললো, আমাদের বারান্দা কিন্তু ডালিয়া আর ক্যাকটাসে ভরা থাকবে।
    ছেলেটি বললো, আর কিছু থাকবে না? বেলি, গন্ধরাজ, হাসনাহেনা?
    যাও, হাসনাহেনা আবার টবের মধ্যে হয় নাকি?
    হয় না?
    উঁহু। ..হাসনাহেনার গন্ধে কিন্তু সাপ আসে, জানো?
    শুনেছি, মানুষ বলে।
    আচ্ছা, আমি একটা সাপ পালবো। মেয়েটি বাচ্চাদের মতো আদুরে ভঙ্গিতে বলে।
    অ্যা? সা-প! ছেলেটির হতভম্ব-মুখটি হয় দেখার মতো।
    হ্যাঁ। একটা বাচ্চা সাপ। আমার খুব শখ। জানো, ফার্স্ট ইয়ারে পড়ার সময় লিমন আমার জন্মদিনে একটা সাপ গিফ্ট করতে চাইছিলো। কিন্তু বাসায় তো আর সাপ পুষতে পারবো না, তাই নিতে পারি নাই। আমার অনেক মন খারাপ হইছিলো তখন।
    তুমি সাপ পালতে চাও! তোমার মাথার ঠিক আছে তো?
    মেয়েটি ঠোঁটে একটু দুষ্টহাসি ঝুলিয়ে বোঝাতে চেষ্টা করে, শোনো, সাপরে ভয় পাওয়ার কিছু নাই। ওরা খুব শান্ত।
    সাপ শান্ত? ছেলেটি ঢোক গিলতে গিয়ে সামলে নেয়। তারপর কৌতূহলী কণ্ঠে জিজ্ঞেস করে, কী সাপ?
    এই ধরো, অজগর হতে পারে আবার ছোটোখাটো অন্য প্রজাতির সাপও হতে পারে। যেগুলো তেমন বিষাক্ত না। খুব উৎসাহ নিয়ে বলতে থাকে মেয়েটি।
    ছেলেটির এবার দম বন্ধ হয়ে যাওয়ার অবস্থা, তারপর সাপটা রাখবে কোথায়?
    কেন? ঘরে, কাচের জারের মধ্যে।
    ঘরের মধ্যে? ছেলেটি ভীতস্বরে চেচিয়ে ওঠে, ভ্রু দুটি তার প্রায় সাপের মতোই বেঁকে যায়, আমরা বিষাক্ত সাপ পাশে রেখে ঘুমাবো?
    আহা, বিষাক্ত হবে কেন? নির্দিষ্ট সময় পরপর বিষদাঁত তুলে ফেলবো না?
    ছেলেটি কয়েক মুহূর্ত মেয়েটির দিকে ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে থাকে, যেন ব্যাপারটা হজম করতে চেষ্টা করছে। তারপর এক নিশ্বাসে বলতে শুরু করে, তুমি কি আমারে বাড়িছাড়া করতে চাও? দুধকলা দিয়া তুমি কালসাপ পুষবা আর সেই সাপ ঘরের মধ্যে রেখে আমি নিশ্চিন্তে ঘুমাইতে পারবো? ঘুমের মধ্যে খালি স্বপ্ন দেখবো আমার চারপাশে সাপ কিলবিল করতাছে। আমার গলা পেচাঁইয়া ধরতাছে। উহঃ, কী ভয়ংকর!
    ছেলেটির কথা শুনে মেয়েটি আগে একচোট হেসে নেয়। তারপর হাসি থামলে বলে, আচ্ছা, ঠিকাছে, তাহলে বারান্দায় রাখবো।
    তোমার যেইখানে খুশি ওইখানে রাখো, আমার সাফ কথা। তুমি যদি বাসায় সাপ পালো, ঐ বাসায়ই আমি ঢুকবো না।
    এটা একটা কথা হলো? আমার এতোদিনের শখ..।আচ্ছা, তাহলে আমাদের যখন নিজেদের বাড়ি হবে তখন পালবো, কেমন?
    ছেলেটি চুপ করে থাকে। মুখের ভাবে যেন বলছে, তখনকারটা তখন দেখা যাবে।
    মেয়েটি এবার হঠাৎ মনে পড়ার ভঙ্গিতে বলে, জানো, আমার না খুব পাখিও পালার শখ। একটা ময়না পাখি। আমি ওকে কথা শিখাবো।
    পাখি? একটা সুন্দর পাখিকে তুমি খাঁচার মধ্যে পুরে পালতে চাও? যেখানে একটা পাখি সারা পৃথিবী ঘুরে বেড়াতে পারে সেখানে তুমি একে ছোট্ট একটা খাঁচায় বন্দি করতে চাও? খাঁচার ভিতরতো এ উড়তেই ভুলে যাবে।
    ও.. তাইলে, বারান্দায় ছেড়ে দিয়ে পালবো। ধরো, বারান্দার পুরোটা নেট দিয়ে খাঁচার মতো করে ফেলবো, তাইলে অনেক বড়ো খাঁচা হবে।
    তোমার যা বুদ্ধি! বারান্দায় খাঁচা বানাইলে জামা-কাপড় শুকাইবা কোথায়? আর পাখি হেগে-মুতে বারান্দা নষ্ট করে দেবে না? ওই গন্ধে ঘরে থাকা যাবে?
    ও..। মেয়েটির মুখটা হঠাৎ দুঃখী দুঃখী দেখায়।
    তারপর জোৎস্না রাতে বারান্দায় মাদুর পেতে শুয়ে তোমার যে চাঁদ দেখার প্ল্যান, সেটা হবে কীভাবে? আর বারান্দায় বসে চা খাওয়ার কথা না হয় বাদই দিলাম।
    মেয়েটি ছেলেটির কথা শুনে বোকার মতো তাকিয়ে থাকে। সে সরল চোখের দৃষ্টি দেখে ছেলেটির মায়া হয়, বলে, শোনো, তুমি যা ভাবছো, এর জন্য আমাদের বহু বছর অপেক্ষা করতে হবে। ঢাকার আশেপাশে একটা বড়ো জায়গা কিনে বাড়ি করলে তখন তোমার মিনি চিড়িয়াখানাটা বানানো যায়।
    মেয়েটির মুখ এবার খুশিতে ঝলমল করে, সত্যিই আমাকে মিনি চিড়িয়াখানা বানিয়ে দেবে? উহ, দারুণ হবে, আমি অনেক জিনিস পালবো।খরগোশ, হরিণ, বড়ো খাঁচা করে অনেক পাখি।
    আরে, এখন এসব ভেবে লাভ আছে? ভবিষ্যতে কবে টাকা হবে, কবে বিশাল জমি কিনতে পারবো তার নাই ঠিক। ছেলে না হইতেই হাজমের সাথে দোস্তি। হেঃ
    তুমি না। একদম রস-কষ নাই, ভবিষ্যতে হোক-না-হোক মনে মনে ভাবতে দোষ কী? ভাবতে কী ভালো লাগছিলো।
    ও, ঠিক আছে, ভাবতে থাকো, ভেবে মনে মনে সুখ পেতে থাকো।
    ছেলেটি মাথা ঘুরিয়ে এদিক-সেদিক তাকায়। তার পায়ের কাছের ঘাসে বিকেলের এক টুকরো রোদ শুয়ে আছে। ছেলেটি মাথা নিচু করে সেখান থেকে ঘাস ছিঁড়তে শুরু করে।

    সামনের মাসে ছেলেটি এবং মেয়েটির বিয়ে। দুজনের বাড়িতে কথাবার্তা পাকাপাকি। যদিও দু পক্ষের পরিবার এতো সহজে রাজি হয়নি। মেয়ের পছন্দের কথা শুনে মেয়েটির বাপ ক্ষুব্ধ হয়ে বলেছিলেন, হাজবেন্ড-ওয়াইফ সেম এইজ হইলে কিছু সমস্যা হয়। যদিও এখন যুগ পাল্টাইছে, এইটা অনেকেই করে। কিন্তু আমি ভাবতাছি আয়-রোজগারের কথা, ছেলে তো কেবল তোর সাথেই অনার্স করলো, না? চাকরি কইরা আর কয় টাকা পাইবো। কতো? বারো হাজার পায়? বারো হাজার টাকায় ঢাকা শহরে কী হয়? ..যাউক, তুই ইউনিভার্সিটি পড়া শিক্ষিত মেয়ে, এখন তো আর জোর করতে পারি না। নিজের ভালোমন্দ বোঝার ক্ষমতা নিশ্চয়ই তোর হইছে। তুই সুখে থাকলেই আমাগো সুখ।
    ছেলেটির বাপ শুনে প্রথমেই একটা ধমক দিয়ে বলেছিলেন, এতো তাড়াতাড়ি বিয়ে করার কী হইলো? তোর বিয়ের বয়স হইছে? মাত্র চাকরি শুরু কইরাই পাখ গজাইয়া গেছে, না? তারপর খানিক চুপ করে থেকে গম্ভীরস্বরে জিজ্ঞেস করেন, মাস্টার্স দিবি না?
    ছেলেটি তাড়াতাড়ি জবাব দেয়, এই মাস্টার্স না, আমি ইভিনিং এমবিএ-তে ভর্তি হবো।
    বাপ আর তেমন উচ্চবাচ্য করলেন না, এ বছর তিনি হজে যাবেন ঠিক করেছেন, যাওয়ার আগে ছেলের বিয়েটা দিয়ে যেতে পারলে মন্দ কী! তাছাড়া ধর্মেও আছে যুবক বয়সই বিয়ের উত্তম সময়। ছেলেমেয়ে দুজনেই যখন শিক্ষিত, দুজনে মিলে রোজগাড় করলে খেয়েপড়ে ভালোই থাকবে।
    বগুড়া নিবাসী ছেলেটির মা-বাবা ঢাকায় এসে মেয়েটিকে দেখে গেছেন। মেয়ের সবই ঠিক আছে কেবল লম্বায় খাটো। কথাটা ছেলেকে তারা বলতে গিয়েও বলেননি, আর বলে লাভ কী? ছেলে নিজেই যখন পছন্দ করেছে।
    নড়াইল থেকে মেয়ের মা-বাবাও ঢাকায় এসে ছেলেকে দেখে গেছেন। ছেলে তাদের পছন্দ হয়েছে।
    অবশেষে ছেলেটি আর মেয়েটির পাঁচ মাসের প্রেম সফল হতে যাচ্ছে। আগামী মাসে ছেলেপক্ষের পনেরজন গিয়ে বিয়ে পড়িয়ে একবারে বউ তুলে নিয়ে আসবে। দু পক্ষ থেকেই কোনো অনুষ্ঠান করা হবে না।
    ছেলেটি এবং মেয়েটি এখন হাওয়ায় ভেসে বেড়াচ্ছে। তাদের চোখে শত শত রঙিন প্রজাপতি। জীবনের সবচে রোমাঞ্চকর, আনন্দঘন এবং উত্তেজনাময় মুহূর্ত এখন তারা পার করছে। ছেলেটি অফিস শেষে প্রতি সন্ধ্যায় দৌড়াতে দৌড়াতে মেয়েটির হলে চলে আসে। দুজনে খুলে বসে তখন ভবিষ্যত-স্বপ্নের ডালা।

    মেয়েটি ছেলেটির হাত ধরে বলে, আচ্ছা, শোনো, আমরা যে বাসাটা দেখে এসেছি না? ওটা এখন ভাল লাগছে না। ছাদের ওপর কোনো বাসা খোঁজো না!
    ছেলেটি একটু অবাক হয়। গতকাল দুজনেই আজিমপুরের বাসাটা পছন্দ করে এলো। আগামীকাল এডভান্স দিতে যাওয়ার কথা। আর এখন এমন কথা! ছেলেটি ভুরু কুঁচকায়, কেন? ওটা সমস্যা কী?
    উহু, ওটা না, ছাদের ওপর রুম, এমন বাসা খোঁজো।
    কেন?
    মেয়েটি খুব মিষ্টি করে হেসে লাজুকস্বরে বলে, যাতে বৃষ্টি এলে আমরা ভিজতে পারি। ধরো, রাত্রে ঝুম বৃষ্টি পড়ছে, আমরা ঘুমিয়ে আছি কিন্তু ঘুম আসছে না। তখন ছাদে গিয়ে দুজনে মজা করে ভিজবো। বৃষ্টিতে হাত ধরে দুজনে ওয়েস্টার্ন নাচ নাচবো।
    ছেলেটির চোখ আর ঠোঁটের কোণে হাসির ঢেউ ওঠে, বাহ, দৃশ্যটা ভাবতেই ভালো লাগছে। কিন্তু আমার হবু বউ, ঢাকা শহরে চিলেকোঠার ঘর পাওয়া তো সহজ কথা না। ছাদের ওপর যা-ও ঘর পাওয়া যায়, দেখা যায় ছাদে ঢোকার মুখে দরজা লাগিয়ে বাড়িওয়ালা ছাদ তালা দিয়ে রাখে।
    খুঁজলে নিশ্চয়ই খোলা ছাদের বাসা পাওয়া যাবে। আমার খালার বাসাইতো এরকম।
    এতো মহা ফাঁপড়ে পড়লাম। দ্যাখো, ভাবতে অনেক কিছুই ভালো লাগে কিন্তু সবকিছু কি করা যায়? এই যেমন তুমি প্রায়ই বলতে ঝুম বৃষ্টিতে আমরা রিকশার হুড ফেলে দিয়ে ঘুরবো, একেবারে কাকভেজা হয়ে বাসায় ফিরবো। কই ঘুরেছো একদিনও?
    মেয়েটি ঠোঁট টিপে হাসে, আহা, আমি তো চাই, কিন্তু রিকশায় এরকম কাকভেজা হয়ে ঢং করে বেড়ালে রাস্তার মানুষগুলাতো বেহায়ার মতো তাকিয়ে থাকবে, মানুষ অসভ্যের মতো আমার ভেজা শরীরের দিকে তাকিয়ে থাকুক সেটা দেখতে তোমার খুব ভালো লাগবে, না?
    ইম্পপসিবল, যে তাকাবে একেবারে ঘুষি মেরে নাক ফাটিয়ে দেবো না। আমার জানকে দেখার অধিকার কেবল আমার। আমিই রসিয়ে রসিয়ে দেখবো, একেবারে খুলে খুলে দেখবো।
    এই এই, খবরদার খারাপ কথা বলবে না। ফাজিল ছেলে! মেয়েটি শাসানোর ভঙ্গি করে।
    ছেলেটি মজা পায়, মেয়েটির কথা শুনে হেসে ফেলে। মেয়েটিও হাসিতে যোগ দেয়। তারপর দুজন দুজনের দিকে খানিক চুপ করে চেয়ে থাকে, যেন পরস্পরের চোখে তারা তাদের ভাবনার জীবন্ত ছবি দেখছে।
    মেয়েটি একটু বাদে হঠাৎ কিছু একটা মনে পড়েছে ভঙ্গিতে বলে, আচ্ছা, আমি তো ভালো রান্না করতে পারি না, তুমি খেতে পারবে তো? পরে আবার রান্না খারাপ হলে বকবে নাতো?
    ছেলেটি চোখ বড়ো বড়ো করে বলে, তোমাকে বকবো আমি? এমন কথা তুমি বলতে পারলে!
    উহু, যদি বকো?
    কক্ষণো না। বকবো কেন? আমরা তো কেবল ভালোবাসাবাসি করবো। আর রান্না তুমি একা করবে কেন, আমিও করবো। ধরো, সকালে ও দুপুরে তুমি রান্না করবে আর সন্ধ্যায় আমি অফিস থেকে এসে দুজনে মিলে রান্না করবো।
    আচ্ছা, ছুটির দিনে আমরা কী করবো? কোথাও ঘুরতে বের হবো না?
    আবার জিংগায়! অবশ্যই।
    কোথায় যাবো?
    এই কাছাকাছি কোথাও যেখানে গেলে খরচ অল্প। যেমন ন্যাশনাল পার্ক, সোনারগাঁ, চিড়িয়াখানা, লালবাগ কেল্লা, তারপর নভোথিয়েটার, জাদুঘরে যাওয়া যায়, বেইলি রোডে নাটক দেখতে যাওয়া যায়। এরকম জায়গাগুলাতে আর-কি। অথবা কোনো কোনো সপ্তায় আমরা বাসায় থেকে মুভি দেখবো, সারাদিন গল্প করে কাটাবো।
    বাহ, দারুণ মজা তো। ভাবতেই কী এক্সসাইটিং লাগছে! জীবনটা কতো সুন্দর তাই না?
    জীবন তো সুন্দরই। সুন্দর করে সাজাতে হয়, উপভোগ করতে জানতে হয়।
    হুম্, উপভোগ। মেয়েটি বিড়বিড় করে বলে। চারপাশে চোখ ঘুরিয়ে দেখে। হল সংলগ্ন রাস্তায় তাদের মতো আরো অনেক জুটি বসে আছে। ঘনিষ্ঠ হয়ে বসে গল্প করছে, হাসছে। ঝালমুড়ি, ফুসকা, আইসক্রিম খাচ্ছে। ওরাও কি বিয়ের পর জীবনটা এইভাবে উপভোগ করবে?
    এই, কী ভাবছো? ছেলেটি মেয়েটিকে মৃদু নাড়া দেয়।
    নাহ, কী ভাববো? মেয়েটি ছেলেটির চোখে চোখ রাখে।
    আচ্ছা, আমরা সকালে ঘুম থেকে উঠবো কয়টা বাজে? ছেলেটি জিজ্ঞেস করে।
    এই, সাতটা।
    কে আগে উঠবে, আমি না তুমি?
    যেই আগে উঠুক সে উঠে প্রথমে চা বানাবে, তারপর আরেকজনকে ডাকবে।
    মানে বেড-টি?
    হু। ধরো, আমি যদি আগে উঠি, উঠে আগে চা বানানো শেষ করে তারপর তোমাকে জাগাবো, কানের মধ্যে কু দেবো।
    কী দেবে? ছেলেটি ভ্রƒ কুঁচকায়।
    কু। মেয়েটি হেসে ফেলে। ছেলেটির কানের কাছে মুখ এনে দেখায়, এই যে এইভাবে। কু-ও।
    ও-হহো।
    দুজনেই শব্দ করে হেসে ওঠে।
    হাসি থামলে দুজনে খানিক চুপচাপ। মেয়েটি ছেলেটির উরুতে আঙুল দিয়ে আঁকিবুঁকি কাটতে থাকে। এক সময় ছেলেটির হাতের ওপর আলতো করে হাত রাখে, আঙুলের ফাঁকে আঙুল গলিয়ে দিয়ে মৃদু ডাকে, এই।
    কী?
    মেয়েটি কিছু বলে না। মাথা নিচু করে ডান পায়ের বুড়ো আঙুল মাটিতে ঘষতে থাকে।
    কী, বলো?
    না, বলবো না। লজ্জা লাগছে।
    লজ্জা? ছেলেটি কৌতূহলী-চোখে মেয়েটির মুখ পড়তে শুরু করে। তার হবু বউ তাকে কী কথা বলতে চায় যার জন্য লজ্জা পাচ্ছে?
    বলো।
    উহু, না। তুমি কী মনে করো।
    আহা, মনে করার কী আছে? বলোতো। ছেলেটি অভয় দেয়।
    মেয়েটি ছেলেটির দিকে লাজুক-চোখে তাকিয়ে কী দেখে, তারপর পলকে চোখ নামিয়ে ফেলে, না, আমি বলতে পারবো না, লজ্জা করে।
    আহা, লজ্জার কী আছে? কদিন পরই তো আমরা স্বামী-স্ত্রী হয়ে যাবো, লজ্জা পেলে চলবে? বলো। মেয়েটি ছেলেটির চোখে তাকিয়ে সময় নিয়ে প্রায় ফিসফিসিয়ে বলে, বিয়ের পর আমরা বাবু কবে নেবো?
    কথাটি শুনে ছেলেটি তাজ্জব হয়ে গেলেও ভিতরে একটা মৃদু শিহরণ বয়ে যায়। মনে মনে হেসে ওঠে। ঠোঁটের কোণেও অজান্তেই একটা দুষ্ট-হাসি ঝুলতে শুরু করে। এ-কারণেই বলা হয় নারীর পূর্ণতা মাতৃত্বে। বিয়ে হওয়ার আগ থেকেই কাচ্চা-বাচ্চার চিন্তা শুরু হয়ে গেছে।
    কী? কথা বলে না কেন? মেয়েটি ছেলেটিকে হালকা নাড়া দেয়।
    ছেলেটি কিছু বলে না, কেবল মিষ্টি হাসে।
    এই, হাসবে না খবরদার।
    হাসবো নাতো কী করবো? বিয়ে না-হতেই আণ্ডা-বাচ্চার চিন্তা শুরু হয়ে গেলো!
    ধুর। আমি তো ভবিষ্যতের কথা বলেছি।
    সেই ভবিষ্যতের চিন্তাটা আরো পাঁচ বছর পর করা যাবে।

    নয় মাস পর।
    ‘সংসার জীবনের প্রথম ডায়েরি লিখছি। এতদিন যে প্রয়োজন পড়েনি তা নয়, মনে লিখা ভাবনাগুলো কেন যে কাগজে স্থান পেলো না! দীর্ঘদিন পর আজ যখন আবার শুরু করলাম, কীভাবে আরম্ভ করবো বুঝতে পারছি না। আজ তোমাকে খুব দূরের কেউ মনে হচ্ছে...
    না, আমি তোমার বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ করবো না, এ ডায়েরি কোনো অভিযোগলিপি নয়। আমার একান্ত অনুভূতিগুলোই এ ডায়েরিকে বলছি। জীবনটাকে কখন যেন প্রাঞ্জল ভাবতে শুরু করেছিলাম কিন্তু ভাবনার গালে এত জোরে চড় পড়বে বুঝতে পারি নি। একত্রিত জীবন শুরুর আগে তুমি আমাকে যে স্বপ্নগুলো দিয়েছিলে সেগুলো কোথায়? কোনোকিছু পাওয়া হয়ে গেলে তার আবেদন আর আগের মতো থাকে না, সেই যে কবিতার লাইনটা মনে পড়ে? মানুষ এমন তয়, একবার পাইবার পর নিতান্ত মাটির মনে হয় তার সোনার মোহর। আগে আমাকে সময় দিতে তোমার কোনো সমস্যা হতো না। এখন হয় তুমি অফিস, এমবিএ বা অন্যান্য কাজে বাইরে ব্যস্ত থাকো, নয়তো যখন বাসায় আসো পড়াশুনা বা পত্রিকা পড়াতে ব্যস্ত থাকো; আমাকে দেয়ার মতো বিন্দুমাত্র সময়ও তোমার হয় না। এমনকী ভালো করে কথা বলারও অবকাশ তোমার নেই। বর্তমান সময়গুলোতে শুধু জৈবিক প্রয়োজন হলেই আমার কথা তোমার স্মরণ হয়। একবারও কি ভাবো না, একবারের জন্যও কি তোমার মনে প্রশ্ন জাগে আমার দিনগুলো কেমন যায়? রাতগুলো কেমন কাটে! একজন মানুষ যে তোমার সাথে বাস করছে এটা তোমার খেয়াল থাকে? নাকি তোমার ধারণা এখানে তুমি একাই প্রাণী!
    এখন আটটা বাজে। হয়তো আর কিছুক্ষণের মধ্যে তুমি বাসায় চলে আসবে। কাপড় ছেড়ে চা খেয়েই বই-খাতা নিয়ে বসবে, রাতে কখন ঘুমাবে জানি না। সকালে উঠে সেই একই নির্ঘণ্ট..। আলবেয়ারকামুরআউসাইডারবইটাপড়েছোতুমি? শনিবার, রবিবার, সোমবার, মঙ্গলবার, বুধবার, বৃহষ্পতিবার, শুক্রবার। আবার শনিবার, রবিবার... উহঃ, কী একঘেয়ে বৈচিত্রহীন গতানুগতিক জীবন! ভেবো না আমি চাই সবসময় তুমি আঠার মতো আমার সাথে লেগে থাকো, তবে যতটুকু প্রয়োজন ততটুকু তো দেয়া উচিত। যাহোক, অনেক চেষ্টা করছি এ জীবনে অভ্যস্ত হতে কিন্তু পারছি না। প্রচণ্ড কষ্ট হয়। বন্ধু-বান্ধবও এখন কেমন পর পর আচরণ করে। সবার থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে আমি কেমন অবস্থানে আছি, এটা তুমি জানো? একে নিঃসঙ্গতা বলে না, তার চেয়েও আরো ভয়ঙ্কর কিছু!...’
    টিং-ডং।
    দরজার কলবেল বেজে উঠলো। ছেলেটি এসে পড়েছে নিশ্চয়ই। মেয়েটি ডায়েরি বন্ধ করে দরজা খোলার জন্য উঠলো।
    ছেলেটি ঘরে ঢুকেই ফ্যানের স্পিড ফুল করে দিলো। তারপর কাপড় ছাড়তে ছাড়তে বিরক্ত-মুখে বললো, কি ব্যাপার, ঘর এতো বালি বালি কেন? ঝাড়– দেও নাই আজকে?
    মেয়েটির মুখ হঠাৎ গোমড়া হয়ে যায়। ছেলেটি সারাদিন পর বাড়িতে ফিরে কোথায় তাকে হাসিমুখে জড়িয়ে ধরবে, ভালোমন্দ দু’একটা কথা বলবে, তা-না এসেই ঘর ঝাড়ার কথা! যেন বউ বিয়ে করে আনা হয়েছে কেবল ঘরের কাজকাম করার জন্য। মেয়েটির মেজাজ খারাপ হলো, বললো, আজকে না, কাল-পরশুও ঝাড়– দেই নাই।
    কেন?
    প্রত্যেকদিন আমি ঝাড়– দিতে পারবো না; ঘর মোছা, ঝাড়– দেয়া খুব কষ্টের কাজ।
    কষ্টের কাজ তো সবই। দুনিয়াতে আবার আরামের কাজ কোনটা? সগতোক্তির মতো বলতে বলতে ছেলেটি হ্যাঙ্গারে শার্টটা ঝুলাতে গিয়ে থেমে যায়, মাথা ঘুরিয়ে বিস্ময় মাখানো গলায় বলে, একি! জামা দুইটা ইস্ত্রি করো নাই? সকালে না বলে গেলাম।
    মেয়েটি আহত কণ্ঠে বলে, তোমার আর কোনো কথা নাই, সারাদিন পর অফিস থেকে বাসায় আসছো কি আমারে বকা দেওয়ার জন্য?
    আশ্চর্য! বকার কি দেখলা? কথার পিঠে কথা বললাম।
    মেয়েটির মন খারাপ হয়। চুপ করে যায়।
    মেয়েটির নীরবতা দেখে ছেলেটির রাগ লাগে। একটু জোরে কথা বললেই নাকি সেটা বকা। কি আজব মানুষরে বাবা। কথা বলাই বন্ধ করে দিতে হবে।
    মেয়েটি মুখ ঘুরিয়ে বিছানার এক কোণে বসে আছে। ছেলেটি যথাসম্ভব শান্ত গলায় বললো, তুমি তো সারাদিন বাসায়ই থাকো। সামান্য রান্না-বান্না ছাড়াতো তেমন কোনো কাজ নাই। ..একটু না-খাটলে শরীর আরো ফুলে যাবে না? এম্নিতেই বিয়ের পর।
    ছেলেটি কথাটা শেষ করে না, মেয়েটি ঝাঁ করে কঠিন চোখে সরাসরি তাকাতেই ছেলেটি থেমে যায়। প্রচণ্ড রাগ লাগে মেয়েটির, রান্না-বান্না খুব সামান্য কাজ? তাছাড়া সাইনাসের সমস্যার কারণে ধুলাবালি, পানি একটু বেশি লাগলেই ঠাণ্ডা লেগে মাথা ব্যথা শুরু হয়। ছেলেটি এটা জেনেও এমন কথা বলে কীভাবে? মেয়েটি তীক্ষ্ণ কণ্ঠে বলে ওঠে, আমারে বিয়ে করছো কেন? এরচে একটা কাজের বুয়া বিয়া করতা। সব কাজ ঠিকঠাকমতো করে রাখতো।
    কী? ছেলেটির মুখ হা হয়ে যায়। মুখে কথা ফোটে না। হতভম্ব-চোখে বিয়ের আট মাস পরে স্ত্রীকে নতুন করে চেনার চেষ্টা করে।
    ছেলেটির চোখের সামনে মেয়েটি গট গট করে হেঁটে রান্নাঘরে ঢুকে যায়। ধাতব পাত্রের টুং টাং আওয়াজ আসতে থাকে। সেই শব্দে ছেলেটির হুশ্ ফিরে। একটা ছোট্ট নিশ্বাস ফেলে সে বাথরুমে যায় হাতমুখ ধুতে।
    কিছুক্ষণ পর মেয়েটি টেবিলে ঠক করে চা-বিস্কুটের ট্রে রেখে বলে, চা দিয়েছি।
    ছেলেটি তখন অফিস-ব্যাগ খুলে কাগজপত্র বের করছিলো। শব্দটা কানে যেতেই একবার চোখ তুলে তাকায়। টেবিলে ট্রে রাখার শব্দটা আজকে অন্য রকম, ঝামটা মেরে রাগ প্রকাশের মতো।
    মেয়েটি গুটি-পায়ে বিছানার ধারে চলে যায়। একটা ইংরেজি নভেল খুলে বিছনায় উঠে আধশোয়া হয়ে পড়তে শুরু করে।
    ছেলেটি একবার চোখ ঘুরিয়ে মেয়েটিকে দেখে আরেকবার চায়ের ট্রে-টা দেখে, তারপর নিজের কাজে মন দেয়।
    খানিক বাদে মেয়েটি বইয়ে চোখ রেখেই বলে, চা ঠাণ্ডা হয়ে যাচ্ছে।
    খাবো না। জবাবে কৃত্রিম রাগ ছেলেটির।
    বললেই হলো? একটু থেমে মেয়েটি ছেলেটির দিকে তাকায়। ভিতরে ভিতরে একটা দুষ্ট-হাসি নিয়ে মেয়েটি বলে, আমার সাথে মেজাজ খারাপ করো ভালো কথা। চায়ের সাথে মেজাজ দেখানোর কী হলো? খেয়ে নাও তাড়াতাড়ি, ক্ষুধা লাগছে না?
    আমার ক্ষুধা লাগলে কার কী? আমিতো কারো কেউ না। দু চক্ষের বিষ।
    মেয়েটির ভিতরের দুষ্ট-হাসিটা এবার মুখে চলে আসে। বইটা বন্ধ করে ওঠে সে। ছেলটির সামনে দাঁড়ায়। হাত টেনে বলে, আসো।
    ছেলেটি হাত সরিয়ে দেয়, লাগবে না। তোমার চা তুমিই খাও। আমি কে? আমারেতো হ্যায় দেখতেই পারে না।
    মেয়েটি চট করে চোখ বন্ধ করে অন্ধের মতো শূন্যে হাতড়ে বলে, কই, হ্যায় কই? কোথায়? আমি হ্যারে দেখতে পারতাছি না।
    এবার ছেলেটি নিঃশব্দে হেসে ওঠে।
    মেয়েটি চোখ খুলে ছেলেটির চোখে চোখ রাখে। দুজনের ঠোঁটের কোণেই তখন হাসির ঢেউ।

    মেয়েটি ছেলেটিকে বিস্কুট খাইয়ে দিতে দিতে হঠাৎ মনে পড়েছে সুরে বললো, ও, এই শুক্রবারে না বাড়িওয়ালার নাতির জন্মদিনের অনুষ্ঠান হবে। দুপুরে দাওয়াত দিয়ে গেছে।
    তাই নাকি? ..মাসের শেষে এম্নেই টানাটানি তার উপর দাওয়াত। অনুষ্ঠান হবে কোথায়?
    ছাদের ওপরে।
    এতো আরেক ঝামেলা। বাসায় থেকে না গেলে খুব খারাপ দেখাবে।
    হু।
    ছেলেটি চায়ে চুমুক দিয়ে বলে, এক কাজ করলে কেমন হয়, সকালের দিকে বাইরে বেরিয়ে একেবারে বিকাল কাটিয়ে বাসায় ফিরবো। ব্যস অনুষ্ঠান খতম।
    হেঃ হেঃ হেঃ, কোথায় যাবে?
    যাবো কোথাও, যেখানে গেলে তেমন খরচ নাই। চিড়িয়াখানায় যাওয়া যায়।
    তারপর, দুপুরে খাবে কী?
    বাসা থেকে নুডুলস্ রান্না করে আর ডিম সিদ্ধ নিয়ে যাবে। দুপুরের রাজকীয় খানা হয়ে গেলো।
    তা না হয় হলো কিন্তু তার পরের শুক্রবারে যে খালার বাসায় দাওয়াত আছে, সেটা মনে আছে তো? ওইটা কিন্তু বাদ দেওয়া যাবে না।
    উফ্। ছেলেটি হতাশার নিশ্বাস ছাড়ে, সব মুসিবত দেখি এই মাসে। এই মাসে টাকার সমস্যা আর এই মাসেই খালি দাওয়াত আসে।
    খালা দাওয়াত দিছে গত মাসে। আর দাওয়াতটা তুমিই রাখছিলা।
    ছেলেটি চুপ করে যায়। ভেতরে ভেতরে মেজাজ খিচড়ে উঠছে তার। কেন যে বিয়ের পর সব আত্মীয়স্বজন নতুন জামাই-বউকে দাওয়াত দিয়ে খাওয়ানোর প্রতিযোগীতায় নামে! কাউকে না-ও করা যায় না। একটা দাওয়াতে যাওয়া মানেই চার-পাঁচশো টাকার মামলা।

    এই, আসো না, আর কতক্ষণ? মেয়েটি মশারির ভিতর থেকে ছেলেটিকে ডাকে।
    ছেলেটি টেবিলে বই খুলে ক্যালকুলেটার টিপে খাতায় ম্যাথ করছে। মেয়েটির ডাক শুনে একটু বাদে সারা দেয়, এইতো আর দশ মিনিট।
    তোমার দশ মিনিট করতে করতে তো এর মধ্যে আমি থালা-বাসন ধুয়ে ফেললাম, দাঁত ব্রাশ করলাম, মশারি টানালাম। আর তোমার দশ মিনিটই শেষ হয় না।
    আমিতো আর তোমার মতো সারাদিন বাসায় থাকি না, রাতেই যা একটু পড়ার সময় পাই। এখন না পড়লে পড়বো কখন?
    সকালে উইঠা পইড়ো, এখন আসো। বারোটা বাজে।
    সকালে উঠতে দেরি হয়ে যায়, তখন সময় থাকে না। ..আর তুমি ঘুমাও না, তোমার অসুবিধা কী?
    মেয়েটি মুখে বিরক্তি সূচক শব্দ তোলে, লাইট জ্বালানো থাকলে আমার ঘুম আসে না, জানো না?
    উহ্। আচ্ছা ঠিকাছে, দাঁড়াও, এবার সত্যি সত্যি দশ মিনিট।
    মেয়েটি ছোট্ট করে শ্বাস ফেলে। কে জানি বলেছিলো বিয়ের পর স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্ক অনেকটা ভাইবোনের মতো হয়ে যায়। কথাটা একেবারে ভুল না। বিয়ের আগে দুজনে যখন একসাথে ঘোরাঘুরি করতো, কী অদ্ভুত এক ভালো লাগা, বুকের ভিতরে চাপা উত্তেজনা কাজ করতো। হাতে হাত রাখলে, পাশাপাশি শরীরের স্পর্শে, চোখে চোখ রাখায় কী অদম্য আকর্ষণ! আর এখন! পাশাপাশি জড়াজড়ি করে শুয়ে থাকলেও ভিতরে বয়ে যায় শীতল নদী। হাতে হাত রাখায়, ঠোঁটে ঠোঁট রাখায় নেই সেই রোমাঞ্চতা। যেন জানার নেই আর কিছু, সবই বহু-আবিষ্কৃত।
    আচমকা সবকিছু অন্ধকার।
    ছেলেটি বাতি নিভিয়ে মশারির ভিতরে ঢুকলো। মশারি গুঁজে সটান শুয়ে একটা লম্বা শ্বাস ফেলে ছেলেটি।
    মেয়েটি কোলবালিশের মতো ছেলেটিকে জড়িয়ে ধরে। ছেলেটি একটি হাত মেয়েটির পিঠে রাখে।
    একটা গল্প বলো। মেয়েটি বাচ্চাদের গলায় বলে।
    গল্প? ছেলেটি হাসার চেষ্টা করে, তুমি কি বাচ্চা নাকি, তোমারে গল্প বলবো?
    হু, আমি বাচ্চা, বলো গল্প বলো।
    ধুর, আমি গল্প পারি না।
    তাইলে এম্নে কিছু বলো।
    কী বলবো? ছেলেটি ক্লান্ত-শ্বাস ফেলে।
    কী বলবা মানে? আমার সাথে তোমার বলার কিছু নাই? সব কথা শেষ?
    কী বলবো? তারচে তুমি কিছু বলো, আমি শুনি।
    মেয়েটি হতাশ হয়ে শ্বাস ফেলে। মেয়েটি জানে সে কথা বলা শুরু করলে ছেলেটি কিছুক্ষণ জবাবে ‘হু হা’ করবে, তারপর একসময় চুপ হয়ে যাবে। তখন কেবল নিরবচ্ছিন্ন্ নিশ্বাসের শব্দই ভেসে আসবে।
    মেয়েটি ছেলেটিকে নাড়া দেয়, এই আমারে ছায়ানটে ভর্তি করাবা না?
    হু।
    ওদের ফর্ম ছেড়েছে, বুচ্ছ? তাইলে আমি ফর্ম নিয়ে আসবো নে।
    তোমার ইচ্ছা। আমি কি বলবো? ..তবে আমার মতামত কি শুনবা? এই বয়সে এই সময়ে গান শিখতে যাওয়া মানে সময়ের অপচয় করা। ..সবকিছুরই একটা সময় থাকে, তাই না?
    মেয়েটি আহত গলায় বলে, তার মানে তুমি চাও না আমি গানে ভর্তি হই?
    বুকের গভীর থেকে একটি দীর্ঘ নিশ্বাস ছাড়ে মেয়েটি। বিয়ের আগে দেখা সমস্ত স্বপ্নগুলোই একে একে ভেঙ্গে যাচ্ছে চুড়ে যাচ্ছে। নতুন সংসারের নতুন বাসার বারান্দার ছবি সে কতোদিন মনে মনে কল্পনা করেছিলো। আর এ বাসায় যে বারান্দাটা পেয়েছে সেটা না থাকার মতোই। রাস্তার সাথে বাসা হওয়ায় সেখানে প্রতিদিনই রাজ্যের ধুলা জমে। বারান্দায় গিয়ে একটুক্ষণ দাঁড়ানেরও উপায় নেই, রাস্তার লোকজন হাঁ করে তাকিয়ে থাকে। বেলি আর গোলাপের দুটি টব সেখানে রাখা হয়েছিলো। গোলাপ গাছটি একসময় মারা যায় আর বেলিটি মরা ডাল হয়ে এখনো টিকে আছে।
    শুক্রবারে তাদের আর ঘুরতে যাওয়া হয় না। ছেলেটি বলে, সারা সপ্তা বাইরে বেরিয়ে আমি ক্লান্ত, একটা দিন বাসায় রেস্ট নিতে দাও। মেয়েটি মেনে নেয়। যাক, সারাটা দিন ছেলেটিকে তার চোখের সামনে পাবে, ঘুরতে যাওয়ার চেয়ে এই ভালো। তাছাড়া ঘুরতে বেরিয়ে টাকা-পয়সার টানাটানির মধ্যে ফেলে লাভ কী? মেয়েটি খোঁজার চেষ্টা করে বিয়ের পর তার কোন আবদারটা ছেলেটি রেখেছে। কিছুই না, সব শূন্য।
    মেয়েটির দীর্ঘশ্বাসের ঢেউ ছেলেটিকে স্পর্শ করে। ছেলেটি মেয়েটির মাথায় হাত বুলিয়ে বলে, শোনো, সময় বাস্তবতা মানুষকে অনেক কিছু করতে বাধ্য করে। তোমার সাথে আমিও তো বিয়ের পরের সংসার নিয়ে কতো স্বপ্ন দেখেছিলাম, আর আজ, টিকে থাকার সংগ্রামে নেমে সব ধুসর হয়ে গেছে। অর্থ আর সময়ের সংকটের কাছে নগরের মানুষ খুব অসহায়।
    থাক, বাদ দাও এসব কথা, আসো ঘুমাই। মেয়েটি বলে ওঠে।
    ছেলেটি টের পায় মেয়েটির বিরক্তি। কপালে চুমু খেয়ে বলে, জীবনের ওপর হতাশ হও ক্যান? জীবনটা মনের মতো চালাতে হলে চাই সচ্ছ্বলতা। আমরাতো এখন সচ্ছ্বল নই। আমার একার সামান্য ইনকামে কোনোরকম চলে যাচ্ছে। তোমার মাস্টার্স শেষ হলে আর আমার এমবিএ-টা শেষ হলে ভালো চাকরি-বাকরি পেয়ে জীবনটা ইচ্ছেমতো সাজানো যাবে। তখন অনেক স্বপ্নই সহজে পূরণ হয়ে যাবে।
    হুঃ। মেয়েটির কণ্ঠে চাপা শ্লেষ, আমার কি মনে হয় জানো, সচ্ছ্বলতা-অসচ্ছ্বলতার ব্যাপার না, সব মানুষেরই এমন কিছু স্বপ্ন থাকে যেগুলো কখনো পূরণ হয় না, মানুষ জানে ওসব হয়তো কখনো পূরণ হবে না, তবুও মানুষ ওসব পাওয়ার আশা করে, ভেবে সুখ পায়।
    হয়তো তাই। ছেলেটি মেয়েটির কথায় সায় দেয়, থাক এসব ভারি আলোচনা, আসো আমরা ঘুমাই।
    ছেলেটি মেয়েটিকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে। মেয়েটি ছেলেটির কাঁধে মাথা রেখে চোখ বোঁজে। সব স্বপ্ন চোখে নিয়ে দুজনেই তখন ঘুমানোর চেষ্টা করে।

     

    কার্তিক১৪১৩যুগান্তর, নভেম্বর০৬

  • গল্পটি টিউশনি বিষয়ক

    “স্ট্যান্ডার্ড থ্রি, ফাইভ ও বাংলা মিডিয়াম দশম শ্রেণী পর্যন্ত সাতটি টিউশনির জন্য যোগাযোগ করুন।
    জয়। বিবিএ, ঢাবি। ০১৮৯২৮২১৪৮
    (সায়েন্স ব্যাকগ্রাউন্ড আবশ্যক এবং শুধু আজ ৯টা-৭টা পর্যন্ত)”

    শুক্রবারের দৈনিকে আবশ্যক-এ বিজ্ঞাপনটা চোখে পড়লো ছেলেটির।
    রোজকার মতন ‘পেপার’ বলে চেচিয়ে কোলাপসিবল গেটের ফাঁক দিয়ে হকার পেপারটা ফেলে গিয়েছিল। আওয়াজটা কানে ঢুকতেই চেয়ার ছেড়ে তড়াক উঠে দরজার বাইরে উঁকি মেরেছিলো সে : না, উপর থেকে কেউ নিতে আসেনি, এখনো নিচেই পড়ে আছে। বাড়িওয়ালার পেপার, হকার ফেলে যাওয়ার পর প্রায় বিশমিনিট সেটা নিচেই পড়ে থাকে। সুতরাং এই ফাঁকে পেপারটায় চোখ বুলিয়ে আবার আগের জায়গায় রেখে দেয়া যায়, তবে সব সময় সে সুযোগ মেলে না। আবার আটটা থেকে সাড়ে আটটা হলো হকারের আসার সময়, ঘুম থেকে তাড়াতড়ি উঠে ‘পেপার’ ডাকটার জন্য এলার্ট থাকতে হয়, মিস করলেই সেদিন আর পত্রিকা পড়া হয় না। এ-কারণে একদিন পেপার ফেলে যাওয়ার সময় ছেলেটি এদিক-ওদিক তাকিয়ে হকার ব্যাটাকে ফিসফিসিয়ে বলেছিল, ভাই, ‘পেপার’ বইলা কষ্ট কইরা চিল্লানের দরকার কি, এম্নে ফালাইয়া গেলেই তো হয়। জবাবে দাড়িওয়ালা কিস্তিটুপি মাথার হকার কিছু বলেনি, শুধু সন্দেহের দৃষ্টিতে চোখ তুলে তাকিয়েছিল। ছেলেটি নিঃশব্দে দ্রুত পেপার এনে ঘরে ঢুকে বিছানায় বসতে তার ছোটভাইটিও হুমড়ি খেয়ে পড়ে। ...ঢাকার দুই ওয়ার্ড কমিশনার খুন, সাবধান : খাদ্যে বিষাক্ত রং, কাশ্মীর সীমান্তে প্রচন্ড গুলিবিনিময়, আরো নয় জনের লাশ উদ্ধার, ছয় বছরের শিশুকে ধর্ষণ... ইত্যাদি প্রথম পৃষ্ঠার শিরোনামগুলোতে চোখ বুলিয়ে ভেতরের পৃষ্ঠা উল্টায় ছেলেটি। চার নম্বর পৃষ্ঠায় টিউশনির খবর থাকে। আবশ্যক হেডিং এর শেষ বিজ্ঞাপণটা আকর্ষণ করলো তাকে।

    হ্যালো... আজকে অ্যাড দিয়েছেন...। ভেঙে ভেঙে শব্দগুলো উচ্চারণ করে রাশেদ।
    আপনি কোথায় থাকেন?
    আমি কোথায় থাকি সেটা সমস্যা না, টিউশনি যেখানে হোক যাইতে পারবো।
    ফোনের দোকানে রিভলভিং চেয়ারে বসে থাকা বিজুভাইকে আড়চোখে দেখলো রাশেদ। কথা শুনছে কিনা। প্রায়ই তো এমন টিউশনির জন্য ফোন করতে আসে। বিজুভাইর সাথে তার সম্পর্ক ভালো তাছাড়া ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হতে পেরেছে বলে বিজুভাই তাকে সমাদর করে কথা বলে। পারিবারের আর্থিক অবস্থা ভালো না, বর্তমানে টিউশনি নেই বলে খুব দুরাবস্থার মধ্যে আছে এবং বেশিরভাগ ফোনই করে টিউশনি নিয়ে, এসব তার কাছে প্রকাশ করতে চায় না।
    ...আচছা, শ্যাওড়াপাড়ায় সিক্স আছে আড়াই হাজার, বনানীতে এইট আর ফাইভ সাড়ে চার, ধানমন্ডিতে ...
    আপনাদের কন্ডিশন কি ?
    আড়াইশো টাকা মেম্বার ফি আর টিউশনির ফার্স্ট মান্থের ফিফটি পার্সেন্ট...।
    টাকার মাধ্যমে টিউশনি দেয়া হয় এই ব্যাপারটাই রাশেদ জেনেছে ইন্টারমিডিয়েটে পড়ার সময়। এক বন্ধুর কাছে টিউশনি চাইতে বলেছিল। মাখন লালের কাছে যা, টিউশনি পাইলে পরে প্রথম মাসের ফিফটি পার্সেন্ট দিয়া দিবি।
    মানে? রাশেদ অবাক হয়, টাকা দিয়া টিউশনি পাওয়া যায়?
    যাইবো না ক্যান? কোন দুনিয়ায় আছছ তুই? টাকা দিয়া স-ব পাওয়া যায়। অই মাখন ব্যাটার ব্যবসাই তো এইটা, নিজে টিউশনি করায় আর মাইনষেরে টিউশনি দ্যায়।
    মাখন লালকে পাওয়ার একমাত্র উপায় হলো রাত নয়টা সাড়ে নয়টার দিকে বাজারে তার বন্ধুর সাধন ফার্মেসীর দোকানে খোঁজ করা। রাশেদ প্রায় মাসখানিক মাখনের পিছে দৌড়াদৌড়ি করে, সাথে ঘোরাঘুরি করে অবশেষে একটা ভালো টিউশনি পেয়েছিল। তবে চল্লিশের কাছাকাছি ভারি শরীরের ভুঁড়িওয়ালা মাখন লাল খুব সেয়ানা হলেও ধোঁকাবাজ ছিল না।

    ৯ নম্বর বাসে মিরপুর-১ নম্বর কিয়াংসি চাইনিজ রেস্টুরেন্টের কাছে নেমে মুখের ঘাম রুমালে মুছতে মুছতে রাশেদ হাতঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখলো চারটা বাজে। একটু হাঁটতে ফোনে বলা জয়ের ঠিকানানুযায়ী জননী কমপ্লেক্স মিলে গেলো। নিচতলার সরু প্যাসেজে ঢুকে ডানদিকের দুইটি দোকানের পর থাই গ্লাস লাগানো দোকানটি পেয়ে গেলো। কাচের দরজা বাঁদিকে ঠেলে রাশেদ ভেতরে ঢুকতেই দেখতে পেলো : তিন-চারজন চেয়ারের অভাবে দাঁড়িয়ে আছে, ডেস্কের বাঁ-দিকে একটা চেয়ারে বসে ফোনে কথা বলছে ফর্সা এক যুবক, বাঁ-হাতে মোটা সিলভার চেইনের ঘড়ি আর মুঠোতে সিমেন্সের মোবাইল সেট। যুবকটির মুখোমুখি দুটি চেয়ারে দুইজন বসা। দোকানটির দেয়ালের তিনদিকের রেকে থরে থরে সিডি-ডিভিডি সাজানো, একদিকে ফটোস্ট্যাটের কাজ চলছে, তার পাশে একটি কম্পিউটার। ফোনে কথা শেষ হলে যুবকটি রিসিভার রেখেই তার সহজাত কত্রিত্ববোধ নিয়ে বলে উঠলো, ভাই পাঁচ মিনিট পরে আসেন।
    সম্ভবত ওর নামই জয়। রাশেদ বের হয়। বুঝতে পারছে না যুবকটির কথায় তার ব্যক্তিত্বে আঘাত লাগা উচিত কিনা। ঘি রঙের শার্ট গায়ে কালো সু পরা একজনও তার সাথে বেরিয়ে আসে। দেখেই বোঝা যায় রাশেদের মতো একই ধান্ধায় এসেছে। রাস্তার ধারে দাঁড়ায় সে। ভালই হয়েছে অ্যাতো লোকের সামনে টিউশনি নিয়ে আলাপ করতে কেমন অস্বস্তি লাগতো তার। ঘি রঙা শার্টের যুবকটি তার কাছেই দাঁড়িয়েছে, কয়েকবার মুখ ঘুরিয়ে দেখলো তাকে।
    আপনি কি... টিউশনি?
    হ্যাঁ। ঘি রঙা শার্ট পরা যুবকটির সলজ্জ উত্তর।
    এরা ঠিকঠাক মতো টিউশনি দিবে তো, নাকি ভাঁওতাবাজি করবে? রাশেদ সহজ ভঙ্গিতে প্রশ্ন করে, কি মনে হয় আপনার?
    আমি তো সকালে মেম্বার হয়েছি, এখন টিউশনিতে যাবার কথা। ঘি রঙা শার্টের যুবক বলে চলে, ভাঁওতাবাজির দরকার হয়না, সকাল বেলায় দেখলাম এরা কিভাবে টিউশনি আনে..। এই ধরেন, পত্রিকায় পড়াব-তে এ্যাড দেয় বুয়েটে পড়ছি, ইউনিভারসিটিতে পড়ছি, ডাবল স্ট্যান্ড, এক্স ক্যাডেট, ট্যালেন্টপুলে বৃত্তিপ্রাপ্ত ইত্যাদি গাঁজাখুড়ি গল্প। তারপর আপনাকে দিয়েই বুয়েট সাজিয়ে ফোন করাবে, বলেন তবে টিউশনি থাকবেনা কেন?
    দ্বিতীয়বার রাশেদ টিউশনির অভাবে পড়েছিল ইন্টারমিডিয়েট পাশ করার পর। তার আব্বার মুদি দোকানে তেমন বেচাকেনা নাই, সংসারই চলতে চায় না, এর উপর মা অসুস্থ। রাশেদের নিজের খরচটা তো অত্যন্ত নিজেকে চালাতে হবে। আবার সেই মাখন লালের খোঁজে গিয়ে জানতে পারলো : মাখন এদিকে আসেই না, একটা বিধবা মেয়েকে বিয়ে করে বড়ো দাও মেরেছে। এখন ধানমণ্ডিতে থাকে আর ব্যবসা করে। তখন উপায়ান্তর না পেয়ে পত্রিকায় টিউশনির বিজ্ঞাপন দেখে একদিন নীলক্ষেত বাকুশাহ মার্কেটে চলে এলো। সেখানকার মিডিয়া সেন্টারগুলাতে ঢুকলেই প্রথমে একটি ছক-কাটা কম্পিউটারাইজড কাগজ ধরিয়ে দ্যায় যাতে টিউশনি কোন ক্লাসের, বাসা কোথায়, কিসে পড়ছে, কতো দিবে আর সপ্তাহে কয়দিন যেতে হবে তার ফিরিস্তি দেয়া থাকে। বেশ কয়েকটাতে সেদিন ঘুরে ধন্ধে পড়ে গেল, সত্যি সত্যি টিউশনি পাবে তো? একটু রিস্ক তো নিতেই হবে, তাছাড়া দোকান যেহেতু চিটিং করে যাবে কোথায়? পরদিন টাকা নিয়ে এসে ২০০ টাকা মেম্বার ফি আর ফিফটি পার্সেন্ট একহাজার টাকা দিয়ে পাঞ্জেরী টিউশনি মিডিয়া থেকে শুক্রাবাদে ক্লাস নাইনের একাউন্টিং-এর টিউশনি নিলো। অবশ্য নিজেকে তখন তার জগন্নাথের একাউন্টিং-এর ছাত্র বলে মিথ্যে পরিচয় দিতে হয়েছিলো। বিকালে সেই ঠিকানা নিয়ে শুক্রাবাদ এরিয়ায় দুইঘণ্টা খোঁজার পরও বাসা পাওয়া যায়নি। শেষপর্যন্ত অবশ্য সেই মিডিয়া সেন্টারে আসা-যাওয়া করতে করতে জুতার তলি ক্ষয় হওয়ার মাঝপথে একদিন রাশেদ মূলধন উঠাতে পেরেছিলো : এক বিকেলে সেই মিডিয়া সেন্টার গিয়ে দেখে তার মতো আরও কয়েকজন বসে আছে অথচ মালিকের দেখা নেই। সবাই টাকা-পয়সা দিয়েছে কিন্তু কারও টিউশনি মেলেনি। এখন শুধু আজ আসেন কাল আসেন বলে ঘুরাচ্ছে। একেকজনের একেকরকম অভিজ্ঞতা :
    আরে মহাখালি ডি.ও.এইচ.এস-এ আমারে এমন ঠিকানা দিছে যে ঐ ঠিকানার কোনো অস্তিত্বই নাই। মুখে চাপ দাড়িওয়ালা যুবকটি ক্ষোভের সাথে বলে।
    ফোন নাম্বার চান নাই? লম্বা-চওড়া একজন বিজ্ঞের মতো প্রশ্ন করে। চাইছি না আবার? বলছে গার্ডিয়ান খালি বাসার ঠিকানা দিছে।
    আমার টিউশনির অবশ্য বাসা পাইছিলাম। আরেকজন বলতে থাকে, গার্ডিয়ানের সাথে আলাপের পর বলছে, ফোন কইরা জানাইবো। কিন্তু একমাস হইয়া গেলো কোনো খবর নাই।
    এইসব সব অগো সাজানো, ওদেরই কোনো লোকের বাসায় পাঠাইছে। চেয়ারে বসা একজন চেচিয়ে ওঠে।
    ঠিকই বলছেন, এরকম হয়, আমিও শুনছি। তার পাশেরজন সায় দেয়।
    আবার গার্ডিয়ানরাও চালাক আছে ভাইরে, ভদ্রগোছের একজন প্রতিবাদ করে, আমারে মগবাজারের এক টিউশনিতে পাঠাইছিলো। তো যাওয়া মাত্রই ছাত্রের মোটাসোটা মা কম্পিউটার কম্পোজ করা একটা কন্ডিশনশিট বাড়াইয়া দেয়। তাতে পয়েন্ট দিয়ে লেখা :
    ১. কাটায় কাটায় দু’ঘণ্টা করে সপ্তাহে পাঁচদিন পড়াতে হবে
    ২. ঠিক সময়ে আসতে হবে
    ৩. ছাত্রকে মুখে মারা যাবেনা
    ৪. স্কুলের হোমওয়ার্ক পড়িয়ে যেতে হবে
    ৫. অগ্রিম টাকা নেয়া যাবেনা
    ৬. গ্রামে বা বাইরে কোথাও গেলে আগে ছুটির দরখাস্ত...।
    এমনি আরো সব শর্তে পৃষ্ঠা ভর্তি। তাও ভাই, এই টিউশনি-চাকরিতে রাজিই ছিলাম কিন্তু জাম্বুরা মুখের মহিলাটি শেষে বললো, পাঁচ-ছয়দিন দেখবো, ভাল পড়ালে তারপর জয়েন। এই কথা শুইনা না কইরা দিলাম। কথা শেষ করে বক্তা দীর্ঘ করে শ্বাস ফেলে।
    আমি তো বছরখানিক আগে এক মজার টিউশনি করাতাম। কাঁধে চটের ব্যাগ ঝোলানো এক তরুণীর মুখে এবার কথা ফোটে।
    সবাই মেয়েটির কথায় মনোযোগ দ্যায়। বোঝাই যাচ্ছে মিডিয়াতে টিউশনি নিতে এসে সবার তিক্ত অভিজ্ঞতাগুলোই এখন গল্পের বিষয়বস্তু। যেন কষ্টের কথাগুলো বলে বুকটা হাল্কা করছে, পরস্পর সহজ হয়ে উঠেছে।
    এ’ লেভেলের এক মেয়েকে বাংলা পড়াতাম, তরুণীটি বলতে থাকে, সপ্তাহে তিনদিন তিনহাজার। তবে প্রতিমাসে ওই স্টুডেন্টরে একহাজার দিতো হতো। পড়া শুরুর প্রথম দিনই মেয়েটা শর্ত দিয়েছিলো, বেতন পেয়ে প্রতিমাসে আমাকে একহাজার দিয়ে দিবেন, রাজী থাকলে বলেন নইলে আপনার টিউশনি ডিসমিস হয়ে যাবে। এতে অবাক হওয়ার কিছু নেই, আমার অন্য টিচারদের থেকেও এরকম পার্সেন্টেজ নেই। আপনার তেমন কষ্ট নেই, সপ্তাহে তিনদিন আসবেন, কোনোরকম একঘণ্টা থেকে নাস্তা খেয়ে চলে যাবেন।
    বাহ দারুন টিউশনি তো। চাপ দাড়ির যুবকটি উৎফুল্ল হয়, টিউশনির বাসায় নাস্তা নিয়ে আমার এক মজার ঘটনা আছে। এক বড়লোকের বাসায় পড়াইতাম কিন্তু সন্ধ্যায় নাস্তা দিতো না। একদিন পড়ানোর মাঝে বুদ্ধি কইরা ‘একটু আসতাছি বইলা’ বাইরে গিয়া পনেরমিনিট কাটাইয়া আসলাম। তার পরদিনও গেলে স্টুডেন্ট জিজ্ঞেস করলো, স্যার কোথায় যান? একটু অ্যাঁ উঁ করে বলে ফেললাম, সন্ধ্যাবেলা তো একটু চা-টা খেয়ে আসলাম। এরপর থেকা প্রত্যেকদিন নাস্তা দিতো।
    হা-হা-হা। উপস্থিত সবাই বক্তার কথায় মজা পেয়ে হেসে ওঠে।
    দেইখেন, বিড়ালে খাওয়া পায়েস ফালাইয়া না দিয়া টিচাররে খাইতে দিছে এমন ঘটনাও আমি শুনছি। লম্বা-চওড়া লোকটি হাসতে হাসতে দাড়িওয়ালার উদ্দেশ্যে বলে।
    কিছুক্ষণ সবাই চুপ দেখে দাড়িওয়ালা আবার কথা শুরু করে, এইসব মিডিয়াগুলাই কিন্তু আবার চাকরি, পাত্র-পাত্রির ভুয়া বিজ্ঞাপন দ্যায়। মাঝে মাঝে পত্রিকায় দ্যাখেন না, ‘আমেরিকান সিটিজেন পাত্রির জন্য আমেরিকা যেতে ইচ্ছুক পাত্র চাই’ বিজ্ঞাপন? গেলে বলবে তাড়াতাড়ি বায়োডাটা আর ছবি দেন, কোনো কোয়ালিফিকেশন দরকার নেই। মেয়ের গার্ডিয়ান চায় খালি একটা ভালো সৎ নামাজি ছেলে। তারপর শেষে বলবে, আগে আমাদের মেম্বার ফি মাত্র ৫০০ টাকা দিতে হবে। মানুষ তো মনে করে, আমেরিকার নাগরিক হওয়ার সহজ সুযোগ, ৫০০টাকা গেলে যাক।
    হ্যাঁ, এরকম একটা বিজ্ঞাপন দিয়া ২০-২৫ জনের কাছ থেকা ৫০০টাকা কইরা পাইলে তো অনেক। সিগারেটের ধোঁয়া ছাড়তে ছাড়তে একজন মন্তব্য করে, আসলে এইসব সবই ভুয়া, গরিবগো ঠকাইয়া আরো গরিব বানায়।
    এরকম কথা বলতে বলতে ঘন্টা দুইয়ের মধ্যে প্রায় পনেরজন জড়ো হয়ে গেলো, এর মধ্যে একজন ছিলো ঢাকা মেডিকেলের ছাত্র যে তার ফিফটি পার্সেন্ট টাকা আজকে ফেরত না পেলে সে কলেজের সরকারি দলের ছাত্রদের এনে দোকান ভাঙচুর করাবে। সবাই তাকে সমর্থন দিলো, আজকে একটা হেস্তনেস্ত করেই ছাড়বে। উত্তেজিত জনতা একসময় জোর করে দোকানের টেবিলের কাগজপত্র ঘাটলে প্রমাণ হিসেবে পাওয়া গেলো কম্পিউটার কম্পোজ করে বানিয়ে রাখা এক তাড়া ভুয়া টিউশনির শিট। আর যায় কোথায়! উত্তেজিত জনতা তখনই দোকান ভাঙচুর করার সিন্ধান্ত নিলো। হৈচৈ শুনে তড়িঘড়ি মালিক সমিতির লোক এসে ভয়ে আধমরা দোকানের কর্মচারিটিকে পাঠিয়ে তিরিশ মিনিটের ভিতর ওর মালিককে আনালো। মালিক এসে যারা যারা ছিলো পকেট থেকে টাকার বান্ডিল বের করে সবাইকে মেম্বার ফিসহ ফেরত দিলো। টাকার বান্ডিল দেখে রাশেদের মনে হয়েছিলো, মালিক ব্যাটা বোধ হয় আগে থেকেই টাকার যোগাড় রেখেছিলো যেন ব্যাপারটা ঘটবে সে জানতো। পাঞ্জেরী টিউশনি মিডিয়ার টাকা উঠাতে পারলেও রাশেদ কনফিডেন্স মিডিয়াতে যে শুধু মেম্বার ফি দিয়েছিলো সেটা কিন্তু উঠাতে পারেনি।
    চেয়ার দুটো মানুষ তিনজন। রাশেদ আর ঘি রঙা জামার যুবকটি বসতে পেরেছে, অন্যজন দাঁড়িয়ে।
    শ্যাওড়াপাড়ায় একটা ছিল...রাশেদ জয়কে মনে করিয়ে দেয়।
    ওগুলো হয়ে গেছে, কমার্শিয়াল জবাব জয়ের, এখন আপনি বনানীরটা নিতে পারেন।
    ঠিক আছে।...তাহলে কি করতে হবে?
    এই ফর্মটা ফিলাপ করেন। একটা বায়োডাটা গোছের কাগজ বাড়িয়ে দিল জয়।
    ফর্মটায় রাশেদ একবার চোখ বুলালো। বায়োডাটাই বটে। আট নম্বরে ম্যারিটাল স্ট্যাটাস। ঠোঁটের কোণটা নড়ে উঠলো তার, টিউশনি করতে এসে ম্যারেড না আনম্যারেড তাতে কি হবে? কিন্তু ফর্মটা পূরণ করা মানে তো আড়াইশো টাকা দিয়ে মেম্বার হওয়া।
    ..তা ভাইয়া ফিফটি পার্সেন্টের টাকা তো আমি কাল বা পরশু দিতে পারবো। টিউশনি থাকবে তো?
    ওপাশের চেয়ারে বসে থাকা জয় জানায়, কালকে নিয়ে আসেন, কালকেই জয়েন করাইয়া দেই।
    দু’চোখে এখন রাশেদের স্বপ্ন কড়াইতে তেলে ডুবিয়ে মাছ ভাজার মতই ভাজা হতে থাকে : জয় টিউশনি নিয়ে ঘুরাবে না। বিশ্বাস করা যায় কারণ জয় নিজেও ঢাবির ছাত্র। একটা যদি ঠিকঠাক মত পাওয়া যায় তবে আরেকটা নেবে। দুটা থেকে হাজার পাঁচেক টাকার মত আসলে তিন-চার মাসেই সব ধার শোধ করতে পারবে। টিউশনির প্রথম মাসের টাকাটা পেয়েই একজোড়া জুতা কিনবে। জুতাজোড়ার যা অবস্থা! সেদিন তো তার এক ফ্রেন্ড বলেই ফেললো, তোর মোঘল আমলে কেনা জুতাটা এইবার পাল্টা, আর কত দিন পরবি? কেনা দরকার ভাল একটা টিশার্টও।
    এই যে, ভাড়া দ্যান। বাসের কন্ডাক্টর বিরক্তির সাথে রাশেদকে নেড়ে দিল। ভাড়া মিটিয়ে আবার সে ঢেউয়ে ঢেউয়ে ভাবনায় তলিয়ে যায়। প্রায় চারমাস তার টিউশনি নেই। ইনকামও নেই। বন্ধুবান্ধব পরিচিতজন সবার কাছ থেকে ধার নিয়ে এমন একটা অবস্থায় পৌঁছেছে যে, বিপদে পড়লে মানুষ আশেপাশের জনদের থেকে টাকা পয়সার ব্যাপারে যেরকম সাহায্য পায়, সেই সাহায্যের বলয়টিও রাশেদ অতিক্রম করেছে। প্রায়ই সে শুনতে পায় তার সম্বন্ধে অন্যরা অভিযোগ তুলছে : রাশেদকে কোনদিন দেখলাম না দুইটা টাকা খরচ করে...খালি আছে মানুষেরটা খাওয়ার তালে..। কী করতে পারে সে? মাঝে মাঝে ইচ্ছে হয়েছে রাতের আঁধারে একটা ছুরি নিয়ে..।টেনশনে টেনশনে তার পড়া হয়নাপ্রতিদিনই তো পেপারে আবশ্যক-এ টিউশনির এ্যাড দেখে, পছন্দসই হলে ফোন করে, কিন্তু কথাবার্তা বলে আর মন ওঠে না, তাদের একই গান। আপনি অফিসে আসেন, মেম্বার হন..। তাজয়ের এখানে টিউশনি কনফার্ম দেবে কারণ এদের তো আর টিউশনি পেতে সমস্যা হয় নেই। বলতে হবে অমুকখানে পড়ি, এসএসসিতে মার্কস্ ৯২০, এইচএসসিতে.. এক্স ক্যাডেট.. , তা একটু মিথ্যে বললে যদি কাজ হয় অসুবিধা কি রাশেদের?
    এখন দরকার ইমনকে। এইতো কয়েকদিন আগে আরেকটি মিডিয়া থেকে টিউশনি হওয়ার কথা হযেছিল, তখন এই আসন্ন জ্বলোচ্ছ্বাস কে ঠেকাবে? চারদিকে টাকাকড়ির আকাল পড়লে ইমনকে জানালে সমস্যা সমাধান। ছেলেটা বড়লোকের আট-দশটা নন্দদুলালের মত হলেও বন্ধুবান্ধবের টাকা পয়সার সমস্যায় বেশ সাহায্য করে। চারবার রিং হওয়ার পর ওপাশ থেকে রিসভার উঠায় ইমনের মা। বললেন ইমন ঘুমাচ্ছে। রাশেদ জানে তিনি মিথ্যা বলছেন, তাই সভয়ে উচ্চারণ করলো, একটু জাগানো যাবে না? অনুরোধটা শুনে তিনি সঙ্গে সঙ্গে এফ সিক্সটিনের মত গর্জে উঠলেন, না, এবং আর কিছু বলার সুযোগ না দিয়ে খট করে ফোনটা রেখে দিলেন। গলার ঝাঁঝে বিরক্তভাব মাটিতে শিল পড়ার মতো এমনভাবে আছড়ে পড়ছিল যেন তার বড়লোক ছেলেকে বোকা পেয়ে সবাই লুটেপুটে খাচ্ছে, তিনি দু’হাতে তা প্রতিহত করতে চাইছেন।
    রাশেদ একটু দমে গেলেও হঠাৎ করেই ওর আত্মসম্মানবোধটা গোখরোর মত ফনা তুলে দাঁড়ালো। সে কিসে কম? তার মা-র এত গর্ব করার কি আছে ইমনকে নিয়ে? যে ছেলে ম্যাট্রিক পাশ করতে না পেরে ভূয়া সার্টিফিকেট বানায়, কলেজে ভর্তি হয়েছে বলে বাবার কাছ থেকে হাজার হাজার টাকা খসায়, ইন্টারমিডিয়েটের ফল বেরুলে বাসায় বাসায় মিষ্টি বিলিয়ে বলে, দু’টা লেটার সহ ফার্স্ট ডিভিশন। ধিক তার মাকে! ধিক তার মার মিথ্যা গর্বকে! তার তুলনায় ইমন কিছুইনা। ইমনের পক্ষে কখনো সম্ভব না ইউনিভার্সিটিতে পড়া। শুধু টাকার জোরেই বেঁচে আছে ইমনরা, নয়তো ওর মত ছেলে কবেই।
    ঘাই দিয়ে সময় যত বাড়ছে রাশেদের উদ্বিগ্ন মন ততই ঘোলা হচ্ছে। কাল বিকেলের মধ্যে টাকা নিয়ে যেতে হবে ওকে। আজ যদি ওর মা বেচে থাকতো, টাকা যোগাড়ের চিন্তাটা আর করা লাগতো না! বাবার কাছে টাকা চাইবে নাকি? মনে হয়না পাওয়া যাবে, সপ্তাহখানেক ধরে ডালভাত আলুভর্তা ডিম চলছে, টাকা না থাকাটাই স্বাভাবিক। আর এ অভ্যাসটাও তো নেই। ছোটবেলা হতেই কিছু দরকার হলে মাকে বলতো, মা বলতো বাবাকে। মনে মনে ওর কেমন ভয় ছিল বাবার প্রতি। আজ এত বড় হয়েও সেটা কাটাতে পারেনি, ভয় নেই তবুও কেমন অস্বস্তি। মা’টা মরে গিয়ে যেন বেঁচে গেছে, সে তো কিছু হলেই তাকে বলতো, এখনতো বুঝিসনা, মরলে বুঝবি। হ্যাঁ, এখন অনেক কিছুই বুঝেছে রাশেদ, মা’র অভাব হাড়ে হাড়ে শীতের কাঁপন ধরিয়ে দিচ্ছে। মাঝে মাঝে এখন আকাশ ফাঁটিয়ে কাঁদতে ইচ্ছে করে ওর : তুমি ফিরে এসো মা। আমিতো বুঝেছি.., কতদিন মা বলে ডাকিনা, তোমার মতো করে অনেকদিন কেউ বকেনা, বাইরে যাবার সময় তোমার সাবধান বাণী শুনতে পাইনা। অই ঠিকটাক মত যাইছ, আজকে স্বপ্নে খারাপ দেখছি।..মা, মাগো, বাসাটা এখন পাতা ঝরা শীতের শুকনো বৃক্ষের মত নির্জীব, ঘর-দোরে ঝুল পড়ে থাকে, তিন-চারদিন একই জামা পড়ে ময়লা হয়ে যায়। কেউ দেখার নেই। মুনিয়াটাও একা একা থেকে কেমন রোগা হয়ে গেল। মুখটা কত পরিষ্কার ছিল ওর। ঠিক তোমার মত, অথচ দেখ, সারাটা মুখে ওর এখন অসুস্থ মানুষের মলিনতা, ভাতের মাড় গালতে গিয়ে হাতটা পুড়িয়ে ফেলেছে। আঙ্গুলগুলো বুড়ো মানুষের চামড়ার মত খসখস করে। সংসারের সমস্ত কাজ ওকেই করতে হয়। কলেজ যাওয়া প্রায় বন্ধ। আগেতো বুঝিনি মা, তুমি চলে গেলে শুধু আদরটাই না মাথার উপরের খড়সহ সমস্ত কিছুই ঝড়ের মত উড়িয়ে নিয়ে যাবে। সংসারে তোমার প্রয়োজন যে সর্বত্র। ঘর হতে বাহির।
    ইমনের মোবাইলে ফোন করলে কেমন হয়? রাশেদ ভাবলো, কথা বলতে সময় লাগবে, টাকা বেশি লাগবে, তা লাগুক। দিনদশেক আগেইতো ইমন দু’হাজার টাকা ধার দিতে রাজি হয়েছিল। শেষ পর্যন্ত ওই মিডিয়াকে ঠিক রিল্যায়েবল মনে হয়নি বলেই সে টাকাটা নেয়নি। লাভ কি খামাখা নিয়ে, রাশেদের কাছে রাখলে খরচ হতে শুরু করবে। আর সে তো বলেই রেখেছে টিউশনি হলে পরে আবার চাইবে।
    হ্যালো ইমন?
    হ্যাঁ দোস্ত, আমি তো এখন ক্লাবে। স্পোটর্সজোনে। ইমনের ফুরফুরে কণ্ঠ শোনা গেল। ... তোর কি খবর? বাসায় দুইবার ফোন করেছিস! কেন? ..ও টাকা? এখন তো দিতে পারবো না। পরশুদিন কক্সবাজার ট্যুরে যাচ্ছি, একেকজন ছয়-সাতহাজার বাজেট, তোকে কোত্থেকে দেবো।
    কিন্তু আমি যে তোর উপর ভরসা করে ওদের মেম্বার ফি দিয়ে এলাম। ..আচ্ছা কষ্ট করে একহাজার দে।
    তুই বুঝতে পারছিস না, আমার নিজেরই আরো কিছু টাকা দরকার। আমরা সবাই তো ধর ভালো হোটেলে থাকবো, মাল খাবো.. মেয়েছেলে নিয়ে একটু.., তারপর দশদিনে প্রচুর খরচ পড়বে, বুঝিস না?
    ও আচ্ছা, গলায় স্বর ফোটে না রাশেদের, কী আর করা, থাক।

    জুলাই ২০০২। প্রকাশ : সংবাদ, ৬ জুলাই ২০০৬

  • কথার ব্যবসায়ী

    কম্পিউটারে একটা থ্রি-এক্স ছেড়ে বিছনায় এসে বসে মিরাজ। বলে, দ্যাখ, নতুন জিনিস আনছি, মজা পাবি দেইখা।

    মিরাজের ঘরে এসি লাগানোর পর আজকে প্রথম এসেছে সাদমান। এসির হিম বাতাসে পাঁচ মিনিট থেকেই শরীর ঠাণ্ডা হওয়ার পর এখন গায়ে কাঁথা-জড়ানো শীত লাগছে। এসি লাগানো উপলক্ষে ঘরটার চেহারা-সুরতও আচানক পাল্টে গেছে। ফ্লোরে দামি কার্পেট, দেয়ালে পড়েছে ডিসটেম্পার, আর লাখখানিক টাকা দামের কম্পিউটার তো আগেই ছিলো।
    তোগো এইসব বড়লোকি কাণ্ডকারখানা দেইখা আমগো মজা বাইরায় ...অই জাগা দিয়া, শালা! কথাটা সাদমান মনে মনেই রেখে দ্যায়। মুখে অস্বস্তির প্রলেপ থিরথিরিয়ে কাঁপলেও চোখ রাখে মনিটরের ওপর। বড়লোকের ছাওয়াল তো, এইসব ছাড়া চলে না। বিএ ভর্তি হইতে না হইতেই রহস্যে ভরা প্রাচীন পৃথিবীর মতোই সেক্স নামক আদিম বিষয়টা এখন ওর কাছে ডাল-ভাত। বাসার কিশোরি কাজের মেয়েদের পটাতেও বাছাধন একেবারে সিদ্ধহস্ত।
    তুই শটকাটে লাখপতি হইতে চাস? হঠাৎ মনিটর থেকে মুখ ঘুরিয়ে সাদমানের কাঁধে একটা মৃদু চাপড় দিয়ে মিরাজ জিজ্ঞেস করে।
    মিরাজের প্রশ্ন শুনে সাদমান ঠোঁেটর কোণে অলস হাসির রেখা তৈরি করে, বড়লোক হইতে কে না চায়!
    একদম ঠিক!
    মিরাজের মুখ থেকে বিজিএন-র কথা জানতে পারে সাদমান। কী এক কানাডিয়ান কোম্পানি, খালি দুই-তিনজন ঢুকাইতে হয়, তারপর সপ্তায় সপ্তায় টাকা। এ ব্যবসা করছে এমন একজনের মোবাইল নম্বরও দিয়ে দ্যায় তাকে। যাওয়ার সময় সাদমান আচমকা জিজ্ঞেস করে বসে, আচ্ছা তুই এ ব্যবসা শুরু করছ না ক্যা?
    আমি? আমি এহন ব্যবসা কইরা কী করমু? টাকার কি অভাব পড়ছে নাকি!
    শালা কইলেই পারো তোমার বাপে রাজি হইবো না। মনে মনে গজরায় সাদমান। ব্যাংকের থেকা ১৫ বছর আগে যে লোন নিয়া তোমার বাপ পাঁচতালা বাড়িটা বানাইছে ওই লোনই তো শোধ করে নাই। মিরাজের মতে সরকারি ব্যাংকের এইসব লোন নাকি শোধ দেওয়া লাগে না, ওপর থেকা কালেভদ্রে চাপ আসলে দান-খয়রাতের মতো তখন কিছু ঘুষ ছিটাইয়া দিলেই সব চুপ হইয়া যায়।

    মিরাজের বাসা থেকে বের হয়ে হাঁটতে হাঁটতে সাদমানের মনে হলো, এই পড়ন্ত বিকেলে একবার সাথির বাসায় ঢুঁ মারবে কিনা। কিন্তু যাওয়া কি ঠিক হবে? এই সপ্তায় তো একবার গিয়েছে। বেশি বেশি গেলে আন্টি যদি আবার সন্দেহ করে! গেলে অবশ্য চিঠির উত্তরটা পাওয়া যেতো। সাথির মা-ভাইয়ের চোখ এড়িয়ে ইদানীং চিঠি চালাচালির ভালো একটা উপায় বাতলানো গেছে। মাধ্যমটা গল্পের বই দেওয়া-নেওয়া। বইয়ের একেবারে শেষ পৃষ্ঠাটা হালকা আঠায় আটকে তার ভিতরে চিঠিটা ঢুকিয়ে দেয়।
    সবাই জানে সাদমান আর সাথি বন্ধু। বছর পাঁচেক আগে যখন সাদমান ও সাথিরা একই বাড়িওয়ালার বাসায় ভাড়া থাকতো তখন সম্পর্কটা বন্ধুত্বেরই ছিলো। সাথিদের আর্থিক অবস্থার বেসম্ভব উন্নতি ঘটতে থাকলে ওরা এলাকার ভিতরেই একটি বড়ো ফ্ল্যাটবাড়িতে উঠে যায়। মুশকিলে পড়ে যায় সাদমান কারণ তখন উপলব্ধি করে তাদের অজান্তেই দুজনের সম্পর্কটা ততদিনে অন্যদিকে মোড় নিয়েছে। এখন পর্যন্ত তাদের ব্যাপারটা কেউ না জানলেও সাদমান খুব ভয়ে থাকে। যদি কখনো জেনে ফেলে! তাহলে তো সাথির সাথে তার দেখা হওয়া লাটে উঠবে। আবার একটি ব্যাপারে সাদমান ক্রমে উদ্বিগ্ন হচ্ছে। সাথির বাবার ব্যবসা যেভাবে ফুলেফেঁপে উঠছে, আর্থিক উন্নতি বাড়ছে তাতে ভবিষ্যতে তার সাথে বিয়ে দিতে রাজি হবে তো? সাথির বিয়ে হতে এখনো তিন-চার বছর। এর মধ্যে আর্থিকভাবে তাকে একটা ভালো অবস্থানে আসতে হবে। এর জন্য এখন থেকেই তোড়জোর। পড়াশুনার পাশাপাশি ছোটোখাটো ব্যবসাপাতি শুরু করতে হবে। ব্যবসা ছাড়া যে বড়লোক হওয়া যায় না, সেটা তো তার চোখের সামনেই দেখতে পেলো। সাদমানের বাবা সরকারী চাকুরে আর সাথির বাবা ব্যবসায়ী। একই বাড়িওয়ালার বাসায় যখন ভাড়া থাকতো তখন সাথিদের অবস্থ্া বলা যায় তাদের চেয়েও খারাপ ছিলো আর এখন ওরা কোথায় চলে গেছে! সুতরাং বড়লোক হতে হলে ব্যবসা করতে হবে এবং সেটা এখনই শুরু করতে হবে। সাথিকে যে তার পেতেই হবে।

    দুই.
    ফোন করে পরদিনই সাদমান নতুন দেশ আবিষ্কারের উত্তেজনা নিয়ে চলে যায় গুলশানের বিজিএন অফিসে। লিফটে চড়ে সাত তলার অফিসে ঢুকতেই চোখ ছানাবড়া। ভেতরে এলাহি কাণ্ড। ফ্লোরে চকচকে টাইলস আর সিলিং-এ ফিট করা দুর্বাঘাসের মতো অসংখ্য আলোর প্রতিফলন তাতে; ঢোকার মুখেই অনিন্দ্য সুন্দরী রিসিপশনিস্ট, খুচরো পয়সার মতো অকাতরে সবাইকে বিলানো তার হাসির ধরণ দেখে মনে হয় একটু চেষ্টা করলেই ভাব জমানো সম্ভব। মাঝখানে একটি বড় ও চারপাশে কয়েকটি ছোট রুম। সবগুলোতেই ঢোকার মুখে কাচের দরজা। লেবুর সুগন্ধিযুক্ত রুম-স্প্রে ছড়ানো বাতাস নাকে ঢুকে যে কাউকে এখানকার আবহাওয়ায় সম্মোহিত করে ফেলবে। শালা, এর জন্যই গুলশান-বনানীরে কয় বড়লোকি পাড়া!
    মোবাইলে আলাপ হওয়া মাহমুদ নামের একজন সাদমানের অপেক্ষায় বসে ছিলো। যদিও কেউ কাউকে চেনে না, কিন্তু সাদমানের অনুসন্ধানী চোখ দেখে ২৫-২৬ বছরের এক যুবক এগিয়ে এলো। আপনি তো সাদমান, না?
    জি।
    আমি মাহমুদ। বলে সাদমানের দিকে হাত বাড়িয়ে দ্যায়। একবারে ঠিক সময় আসছেন, এখনই নতুন সেমিনার শুরু হবে।
    হাত না ছেড়েই মাহমুদ তাকে হাল্কা টেনে পাশের বড় রুমটাতে নিয়ে আসে। আলোকোজ্জ্বল রুমটাতে সার দিয়ে চেয়ার রাখা। জনা পঞ্চাশেক বসার ব্যবস্থা। কয়েকটি ছাড়া প্রায় সবগুলোই ভর্তি। এদের মধ্যে আট-দশজন মহিলাও আছেন। একেবারে সামনের সারির একটা সিটে ব্যাগ রাখা ছিলো, মাহমুদ সেটি হাতে নিয়ে তাকে বসিয়ে দিয়ে সহাস্যে আশ্বস্ত করে, এখনই শুরু হয়ে যাবে, সেমিনারটা দেখে নেন, তারপর সব কথা হবে, আমি বাইরে অপেক্ষা করতেছি।
    মাহমুদ চলে গেলে সমাদমান ঘাড় ঘুরিয়ে চারপাশে তাকায়। ক্লাসরুমের মতো একেবারে সামনে একটি হোয়াইট বোর্ড। রুমটা খুব ঝকঝকে তকতকে। সবাই নিচুস্বরে কথাবার্তা বলছিলো। সাদমানের মনে হলো সবার কথা বলার বিষয়বস্তু একই।
    একটু পরেই সাদা শার্টের ওপর টাই পরা মধ্যবয়সী এক লোক ঘরে ঢুকে সবার সামনে চলে আসে। দেয়ালে ঝুলানো হোয়াইট বোর্ডের সামনে রাখা স্টিক হাতে দাঁড়িয়ে সকলের ওপর সেনা অফিসারের দৃষ্টি ফ্যালে। গুঞ্জন হঠাৎ প্রায় থেমে যায়। লোকটি গলা ঝেড়ে বলতে শুরু করে, অ্যাটেনশন প্লিজ। আমি সালাউদ্দিন জমাদার। সেমিনার শুরু করছি। কথা বলার মাঝখানে কেউ প্রশ্ন করবেন না। কথা শেষ হলে আমি নিজেই আপনাদের প্রশ্ন করার সুযোগ দেবো।
    তারপর পান খাওয়া রঙিন দাঁতের সালাউদ্দিন জমাদার মুখে আর বোর্ডে লিখে যা বুঝালো তার সারসংক্ষেপ হলো : নেটওয়ার্ক মার্কেটিং আমাদের দেশে নতুন হলেও বিশ্বে এটি নতুন নয়। একটা পণ্য উৎপাদনের পর ভোক্তার কাছে পৌঁছাতে গতানুগতিক পদ্ধতিতে কী করা হয়? উৎপাদনকারী- এজেন্ট-পাইকার-খুচরা-ভোক্তা। কিন্তু নেটওয়ার্ক পদ্ধতিতে হলো উৎপাদনকারী-নেটওয়ার্ক-কোম্পানি-ভোক্তা। এতে পণ্যের বিজ্ঞাপন খরচ, শোরুমসহ অন্যান্য খরচ ও মধ্যসত্ত্বভোগীদের প্রয়োজন হয় না, অতএব এই খাতে যে খরচটা হতো তা পাচ্ছে নেটওয়ার্ক কোম্পানি ও কর্মীদল। নেটওয়ার্ক মার্কেটিং পদ্ধতি ১৯৪০-৪১ সালে প্রথম প্রবর্তন করেন আমেরিকান ফুড-কেমিস্ট ড. কার্ল রেইন বোর্গ। ১৯৫৮ সালে আমেরিকান পার্লামেন্টে এই পদ্ধতি ১০ ভোটের ব্যবধানে অনুমোদন লাভ করে। সারাবিশ্বে ১২৫টিরও বেশি দেশে এ পদ্ধতি ব্যবহৃত হচ্ছে। মালয়েশিয়ায় নেটওয়ার্ক মার্কেটিং-এর সূচনা হয় ১৯৭২ সালে, হাঙ্গেরিতে ১৯৯২ ও জাপানে ১৯৯৩ সালে। পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতে শুরু হয় ১৯৯৭ সালে। সেই হিসাবে আমারা ভাগ্যবান কারণ ভারত থেকে আমরা ৫০ বছর পিছিয়ে থাকলেও মাত্র ২ বছরের মধ্যে এই ১৯৯৯ সালেই বাংলাদেশে নেটওয়ার্ক মার্কেটিং চলে আসছে।
    বিজিএন-এ ঢুকতে হলে প্রথমে ৭,৫০০টাকা দিয়ে একটা পণ্য কিনতে হবে। এ কোম্পানির কয়েক ধরনের পণ্য আছে, যার যেটা দরকার সে মতো কিনলেই এখানকার মেম্বার হওয়া যায়। তারপর আরো দুজন যোগাড় করে পণ্য কিনাতে হবে। তাহলে ফাস্ট লেভেল ফিলআপ হয়ে গেলো, সাথে সাথে পাওয়া যাবে ১,৫০০টাকা। পরে নিচের দুজন যখন আরো চারজনকে তাদের আন্ডারে ঢুকাবে তখন সেকেন্ড লেভেলে পাওয়া যাবে ৩,০০০, থার্ড লেভেল সম্পন্ন হলে ৪,৫০০টাকা। এইভাবে নিচের হ্যান্ডরা যত কাজ করবে, উপরের জন বসে বসে তার কমিশন পেতে থাকবে।

    সেমিনার শেষ হলে মাহমুদ এসে সাদমানকে নিয়ে বের হতে হতে জানতে চায়, কী, মনের মধ্যে নিশ্চয়ই অনেক প্রশ্ন খুত খুত করছে?
    সালাউদ্দিন জমাদারের কথাগুলো সাদমানের মনের মধ্যে কেবলই ঘুরপাক খাচ্ছিলো, ভেতরে ভেতরে বেশ উত্তেজনাও কাজ করছে, কিন্তু ব্যাপারটা কেমন ধোয়াশা লাগছে। মাহমুদের প্রশ্নটা শুনে সাদমান অল্প হেসে সায় দেয়, হ্যাঁ, বিষয়টা পুরাপুরি ক্লিয়ার না।
    সব বুঝবেন কোনো অসুবিধা নাই।
    সেমিনার রুমের বাইরে ডানদিকে খানিকটা জায়গা, সেখানে ছোটো ছোটো বেশ কটি টেবিল এবং প্রায় প্রতিটি টেবিলই এক-দুইজন দখল করে আছে। সেমিনার-ভাঙা লোকজন অনেকেই তাদের মতো সেদিকে যাচ্ছে। একটি টেবিলের সামনে এসে রিভলভিং চেয়ারে বসে থাকা লোকটিকে মাহমুদ বলে, প্রকাশদা, এই আমার গেস্ট সাদমান, ওনাকে ফিনিশিং-টা দিয়ে দ্যান।
    সাথে সাথে প্রকাশ উঠে দাঁড়িয়ে মুখে হাসি ছড়িয়ে সাদমানের দিকে হাত বাড়িয়ে দ্যায়। সাদমানও হাত বাড়িয়ে পরিচিতি পর্ব সারে। সাদমান আশেপাশে তাকিয়ে খেয়াল করলো ইতোমধ্যেই তার মতো সেমিনার-ফেরত মানুষ দুই-তিনজন করে কারো না কারো টেবিলে বসে পড়েছে এবং কাগজের ওপর কী সব আঁকিবুকিঁর ওপর গভীর মনোযোগে লক্ষ্য করছে। এই টেবিলে সে-ই কেবল একা।
    তারপর সাদমান সাহেব, কেমন লাগলো সেমিনার? প্রকাশদা হাসিমুখে জানতে চায়।
    ভালো, তবে কিছু প্রশ্ন আছে।
    প্রশ্ন তো থাকবেই আর তার জন্য তো এ অধম আছেই।
    এরপর প্রকাশদা কাগজ-কলম নিয়ে আঁকিবুকিঁ শুরু করে একটার পর একটা প্রশ্নের উত্তর দিয়ে সাদমানের যাবতীয় জিজ্ঞাসা-কৌতূহল-অস্পষ্টতা মিটিয়ে দিতে লাগলা : বিজিএন গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার হতে নিবন্ধনকৃত, সরকারি দলের দুইজন মন্ত্রিরও এতে শেয়ার আছে, অতএব ভূয়ামি করার সুযোগ নাই। আর নেটওয়ার্ক ব্যবসা তো পশ্চিমা দেশগুলাতে ব্যাপক জনপ্রিয়, আপনি ইন্টারেনেটে একটু খোঁজখবর নিলেই জানতে পারবেন। বসে বসে এতো টাকা কীভাবে পাবেন? আরে এটা তো হলো কমিশন। ধরেন, আপনি দোকান থেকে একটা টিভি কিনবেন দশহাজার টাকায়, সেই একই টিভি যদি আমাদের এখান থেকে কিনেন, তাহলে সেটার দাম পড়বে অনেক কম। কারণ কি? কারণ ওদের বিজ্ঞাপন খরচ আছে, আমাদের নাই। আপনি একটি পণ্য কিনে এখানে মেম্বার হয়ে আরো দুজনকে যখন সেই পণ্য কিনাবেন তখন আপনি সেই বিজ্ঞাপন খরচের কমিশনটা পাবেন। এই কমিশন কিন্তু শুধু আপনি না, আপনার ইমিডিয়েট ওপরে যে আছে সে পাবে, তার ওপরে যে আছে সে পাবে, তার ওপরে। এইভাবে অনেক দূর। একটা নির্দিষ্ট স্তর পর্যন্ত পাবে। আপনি একজন যোগাড় না করতে পারলে কী হবে? ধরলাম, আপনি রাইট হ্যান্ডে একজন ঢুকালেন কিন্তু লেফট্ হ্যান্ডে কাউকে ঢুকাতে পারলেন না, তাতে কি হলো? আপনার লেভেল ওয়ান পূর্ণ হলো না আর আপনি টাকাও পাবেন না, তাই তো? সেই ক্ষেত্রে আপনি যদি একেবারেই আরেকজন ঢুকাতে ব্যর্থ হন তাহলে আপনার ওপরে যারা আছে তারাই আপনার আন্ডারে একজনকে দিয়ে দেবে। কারণ, এই একজনের জন্য যেমন আপনার ফাস্ট লেভেল পূর্ণ হচ্ছে না, আপনার ওপরের জনের তেমনি সেকেন্ড লেভেল, তার ওপরের থার্ড লেভেল। এইভাবে সবারটা আটকে যায়। তাদের স্বার্থেই তারা আপনাকে সাহায্য করবে। এইবার বুঝলেন তো? এটা আসলে একটা টিম ওয়ার্ক।
    কথা শেষ করে প্রকাশদা একটা স্বস্তির শ্বাস ফেলে পিঠটা চেয়ারে হেলিয়ে দ্যায়।

    তিন.
    সাদমান মাকে বোঝানোর চেষ্টা করছিলো, আরে মা, তুমি বুঝতে পারতাছো না, এটাতে কোনো রিস্ক নাই। খালি দুইজন ঢুকাইয়া দিলেই হইলো। তারপর বইসা বইসা টাকা পাওয়া যাইবো।
    মা তরকারি কুটতে কুটতে মাথা না তুলেই উত্তর করে, হো! ওগো আর খাইয়া-দাইয়া কাম নাই, তোরে বসাইয়া বসাইয়া টাকা দিবো!
    আহা, তোমার মাথায় তো দেহি কিছুই ঢোকে না। শোনো, এই ব্যবসা লন্ডন আমেরিকাতে অনেক আগেই চালু হইছে, আমগো দেশে নতুন দেইখা মানুষ বোঝে না। আর তোমার বুইঝা কাম নাই, তুমি এখন সাড়ে সাতহাজার টাকা আমারে ধার নিয়া দেও।
    আমি কারতে ধার নিমু?
    কেন ফুফুরতে নিয়া দেও। কইলাম তো দুইমাসের মধ্যেই টাকা শোধ দিমু। সাথে একটা টিভিও উপহার দিয়া দিমু, কই-ও।

    সেমিনার করে আসার তিনদিন পর সাদমান আবার বিজিএন অফিসে ঢুকলো। ক্যাশ কাউন্টারে সাড়ে সাত হাজার টাকা জমা দিয়ে ঠোঁটের ফাঁক গলে তার হাসি চুইয়ে এলো। এই অফিসের এখন একজন গর্বিত মেম্বার সে। মেম্বার হওয়ার পর অনেকের সাথে তাকে পরিচয় করিয়ে দেওয়া হলো। অফিসটা তখন একটু একটু করে তার নিজের মনে হতে লাগলো। মানুষকে সেমিনার দেখতে ইনভাইট করে সাদমান এখন বলতে পারবে, অফিসে আইসেন। সে যার নিচে ঢুকেছে তার নাম বিকাশ। তার রাইট হ্যান্ড সে, বিকাশের ওপরে আছে আরেকজন, তার ওপরে হচ্ছে মাহমুদ, মাহমুদেরও দুই লেভেল ওপরে হলো প্রকাশদা, আর একদম উপরে যে লোকটি বসে আছে অর্থাৎ তাদের গ্রপ লিডারের নাম হচ্ছে মুকুল। সে হিসেবে তারা হলো মুকুল গ্রপ।
    প্রকাশদা সাদমানকে সেদিনই দুই ঘণ্টার একটা শর্ট কোর্স দিয়ে দিলো। তাতে বিজিএন সম্বন্ধে যাবতীয় তথ্য, কীভাবে মানুষের সাথে কথা বলতে হবে, মানুষকে অফিসে এসে সেমিনার দেখতে বলার অ্যাপ্রোচটা কেমন হবে, নেটওয়ার্কিং কোম্পানি নিয়ে লোকে উল্টাপাল্টা কথা বললে রেগে যাওয়া চলবে না, ধৈর্য ধরে বুঝাতে হবে, কারো সাথে কথোপকথনের সময় কথা বলতে হবে এমনভাবে যাতে না-বোধক উত্তরটিকেও হ্যাঁ-বোধক বলানো যায়। সবশেষে প্রকাশদা সাদমানকে একটা দারুন কথা বলে ফেললো, বলেনতো সাদমান সাহেব, এখন দুনিয়াটা চলছে কীসের ওপরে? হে হে, পারলেন না? মুখের জোরে। কথার জোরে, অশ্লীল করে বললে বলতে হয় চাপার জোরে। কথা দিয়া যে কাউকে ইমপ্রেসড্ করা যায়, তবে হ্যাঁ, সে গুণটা অর্জন করতে হবে। যার টাকা-পয়সা নাই জীবনে ওপরে ওঠার তার সবচে বড়ো মূলধন কি জানেন? মুখ, এর আরেক নাম মানুষ বলে তেল। চলতে-ফিরতে-ঘুরতে। যেকোনো কাজে এইটাকে যে সফলভাবে ব্যবহার করতে পারে, কাজ শুরুর আগেই তার কাজ হাফ-ডান হয়ে যায়। বুঝলেন, সাদমানের পিঠে আলতো চাপড় মেরে প্রকাশদা বলতে থাকে, সফল হওয়ার আপনারে একটা দারুন টেকনিক শিখায়া দিলাম, এটার দাম লাখ টাকা। এ বিষয়ে ডিগ্রি অর্জন করতে চাইলে কিছু পড়াশুনাও করতে পারেন।
    ডিগ্রি? সাদমান অবাক হয়ে বলে ওঠে।
    হ্যাঁ, ডিগ্রি। সবার আগে পড়বেন। হরপ্রসাদ শাস্ত্রীর তৈল প্রবন্ধটা, তারপর ডেল কার্নেগি, এরপর আরো পড়তে চাইলে বই অনেক আছে। হ্যাঁ, যা বলছিলাম, আমাদের কাজটাকে যদি ব্যবসা ধরা যায়, তাহলে সাদা কথায় বলতে হবে আমাদের হচ্ছে কথার ব্যবসা।

    চার.
    সাদমান জোরকণ্ঠে বলে ওঠে, আরে ব্যাটা শোন, এর মতো সহজ ব্যবসা আর আছে বাংলাদেশে? কোনো কামই নাই, খালি নিজে ঢুইকা আর দুইজন ঢুকাইয়া দিয়া সারাজীবন বইসা বইসা খাও।
    কছ কি? তুই তো শালা তাইলে কয়েকদিনেই বড়োলোক হইয়া যাবি। মাসুদ বলে।
    হা হা হা। মাসুদের কথা শুনে শংকর হেসে ওঠে।
    শোন, শংকর হাসির রাশ টেনে ধরে সাদমানকে বলে, তোর এই যে বিজিএন না ফিজিএন নেটওয়ার্কিং ব্যবসা, তুই এইটারে ব্যবসা কছ কোন হিসাবে আমি তো এইটাই বুঝতাছি না। এটা তো উৎপাদনমুখী কিছু না। ধর, একসময় দেখা গেল বাংলাদেশের সব মানুষ তোদের বিজিএনের সদস্য হইয়া গেল, তখন তোগো ব্যবসায় নতুন সদস্যই তোরা কই পাবি আর বসাইয়া বসাইয়াই বা খাওয়াবি কেমনে, হু?
    আরে ভাই, এখানে তো পণ্য বিক্রি করতাছে, পণ্যের চাহিদা তো মানুষের শেষ হইবো না। সাদমান শংকরকে বুঝাতে চেষ্টা করে।
    দ্যাখ, আমারে ভোদাই পাইছস? মনে করছস ভুং ভাং দিয়া বুঝায়া দিবি? আরে বাবা পণ্য দিয়াই যদি ব্যবসা করবো, তাইলে রাস্তাঘাটে যে শো-রুমগুলা আছে, ওগুলা কি দোষ করছে? কই ওরা তো এই ব্যবসা শুরু করে নাই।
    ঠিক। মাসুদ মাথা ঝাকিয়ে সায় দেয়।
    আর বিজিএন যদি পণ্যের ব্যবসাই করবো তাইলে তোগো পণ্য কই? খালি ওই টিভি আর ব্লেন্ডার? এ দুইটা দিয়াই মানুষের সকল পণ্যের চাহিদা মিটবো?
    হা হা হা। মাসুদ শংকর দুজনেই ঠা ঠা করে হেসে ওঠে।
    বোল্ড হয়ে যাওয়া ব্যাট্সম্যানের মতোই এবার অসহায় বোধ করে সাদমান। তবু আমতা আমতা করে জবাব দেয়, আরে বাবা, আস্তে আস্তে পণ্য বাড়বো।

    প্রকাশদা’র কথামতো সাদমান আত্মীয়, প্রতিবেশী, বন্ধু-বান্ধব, পাড়াত ভাই, অল্প পরিচিত। এরকম প্রায় তিরিশ জনের নাম নিয়ে একটা লিস্ট করেছে। কিন্তু ভুলটা করেছে শুরুতেই, শংকর, মাসুদসহ আরো কয়েক বন্ধুকে সে নিজেই নেটওয়ার্ক মার্কেটিং বোঝাতে গিয়ে ব্যর্থতার পরিচয় দিয়েছে। প্রকাশদা অবশ্য আগেই পই পই করে বলে দিয়েছিলো, আপনি যেহেতু এখন নতুন কাউকে বোঝাতে যাবেন না, এখন আপনার কাজ হলো যাদের নাম লিস্ট করছেন তাদের একে একে সেমিনার দেখতে নিয়ে আসা। তারপর আমার কাছে ছেড়ে দিবেন, ব্যস কাজ খতম। শোনেন, মানুষকে বলার মধ্যেও টেকনিক আছে, বুঝলেন? আপনি বলবেন, একটা পার্ট-টাইম কাজ আছে, সপ্তাহে ইচ্ছামতো চার-পাঁচ ঘন্টা কাজ করলেই মাসে চার-পাঁচ হাজার কামানো যায়। শুনে লোকটি নিশ্চয়ই খুব আগ্রহী হবে? তখন বলবেন, কাজটা বুঝতে হলে একদিন অফিসে যেতে হবে। ব্যস, হয়ে গেলো।
    পার্ট-টাইমের কথা বলাতেই কাজ হলো। প্রথমবার এলাকার দুইজনকে সেমিনার দেখাতে নিয়ে গেলো সাদমান। সেমিনারের পর যথারীতি প্রকাশদার অসাধারণ ফিনিশিং। কিন্তু তাতেও কাজ হলো না। রাসেল ভাই চালাক মাল। ওনাকে দিয়ে তেমন আশা করে নি সাদমান, কিন্তু বাবুটাতো বোকা টাইপের, ওকে ভালোমতো বোঝালে কাজ হবে ভেবেছিলো।
    আচ্ছা, আমি ঢুকে যদি দুইজনরে না ঢুকাইতে পারি তাইলে তোমরাই তো আমার লোক ঠিক কইরা দিবা, না? বাবু জানতে চায়।
    হ্যাঁ, তুমি না পারলে তো আমাদের সুবিধার জন্যই তোমার নিচে লোক দিতে হবে। সাদমান দ্রুত বলে।
    বাহ, সিস্টেমটাতো খুবই ভালো। আমার পছন্দ হইছে।
    বাবুর কথা শুনে সাদমানের চোখ চকচক করে ওঠে।
    কিন্তু... সমস্যা হইলো, এতো টাকা পাবো কোথায়? এক কাজ করো না, আমারে সাড়ে সাতহাজার টাকা ধার দাও। এখান থেকে টাকা পাইলে তারপর দিয়া দিবো।
    শুনে সাদমান দমে গেলো। এ ধরনের সরল রসিকাতা যে বাবু বোকাটাই প্রথম করলো তা নয়, এর আগেও একজন করেছে।
    আরো পরেও কয়েকজন তাই করলো। কয়েকজন আবার বললো, দুইজন আগে ঠিক কইরা নেই তারপর ঢুকবো।
    সাদমান হতাশ হয়ে পড়লো। দেখতে দেখতে তেরো জনকে সেমিনার দেখিয়ে ফেলেছে সে। কিন্তু কারো মধ্যে কোনো সম্ভাবনা দেখা যাচ্ছে না। আর এদের মধ্যে যে দুজন ঢুকতে ইচ্ছুক ওদের টাকা নেই। তখন সিদ্ধান্তটি নিয়ে নিলো সাদমান। কাজে নেমে পিছু হটা তার স্বভাব না, একটা হেস্তনেস্ত করে ছাড়বে সে। মাকে বহুত বলে-কয়ে, শীঘ্র টাকা পাবার সম্ভবনা দেখিয়ে খালার কাছ থেকে আরো সাড়ে সাতহাজার টাকা ধার করে ফেললো। বন্ধু মেহেদিকে সেই টাকা দিয়ে ঢোকালো। মেহেদির সাথে অনেক মানুষের পরিচয়, কতৃত্বপরায়ণ এবং কিছুটা ফাজিল টাইপের ছেলে হলেও ও ভালো কাজ করতে পারবে বলে সাদমানের বিশ্বাস।
    কিন্তু এ তো শুধু রাইট হ্যান্ড ফিলাপ হলো, এখন লেফট্ হ্যান্ড ফিলাপ না হলে তো টাকা পাওয়া যাবে না। চোর পালালে বুদ্ধি বাড়ে, সাদমানের বুদ্ধিও এখানে ঢোকার পরে খুলেছে। ভেবেছিলো নিজে না পারলে ওপরের কেউ হেল্প করে লোক দিয়ে দেবে। আর এখন দেখা যাচ্ছে কথাটা শুধু মুখে মুখে কাজে না। তাছাড়া যে পণ্য বেঁচার নাম করে কোম্পানি ব্যবসা করছে, দুইমাস হয়ে গেলো এখনো সে পণ্যই সাপ্লাই দিচ্ছে না। চীন থেকে আমদানি আসছে না। পণ্য বলতে ব্লেন্ডার অথবা লক্কর-ঝক্কর চৌদ্দ ইঞ্চি চায়না টিভি। টিভিটার দাম বড়োজোড় দেড়হাজার টাকা হতে পারে, ব্লেন্ডারটার দাম তো ছয়-সাতশোর বেশি হবে না। কিন্তু নিয়েছে সাড়ে সাত হাজার টাকা। শংকর ঠিকই বলেছিলো, এ হচ্ছে শুধু টাকার ব্যবসা, এখানে প্রোডাক্ট নামে মাত্র।
    সাদমানের পকেটে সব সময় সেই নামের লিস্টটি মজুদ থাকে। আবার লিস্টের বাইরে রাস্তাঘাটে অপ্রত্যাশিতভাবে কারো সাথে দেখা হয়ে গেলে একটু কথাটথা বলার পরই সাদমান পার্ট-টাইম জবের অফার করে বসে। তবে ইদানীং এক্ষেত্রে সমস্যাও হচ্ছে, অফার করতে গিয়ে দেখা যায় কেউ কেউ ইতোমধ্যে এ ব্যবসায় জড়িয়ে পড়েছে। এদের মাধ্যমেই সাদমান জানতে পারে নেটওয়ার্কিং ব্যবসায় ঢাকা শহরে আরো তিনটা কোম্পানির অস্তিত্ব। চাইনিজ দুটো, মালয়েশিয়ান একটা।
    ইদানীং পরিচিত কেউ কেউ সাদমানকে দেখে রাস্তার দূর থেকে কেটে পড়ে। দেখা হলে সাদমান তো খোঁজখবর নেবেই, কি ব্যাপার, সেই যে সেমিনার দেখে গেলেন, আর তো খোঁজখবর নাই। এই ভয়েই বোধ হয় ওরা এড়িয়ে যায়। সাদমানও যেন পুরোদমে কথার ব্যবসায়ী হয়ে গেছে, সারাক্ষণই মাথার মধ্যে ‘কাকে ঢুকানো যায় কাকে ঢুকানো যায়’ পোকাটা ঘুরপাক খায়। যেন এক স্বার্থবাদী মানুষ সে, স্বার্থ-চিন্তায় সব সময় অন্ধ। কিন্তু এছাড়া আর কি করা, সহজে টাকা আয়ের আর তো কোনো পথ নেই। সাথিকে যে তার পেতেই হবে।
    একদিন অফিসে সাদমান দুই মাঝবয়েসি লোকের কথোপকথন শুনে হতাশার মাঝে মনে খুব জোশ পেলো। এক লোক অন্যজনকে বলছে, আমি তো আমার ছেলে এমনকি মেয়েটারেও লাগায়া দিছি। ছেলের অবশ্য মাত্র একটা হ্যান্ড পূরণ হইছে, মেয়েটার নিচে তিনটা লেভেল পূরণ হইয়া গেছে।
    বলেন কি!
    হ্যাঁ। শোনেন, এই নেটওয়ার্কিং ব্যবসায় মেয়েদের চেয়ে ভালো কেউ করতে পারে না। আপনার তো মেয়ে নাই তো কী হইছে, আপনি ভাবিরে ঢুকায়া দেন।
    দেখি ভেবে।
    ভালো একটা বুদ্ধি খেলে গেলো সাদমানের মাথায়। ছোটো ফুফুকে ঢুকিয়ে দিলে কেমন হয়? বিজিএন-এ দশটি সাইকেল পূর্ণ হলে কোম্পানি থেকে সিঙ্গাপুর ভ্রমণের সুযোগ আছে। ফুফুর হাজবেন্ড থাকে সিঙ্গাপুর। ভালোমতো কাজ করলে সিঙ্গাপুর থেকে ঘুরে আসতে পারবে। ফুফুকে এরকম বুঝালে তো ঢোকার জন্য এক পায়ে খাড়া থাকবে। আর শুধু ফুফুকেই বা কেন, মা, সাথি। এদেরও তো ঢুকিয়ে দেয়া যায়। এরা কোনোরকম কাজ করলেই তো কেল্লাফতে, তখন আর পায় কে!
    ফুফু জানালো, সে ঢুকবে, তবে চুক্তি হচ্ছে সাদমান একজন লোক ঠিক করে দেবে, আরেকজন সে নিজেই ঠিক করবে।
    সাথি আর মায়ের ক্ষেত্রে সাদমান ঠিক করলো, তাদেরকে এখন না ঢুকিয়ে আগে তারা দুজন করে মেম্বোর ঠিক করুক তারপর না হয় ঢোকাবে। সাথিকে সাদমান নিজেই বোঝালো, আর মাকে নিয়ে গেলো সেমিনার ও প্রকাশদার ফিনিশিং শোনোতে। যাতে এতো বড়ো অফিস আর লোকজন দেখে মায়ের উচ্চ ধারনা জন্মে।
    একদিন মাকে বিজিএন অফিসে নিয়ে সেমিনার রুমে বসিয়ে এসে সাদমান প্রকাশদাকে কণ্ঠ নামিয়ে বললো, মাকে নিয়ে এসেছি তো, একটু ভালোমতো বুঝিয়ে দিয়েন, আমি বললে তো বিশ্বাস করে না। আশেপাশে কয়েকজন প্রতিবেশী আছে, ভালোমতো বুঝাতে পারলে তাদেরকে ঢুকাতে পারবে।
    শুনে প্রকাশদা ঠোঁট প্রশস্ত করে একটা শুকনো হাসি দিলো, সেই হাসির অর্থ সাদমানের মনে হলো প্রকাশদা যেন তাকে বলছে, আমি খুব খুশি হয়েছি, আপনি এতোটা নীচে নামতে পেরেছেন যে মাকেও এখন কাজে লাগাতে শুরু করেছেন।

    পাঁচ.
    সাদমানের প্রথম লেভেল পূর্ণ হওয়াতে দেড় হাজার টাকার চেক পেয়ে গেলো। যাক, এই দেড়মাসে এতো পরিশ্রমের পর এ টাকা সামান্য হলেও খুশি সাদমান। কিন্তু কাজ তো আর এগুচ্ছে না। মেহেদিকে যে আশা করে ঢুকিয়েছিলো তাতে গুড়েবালি। ও এখনো কাউকে ঢুকাতে পারেনি। খুব একটা চেষ্টা করছে বলেও মনে হচ্ছে না। নিজের টাকা দিয়ে ঢোকেনি তো তাই গরজ দেখাচ্ছে না। একদিন সকাল সকাল মেহেদির বাসায় গিয়ে ব্যাটাকে ধরে ইচ্ছেমতো ঝারলো সাদমান।
    আরে বাবা, আমি তো চেষ্টা করতেছি, কেউ না ঢুকতে চাইলে কী করুম। মেহেদি দুর্বল কণ্ঠে জবাব ছাড়ে।
    গলা তুলে ফেলে সাদমান, শালা, সারাদিন প্রেম কইরা বেড়াইলে কাজ করবা কোন সময়?

    সাদমানের চোখে অনেক টাকার স্বপ্ন। তিনটা লেভেল কোনোমতো পার করে দিতে পারলেই হলো তারপর আর কোনো চিন্তা নেই। এরপর সে বসে বসে খাবে। কিন্তু তিনটা লেভেলই তো আগাচ্ছে না। এদিকে এসব করতে গিয়ে পড়াশুনারও বারটা বাজছে। কলেজ যাওয়া তো একপ্রকার বন্ধ। তাতে সাদমানের কিছু যায় আসে না, পড়াশুনা যতো যাই বলো সবকিছুর মূল লক্ষ্যই তো টাকা, আর সেতো টাকার দিকেই ছুটছে।
    সাদমান তাই থেমে নেই। সপ্তাহে তিন-চারদিন লোকজন ধরে ধরে সেমিনার দেখাতে নিয়ে যাচ্ছে, প্রকাশদা ফিনিশিং দিচ্ছে, কোনোসময় সে নিজেও দেয় যেহেতু এতোদিনে এ গুণ কিছুটা আয়ত্ব করেছে। কিন্তু শেষমেষ ফল সে একই। হয় বলে, একটু ভেবে দেখি, নয়তো বলে, আচ্ছা দুজন ঠিক করে তারপর যোগাযোগ করবো, অথবা বলে, টাকা কই পাই।

    ছয়.
    একমাস পর।
    দেশের একটি প্রথম শ্রেণীর পত্রিকায় প্রথমে ভিতরের পাতায় একটি নিউজ আসলো। কদিন পরে আরেকটি পত্রিকায় লালকালিতে একেবারে প্রথম হেডলাইন। তারপরে ক্রমান্বয়ে এই খবর হটকেকের মতো সব পত্রিকায়, ম্যাগাজিনে আসতে লাগলো। ব্যাপারটা এমন একটা অবস্থায় দাঁড়ালো যেন এতোদিনে থলের বেড়াল বেরিয়ে আসছে। খবরটা হলো নেটওয়ার্কিং বিজনেসের প্রতারণা নিয়ে। ঢাকা শহরে পাঁচটি নেটওয়ার্কিং বিজনেস চলছে, এদের মধ্যে তিনটির দেশের অন্য বিভাগে শাখাও আছে। এরা পণ্য বিক্রির নামে লোকজনের কাছ থেকে বিপুল অংকের টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে। যেকোনো সময় সুযোগ বুঝে লোকজনের টাকা মেরে দিয়ে চম্পট দেবে। অথচ প্রশাসনের চোখের সামনে এরা নির্বিঘেœ কাজ চালিয়ে যাচ্ছে।
    ফলাফল : টনক নড়ে উঠলো সরকারের। কেবল সরকারের নয়, যারা নেটওয়ার্কিং বিজনেসে যুক্ত তাদেরও। ঘন ঘন পুলিশ হানা দিতে লাগলো সেসব অফিসের বড় কর্তাদের ধরতে। কিন্তু এসব বড় কর্তারা তো বরাবরই ধরাছোঁয়ার বাইরে। হবার মধ্যে যা হলো অফিসগুলোর কার্যক্রম বন্ধ হবার উপক্রম হলো।
    সাদমানদের বাসায় পেপার রাখে না, ঘটনা যে এতো দূর গড়াতে পারে এটা সে ভাবেনি। ব্যাপার কতোটা গুরুতর এটা সে বুঝলো এলাকার এক বেকারির কর্মচারীকে সেমিনার দেখতে অফিসে নিয়ে যাওয়ার পর। সমস্ত অফিস ফাঁকা। দাড়োয়ান ও এলোমেলো ছড়িয়ে ছিটিয়ে কয়েকজন লোক ভিতরে ঘোরাঘুরি করছে। দাড়োয়ানকে জিজ্ঞেস করতে জানালো, অফিস কয়েকদিন বন্ধ, খুলবে শিগগিরই তবে কবে খুলবে এখন বলা যাচ্ছে না।
    পরে প্রকাশদা ও অন্যান্যদের সাথে যোগাযোগ করলে তারা জানালো, সরকারের সাথে কোম্পানির আইনগত জটিলতা চলছে। সরকার বলছে পাবলিক লিমিটেড কোম্পানি বানাতে। ইত্যাদি ইত্যাদি। তবে বড়ো কথা হচ্ছে যতো কিছুই হোক কোম্পানি উঠে যাওয়ার কোনো প্রশ্নই ওঠে না, কিছুদিনের মধ্যে সরকারের সাথে একটা আপোস হলেই আবার শুরু হবে।


    সাত.
    ধার! ধার! ধার!
    লজ্জা! লজ্জা! লজ্জা!
    সাদমানের একদিকে ধার আরেকদিকে লোকলজ্জা। মাকড়সার জালের মতো ক্রমে তাকে আষ্টেপৃষ্টে বেধে ফেলছে।
    নেটওয়ার্কিং বিজনেসের এই শোচনীয় হাল হওয়াতে লজ্জায় দুই সপ্তা সাদমান প্রায় ঘর থেকে বেরুলো না। কারণ তাকে দেখলেই এখন সবাই ‘হায় হায় কম্পানির’ কথা তুলবে, মুখে না হলেও মনে মনে তাকে বলবে ‘চিটার’। আসলে ভুলটা, ভালমতো খোঁজখবর না নিয়ে বিজিএন-এ ঢোকা উচিত হয় নাই। মিরাজকে দোষ দিয়ে কী হবে, দোষ তো তার স্বভাবের, যখন যেটা খেয়াল চাপে সেটা নিয়ে মেতে ওঠে। শংকরের সাবধানবাণী শুনলে আজ তার এই দশা হতো না।
    নিজের ভেতরে ক্রমাগত ভাঙচুর চালিয়ে একদিন সাদমান মনস্থির করলো। সিদ্ধান্ত নিলো, আর না, এই ঘোড়ার ডিমের ব্যবসা আর এক মুহূর্ত না। আর যাবে না সেখানে। আবার চালু হলেও না। ওই চাপাবাজির দরকার নাই তার। মানুষকে ভুজুং ভাজুং বুঝিয়ে এ-তো এক ধরনের প্রতারণা। দরকার নাই তার এ টাকার। টাকার লোভ এ কদিন তার মাথাটাকে বিগড়ে দিয়েছে, চিন্তার ভেতর স্বার্থপরতা এনে দিয়েছে, যার সাথে দেখা হয়েছে, তাকেই কিভাবে বিজনেসে ঢোকানো যায় তার ঘোঁট পাকাতে হয়েছে। তার ভালোবাসা সাথিকে এমনকি দুনিয়ার সবচে আপন মাকেও সে ব্যাবসার পণ্য হিসেবে কাজ লাগিয়েছে। ধিক! ধিক তার কুৎসিত লোভি মনকে!
    পত্রিকায় খবরটা এসে একদিকে ভালোই হয়েছে, দেরিতে হলেও তার উপলব্ধি জাগ্রত হয়েছে। কিন্তু এখন এ বিধ্বস্ত প্রাঙ্গন সে সামলাবে কী করে? খালার কাছে ধার পনেরো হাজার। ফুফুর টাকাটাও মার গেলো। যাক, তাতে দুঃখ নেই, এক বছর টিউশনির টাকা থেকে আস্তে আস্তে সব শোধ দেওয়া যাবে। আর বিরামহীন পরিশ্রম, সময়, টাকা? তিনটা মাস লোকজনকে বেবিট্যাক্সি ভাড়া করে অফিসে নিয়ে গেছে, এসব করতে গিয়ে একটা ভালো টিউশনিও হারিয়েছে, কতো কিছু মিস করেছে। সব বৃথা হয়ে গেলো! তা যাক, তবুও তো সে নিজের কাছে স্বচ্ছ হতে পেরেছে। মনে কোনো স্বার্থবাদিতা নাই, বন্ধুরা তাকে দেখে চাপাবাজ বলার তো সুযোগ পাবে না।
    অনেকদিন পর সাদমানের মনটা ভীষণ নির্মল আনন্দে ভরে উঠলো। জানলার পাশে ঝুলে থাকা বিকেলের রোদটাকে আজ খুব আপন মনে হতে লাগলো। খোলা আকাশের নিচে এই মুহূর্তে গিয়ে চিৎকার করে বলতে ইচ্ছে হলো, সব কিছু ছেড়েছুড়ে আজ সে মুক্ত। বন্ধুদের সাথে কতোদিন ভালো করে আড্ডা হয় না, আজ রাত পর্যন্ত ওদের সাথে আড্ডা মারবে। আর তার আগে সাথির সাথে একবার দেখা করে আসা যাক।

    আট.
    সাথির বাসায় বিকেলটা কাটিয়ে সন্ধ্যার আযান পড়তেই খুশিমনে সাদমান রাস্তায় নামলো। তার হাতে তখন সাথির দেয়া গল্পের বই, তার পিছনের কাগজে আঠা লাগানো, আর তার ভিতরে সাথির চিঠি। চিঠিটা পড়ার জন্য আকুঁপাকুঁ করছে মন। সাদমান একটা খালি রিকশা থামিয়ে উঠে পড়লো। সাবধানে চিঠিটা বের করে মেলে ধরলো চোখের সামনে।
    ‘সাদমান, আমি বাস্তববাদী। তাই সিদ্ধান্তটা অনেক দেরিতে হলেও শেষ পর্যন্ত নিয়ে নিলাম। আমেরিকা থেকে আমাদের এক আত্মীয়ের ছেলে দেশে এসেছে বিয়ে করতে। বাবা-মা তার সাথে আমার বিয়ে দিতে চাচ্ছেন। ভাবছি রাজি হয়ে যাবো। তুমি আমি সমবয়সী। তোমার নিজের পায়ে দাঁড়াতে ও প্রতিষ্ঠা পাওয়া সময় সাপেক্ষ ব্যাপার। আমার পরিবার এতোদিন কিছুতেই অপেক্ষা করবে না। এতে সমস্যাই শুধু বাড়বে। আমাকে ভুল বুঝো না। -সাথি’
    চিঠিটা কয়েকবার পড়ার পর সাদমান খুব ধীরে ধীরে সেটা ভাজ করে পকেটে রাখে। রিকশায় নিশ্চল বসে থেকে নীরবে আকাশের দিকে চোখ দুটো মেলে ধরে। সে চোখে বোধের নানা রঙ হয়তো খেলা করে তবে শেষতক থাকে কেবল শূন্যতা।

    সেপ্টেম্বর ২০০৬